নয়াদিল্লি: ‘ইথানল মিশ্রিত পেট্রলে কোনো সমস্যা নেই। অযথা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’ ই-২০ নিয়ে যতবার প্রশ্ন উঠেছে, ততবার একই যুক্তি দিয়েছে মোদি সরকার। মাইলেজ নিয়ে যাবতীয় সমস্যার দায় চাপানো হয়েছে গাড়িচালকদের ঘাড়ে। সরকার এও জানিয়েছে, পেট্রলে ইথানল মেশানো হচ্ছে বলেই পশ্চিম এশিয়ায় চরম যুদ্ধ আবহে দেশে জ্বালানির দাম বাড়েনি। কিন্তু এ তো সাফাই মাত্র। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইথানল নিয়ে মোদি সরকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পকেট ফাঁকা হচ্ছে গাড়িচালকদের। পেট্রলে ইথানল মেশানোর ফলে গত তিন বছরে তাদের পকেট থেকে বাড়তি গচ্চা গিয়েছে ৮৮ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা! মোদি সরকারের দেওয়া তথ্য, জ্বালানি ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য ও গাড়ির সংখ্যা বিশ্লেষণ করে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ ‘দ্য রিপোর্টার্স’ কালেকটিভ’-এর। তাদের অন্তর্তদন্ত রিপোর্টে প্রকাশ, ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ওই বিপুল পরিমাণ টাকা গুণাগার দিয়েছে গাড়ি মালিকরা। ভবিষ্যতেও এমন বাড়তি খরচের বোঝা তাদের বইতে হবে। কারণ, বর্তমানে পেট্রলে মেশানো ইথানলের মাত্রা ২০ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৮০ শতাংশ করার ভাবনাচিন্তা করছে কেন্দ্র। সেক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচের পরিমাণ যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু কীভাবে হচ্ছে এই বাড়তি খরচ? এর পিছনে রয়েছে সাধারণ বিজ্ঞান। এক লিটার পেট্রলের তুলনায় সমপরিমাণ ইথানল পুড়লে ৩৩ শতাংশ কম শক্তি পাওয়া যায়। এক লিটার পেট্রলে যদি ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হয়, তাহলে সেই জ্বালানি শুদ্ধ পেট্রলের তুলনায় ৬.৭ শতাংশ কম শক্তি উত্পন্ন করে। আর পেট্রলিয়াম মন্ত্রক তো স্বীকারও করেছে যে ই-২০ ব্যবহারে অন্তত ৫ শতাংশ কম হয় মাইলেজ। গত তিন আর্থিক বছরে পেট্রলে ইথানল মিশ্রণের পরিমাণ ১১.৮ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে ভারতে মোট ৪ কোটি ২৬ লক্ষ মেট্রিক টন মোটর স্পিরিট (গাড়ির জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের জ্বালানি) ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ হল ইথানল মিশ্রিত পেট্রল। যদি আগের মতো শুদ্ধ পেট্রল ব্যবহার হত, তাহলে এই মোট পরিমাণ কমে হত প্রায় ৩ কোটি ৯৮ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাত্ এক আর্থিক বছরেই ভারতীয় গাড়িচালকরা ২৮ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করেছেন। সেই হিসাবে গত তিন অর্থবর্ষে প্রায় ৬৬ লক্ষ মেট্রিক টন অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়িয়েছেন গাড়িচালকরা, যার জন্য তাঁদের দিতে হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধুমাত্র গত আর্থিক বছরেই গচ্চা গিয়েছে ৩৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
বিশ্বে সর্বাধিক ইথানল উত্পাদনকারী দেশ আমেরিকাতেও মিশ্রিত পেট্রল বিক্রি হয়। কিন্তু সেখানে তার দামে ভরতুকি দেয় সরকার। ফলে শুদ্ধ পেট্রলের তুলনায় অনেকটা সস্তায় ওই ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি কিনতে পারেন গ্রাহকরা। কিন্তু ভারতে সেই সুবিধা রাখেনি কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতে কেউ যদি ইথানল ছাড়া পেট্রল কিনতে চান, তাহলে লিটার পিছু ৫৫ থেকে ৬৮ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে কেন্দ্র মুখে যতই গাড়িচালকদের রেহাই দেওয়া যুক্তি দিক, তা আদৌ কতটা সত্যি? ফের প্রশ্ন উঠল।