অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: মতুয়া সমাজে ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে বিজেপি। নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে এতদিন তাদের নিয়ে ভোট-শক্তি বাড়িয়ে ছিল। বাংলায় এসআইআর পর্ব যত শেষের দিকে এগচ্ছে, ততই মুখোশ খুলে পড়ছে গেরুয়া শিবিরের। নাগরিকত্বের আবেদন করেও মতুয়াদের একটা বড় অংশের মিলছে ভোটাধিকার। এখন পর্যন্ত নদীয়া দক্ষিণে বিচারাধীন তিনটি তালিকা মিলিয়ে মোট ৫৮ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। যাঁদের অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। সেই অংশেরই আবার অনেকেই নাগরিকত্বের আবেদনপ্রার্থী। বিজেপি নেতারা বলে আসছিলেন, সিএএ’তে আবেদন করলেই ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেই সকল আবেদনকারীরা বাদ পড়েছেন বিচারাধীন প্রক্রিয়ায়। তাঁদের ভোট-ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সবমিলয়ে, বিজেপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলে ক্ষোভে ফুঁসছেন মতুয়া সমাজ।
নদীয়া দক্ষিণে মোট ৯টি বিধানসভা। মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল এক লক্ষ ৪৩ হাজার ২৪৪। অনুমোদিত হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৩৭৫টি আবেদন। বাতিল হয়েছে ৫৮ হাজার ৬১৪টি আবেদন। এখনও অমীমাংসিত ৭০ হাজার ২৫৫টি মামলা। উপযুক্ত নথি থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন রানাঘাট উত্তর পশ্চিম বিধানসভায়। যেখানে ৯ হাজারেরও বেশি আবেদন বাতিল হয়ে গিয়েছে।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন—দুই ক্ষেত্রেই নদীয়া দক্ষিণে বিজেপির দাপট ছিল বেশ লক্ষ্যণীয়। একুশের ভোটে নবদ্বীপ ছাড়া বাকি অংশে কার্যত ঘাসফুল ফোটেনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপির ভোট ব্যাঙ্কে ফাটল ধরাতে পারেনি তৃণমূল। তার অন্যতম কারণই হল, নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মতুয়াদের এককাট্টা করে রাখা। এবার সেই সমীকরণ আমুল বদলে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের মত। তাদের ব্যাখ্যা, এসআইআর পর্ব শেষ হওয়ার একেবারে দোরগোড়ায় এসে মতুয়ারা বিজেপির আসল স্বরূপ বুঝে গিয়েছেন। নাগরিকত্বের আবেদন করলেই যে গণতান্ত্রিক অধিকার মিলবে, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে মতুয়াদের কাছে। কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার বাসিন্দা সুকুমার বিশ্বাসের কথায়, ‘নাম বাদ গেলে বলা হচ্ছে সিএএ’র মাধ্যমে নাম তোলা যাবে। আমি তো আবেদন করেছিলাম। কিন্তু এখনও শংসাপত্রই পেলাম না। তার আগেই নাম বাদ।’ জানা গিয়েছে, ওই তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা অনুযায়ী রানাঘাট উত্তর পূর্ব কেন্দ্রে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২২ হাজার ৬৯৪। তার মধ্যে ৮১৯টি অনুমোদিত, ৪ হাজার ৯৪৪টি বাতিল এবং ১৬ হাজার ৯৩১টি এখনও বিবেচনাধীন। আবার ৪৫ শতাংশ মতুয়া ভোট থাকা কৃষ্ণগঞ্জ কেন্দ্রে মোট ১৯ হাজার ৮৪৯টি মামলা বিচারাধীন। তার মধ্যে ১ হাজার ৩৭৩টি অনুমোদিত, ৫ হাজার ২৪৫টি বাতিল হয়েছে। ৪০ শতাংশ মতুয়া ভোট থাকা রানাঘাটা দক্ষিনণে ৭ হাজার ৮১২ জন ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে। শান্তিপুর কেন্দ্রে মোট ১৩ হাজার ৩৪৫টি মামলার মধ্যে ৫৩৮টি অনুমোদিত, ৩ হাজার ৮৪৩টি বাতিল। চাকদহ কেন্দ্রে বিচারাধীন ছিল ১৫ হাজার ২৩৭টি আবেদন। তার মধ্যে ৩ হাজার ১৬০টি অনুমোদিত, ৬ হাজার ৩৫৫টি বাতিল। কল্যাণী কেন্দ্রে মোট ১২ হাজার ২৩৬টি মামলার মধ্যে ২ হাজার ১০৯টি অনুমোদিত, ৭ হাজার ১৯৩টি বাতিল হয়েছে। হরিণঘাটা কেন্দ্রে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৭ হাজার ৫০৬। তার মধ্যে ৩ হাজার ১৫৯টি অনুমোদিত, ৭ হাজার ৬৬১টি বাতিল হয়েছে।
হরিণঘাটা বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী করেছে মতুয়া মুখ রাজীব বিশ্বাসকে। তিনি বলেন, ‘বিজেপি মতুয়াদের বারবার ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করেছে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করেছে।’ রানাঘাট দক্ষিণের বিজেপির সভানেত্রী অপর্ণা নন্দী বলেন, ‘নথিপত্র সহকারে ফর্ম-৬ এর মাধ্যমে আবেদন করতে বলা হচ্ছে। বিজেপি পাশে রয়েছে।’