নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: সমাজের অন্যতম ঘৃণ্য প্রবণতার শিকার হতে হয়েছিল ছোটবেলাতেই। কন্যাসন্তান হওয়ায় তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মাকে। মাত্র ১০মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে ‘নববধূ’র ঠাঁই হয়েছিল রাস্তায়। আজ সেই মেয়েই উচ্চ মাধ্যমিকে ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে রানাঘাট মহকুমার সম্ভাব্য প্রথম। ধানতলার জবা কুণ্ডু ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ১০মাসের কন্যাসন্তান-কোলে রাস্তায় ঠাঁই হয়েছিল জবার মা চণ্ডীদেবীর। পরে ধানতলায় বোর্ডিং পাড়ায় নিজের দিদির বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। আজ উচ্চ মাধ্যমিকে সাফল্যের পর জবার সুখ্যাতিতে হইচই পড়ে গিয়েছে। তবে, পূর্ণনগর পূর্ণচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর কথায়, সাফল্যের পিছনে ‘সুপার হিরো’ তাঁর মা-ই।
হবে না-ই বা কেন? নিজে অভুক্ত থেকেও মেয়ের লেখাপড়া কোনওদিন বন্ধ করেননি মা। পেটের তাগিদে ফুলের মালা তৈরি করেই জীবনযাপন করেছেন। অভাবের সংসারে সে-ই যে মায়ের একমাত্র আশা বা ভরসা, তা বুঝতে খুব একটা দেরি হয়নি জবার। ছোটবেলা থেকেই তাই পড়াশোনা শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ‘মিশন’ হয়ে দাঁড়ায় জবার কাছে। কারণ, মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য একদিন মাকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে। ভবিষ্যতে সমাজের কাছে প্রমাণ করে দিতে চান, ছেলের চেয়ে তিনি কম কিসে? সেই সঙ্কল্পে এতটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ জবা, যে দিনের অধিকাংশ সময় পড়াশোনা নিয়েই কেটেছে তাঁর। পাছে বড় চুলের যত্নের পিছনে সময় নষ্ট হয়, তাই জবার মাথায় রয়েছে ‘বয় কাট’।
উচ্চ মাধ্যমিকে পাঁচটি বিষয়ে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ৪৮০। এরমধ্যে বাংলায় ৮৭, ইংরেজি ও ঐচ্ছিক বিষয় বায়োলজিতে ৯৭, কেমিস্ট্রি ও ফিজিক্সে ৯৫ এবং অঙ্কে ৯৬। জবা বলেন, আমার ইচ্ছে ছিল কলেজের প্রফেসর হওয়ার। কিন্তু মা চান, আমি ডাক্তার হই। যেহেতু আমাকে ছোটবেলা থেকেই মা একা মানুষ করেছেন, তাই তাঁর কষ্টকে দাম দিতে আমি চিকিৎসক হতে চাই। যাতে মানবসেবায় নিয়োজিত হওয়া যায়।
জীবনের পূর্ব কাহিনি বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন মা চণ্ডীদেবী। তিনি বলেন, মেয়েকে এতদূর নিয়ে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আরও কষ্ট করতে রাজি। ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। শুধু উচ্চ মাধ্যমিক নয়, মাধ্যমিকেও আকর্ষণীয় ফল করেছিলেন জবা। সেইবার তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৬৪৫। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর শুধু এবছর মহকুমার সম্ভাব্য প্রথম নয়, সাম্প্রতিক ইতিহাসে পূর্ণনগর পূর্ণচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ।