বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: সারা বছর দেবী কালী রূপে পূজিত হন। দুর্গাপুজোর সময় তিনিই দেবী পার্বতী। বহু প্রাচীন কাল থেকে এমনই রীতি চলে আসছে সতীর ৫১পীঠের অন্যতম নলাটেশ্বরী মন্দিরে। এখানকার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়ের আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক কাহিনি। রীতি মেনে এখানকার পুজো হয়। এই পুজোর সঙ্গে বাসিন্দাদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি সুনীল মস্করা বলেন, ৫১ পীঠ হওয়ায় এবছর অষ্টমীর দিন দেবীকে ৫১ রকম ভোগ নিবেদন করা হবে। মা এখানে সৌভাগ্যের দেবী, অত্যন্ত জাগ্রত। তাই এইসময় দেশ-বিদেশের অনেকে তাঁদের প্রার্থনা জানিয়ে মায়ের উদ্দেশে চিঠি লেখেন। যা মাকে পড়ে শোনানো হয়। পরে সেই ভক্তদের প্রসাদ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেবীর মাহাত্ম্য দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
ব্রহ্মাণী নদীর তীরে নলরাজাদের গড় হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ের কোলে মায়ের প্রাচীন মন্দির। ঠিক তার পিছনে রয়েছে আনার সাহেবের মাজার। জায়গাটি রামায়ণের কাহিনির সঙ্গেও যুক্ত। এই মন্দির লাগোয়া পাহাড়ের এক প্রান্তে রামচন্দ্রের পদচিহ্ন, সীতার মাথার চুলের দাগ ও রামসীতার কড়ি খেলার সাতকপটার চিহ্ন রয়েছে। তাই নলহাটি হিন্দু, মুসলমান, শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের এক আশ্চর্য সমন্বয় ও সম্প্রীতির এক মিলনভূমি বলা হয়। এখানে একসঙ্গে মা কালী, ভৈরব শিব আর ভগবান বিষ্ণুর পুজো হচ্ছে।
একসময় এই এলাকা ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। তান্ত্রিক, কাপালিকরা এখানে সিদ্ধিলাভের জন্য আসতেন। বশিষ্ঠ, রামশরণ, দেবশর্মা, কুশলানন্দ এখানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন। বর্গি সর্দার ভাস্কর পণ্ডিত এখানে পুজো দিতে আসতেন। মন্দিরের পিছনেই রয়েছে সমতল ভূমি। যা বর্গিডাঙা নামে খ্যাত। যদিও জঙ্গল ঘেরা ভাব গম্ভীর পাহাড়ের পরিবেশ এখন ইতিহাস।
জনশ্রুতি রয়েছে, নলাটেশ্বরী মায়ের পুরো নাম দেবী পার্বতী মাতা ঠাকুরানি। মা এখানে ত্রিনয়নী। বর্তমানে যেখানে মায়ের মন্দির সেখানে একটি বটবৃক্ষের গাছে বিশাল আকারের মৌমাছির বাসা ছিল। সেই মৌচাকের মধু পান করতেন দেবী পার্বতী। দক্ষযজ্ঞের সময় এখানে মায়ের কণ্ঠনালি পড়েছিল। পরবর্তীকালে এলাকার রামশরণ দেবশর্মা স্বপ্নাদেশ পেয়ে মৌচাক থেকে মায়ের কণ্ঠনালি উদ্ধার করে পুজো শুরু করেন। পরে রানি ভবানী মায়ের মন্দির নির্মাণ করেন। বহু যুগ পর সাধনার মাধ্যমে কুশলানন্দ ব্রহ্মচারী এখানে সিদ্ধিলাভ করেন। দেবীর নামানুসারে এলাকার নাম নলহাটি। দুর্গাপুজোর সময় আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে এই মন্দির চত্বর।
উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে এই পাহাড়ের পশ্চিম দিকে খননে পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন, মধ্য ও প্রস্তর যুগের নানা অস্ত্র। বর্তমানে কলকাতার জাদুঘরে তা দেখতে পাওয়া যায়। সপ্তমী থেকে নবমী প্রথমে নলাটেশ্বরী মন্দিরে বলিদান পর্ব চলে। সেই খড়্গ নিয়ে ঢাক ও শোভাযাত্রা সহযোগে পুরোহিতরা ধোপাপাড়ার সিংহবাহিনী মন্দিরে বলিদান করতে আসেন।
মন্দিরের সেবাইত আশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ভোরে মায়ের কণ্ঠ স্নানের পর পুজো শুরু হয়। পুজোর চারদিন মাকে ডাকের সাজ, সোনার মুকুট সহ নানা অলঙ্কারে সজ্জিত করা হয়। দশমীর দিন রাতে মন্দির চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। ধোপা ও কামারপাড়ার দেবী শোভাযাত্রা সহকারে ভক্তদের কাঁধে চেপে মা পাবর্তীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ওই দুই দেবীমূর্তিকে এখানে নাচানো হয়। এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। যা দেখার জন্য দূরদূরান্তের মানুষ ভিড় করেন।