Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / খেলা

স্পর্ধার ৫-০ পঞ্চাশ বছর

এরপর বুক বাজিয়ে ভৌমিকদা বলল, ‘চল, ওদের শেষ করে আসি।’ শিল্ড ফাইনালের আগে ইস্ট বেঙ্গল ড্রেসিং-রুম যেন আগ্নেয়গিরি

স্পর্ধার ৫-০ পঞ্চাশ বছর
  • ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আইএফএ শিল্ড ফাইনাল

Advertisement

(৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, মোহন বাগান মাঠ)

ইস্ট বেঙ্গল  ৫: মোহন বাগান ০

(সুরজিৎ সেনগুপ্ত-৬ মিনিট, শ্যাম থাপা-২৪ ও 
৫০ মিনিট, রঞ্জিত মুখার্জি-৩৮ মিনিট, 
শুভঙ্কর সান্যাল-৮৪ মিনিট)

 

 ১৪ মিনিটে পেনাল্টি মিস করেন শ্যাম থাপা।

ইস্ট বেঙ্গল 
তরুণ বসু, সুধীর কর্মকার, অশোক লাল ব্যানার্জি (ক্যাপ্টেন), শ্যামল ঘোষ, কাজল ঢালি (মৃদুল মুৎসুদ্দি-৭৫ মিনিট), গৌতম সরকার, সমরেশ চৌধুরী, সুভাষ ভৌমিক, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, রঞ্জিত মুখার্জি, শ্যাম থাপা (শুভঙ্কর সান্যাল-৮০ মিনিট)।
কোচ: পিকে ব্যানার্জি

মোহন বাগান 
ভাস্কর গাঙ্গুলি (প্রশান্ত মিত্র-৫১), বিজয় দিকপতি, নিমাই গোস্বামী (কম্পটন দত্ত-৭৫ মিনিট), সুব্রত ভট্টাচার্য, দিলীপ পালিত, তপন বসু, প্রসূন ব্যানার্জি, উলগানাথন, কেষ্ট মিত্র, জহর দাস, শিশির গুহ দস্তিদার (ক্যাপ্টেন)।
কোচ: অরুণ ঘোষ।

আবেগের কাছেই বশ মানে অহংকার

দেবব্রত সরকার: ‘আজকের ম্যাচ পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মতো।’ ক্লাব সভাপতি  বিধু বিনোদ ঘোষ বলা শুরু করতেই থামিয়ে দিলেন পিন্টুদা। ‘আপনে বড্ডো টাইম ন্যান। ম্যাচ তো ওগো লগে। আমরাই জিতুম।’ গৌতম সরকারের পিঠ চাপড়ে প্রশান্ত সিনহা বলে ওঠেন, ‘তুই আমার থেকে বড় প্লেয়ার।’ এরপর বুক বাজিয়ে ভৌমিকদা বলল, ‘চল, ওদের শেষ করে আসি।’ শিল্ড ফাইনালের আগে ইস্ট বেঙ্গল ড্রেসিং-রুম যেন আগ্নেয়গিরি। পল্টুদা, জীবনদা তো বটেই, ডাক্তারদা, শ্রীমানিদা, জ্যোতির্ময়দা, মন্টু বসু, শানুদা, প্রশান্ত সিনহা, জংলাদা সবাই হাজির। রক্ত টগবগ করছে। তখন সকাল থেকে টেন্টেই পড়ে থাকতাম। দেখেছি, কীভাবে নিজেদের উদ্বুদ্ধ করত ফুটবলাররা। উত্তাল সাতের দশক। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষদের আবেগের মন্ত্র ইস্ট বেঙ্গল। আর সেদিনের ম্যাচটা ছিল ওদের কাছে অহংকারের বিরুদ্ধে আবেগের যুদ্ধ।
ম্যাচের অনেক মুহূর্ত। বিশ্লেষণের জন্য প্রাক্তনরা রয়েইছেন। আমার চোখে ভাসে১১ টা লাল-হলুদ জার্সির মশাল হয়ে ওঠা। গ্যালারি থেকে ডাক্তার দাসের চিৎকার কানে বাজে। ‘জীবন, আর গোল দিও না। ওগো ক্লাবটাই যে উইঠ্যা যাইবো।’একসময় শেষ হয় ম্যাচ।  চারিদিকে ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। পরদিন  সুভাষ ভৌমিকের জন্য দারুণ গিফট নিয়ে এসে হাজির ডাক্তারদা। সঙ্গে দামি সিগারেটের প্যাকেট। আরও একটা  কথা বলতেই হয়। চার গোল খেয়ে ডুকরে কেঁদেছিল ভাস্কর। কিন্তু পল্টুদার উৎসাহে রাজার মতো ফিরে আসে ও।        লেখক ইস্ট বেঙ্গলের শীর্ষকর্তা

  প্রদীপদা মাঠে চলুন, দেখা যাবে...

সুধীর কর্মকার: শ্যামের চোখে আগুন। ফুঁসছে সুভাষ। পানামা ক্যাপ পরে তরুণ বসু ভল্ট খেতেই গর্জে উঠল গ্যালারি। ১৯৭৫ সালের আইএফএ শিল্ড ফাইনাল। পাঁচ দশক পেরিয়েও স্মৃতি অমলিন। সেই বড় ম্যাচ নিয়ে চর্চা আজও অব্যাহত। ৫০ বছর পেরলেও গর্ব একইরকম ইস্ট বেঙ্গল সমর্থকদের। কী টিম ছিল আমাদের! সুভাষ, শ্যাম, হাবিব, সুরজিৎ—কাকে ছেড়ে কাকে বাছি? একইসঙ্গে অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার অশোকলাল ব্যানার্জি। এই দলকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন প্রদীপদা। ওই সময় এশিয়ার যে কোনও দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারতাম। 
সেদিন রিষড়া থেকে গাড়িতে পৌঁছই ময়দানে। ড্রেসিং-রুমে ক্লাস নিচ্ছেন প্রদীপদা। সাদা বোর্ডে অসংখ্য আঁকিবুকি। এসব ক্ষেত্রে বরাবরই পিছনের সারিতে আমি। চোখ বন্ধ করে ফোকাস করছি। হঠাৎ প্রদীপদার ডাকে সম্বিৎ ফিরতেই বলি, ‘মাঠে চলুন দেখা যাবে।’ এই মুহূর্তগুলো বুঝতেন পিকে। দক্ষ ম্যানেজার। কথা না বাড়িয়ে দ্রুত মিটিং শেষ করলেন তিনি। বাকিটা ইতিহাস। তবে ভৌমিকের কথা বলতেই হয়। বড় ম্যাচের বড় প্লেয়ার। প্রথম মিনিট থেকেই মোহন বাগান রক্ষণে রোলার চালায় ও। ওদের উলগাকে নিয়ে সতর্ক করেছিলেন অনেকে। বিপক্ষ ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল ঠেলে ও দৌড়ত। সেটা জেনেই তৈরি ছিলাম। যাই হোক, রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর হুঁশ ফেরে। ম্যাচ শেষে ইলিশ মাছ হাতে মাঠে নেমে এসেছিলেন সমর্থকরা। কত পুরনো কথা মনে পড়ছে। ১৯৭২ সাল। এই অধম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক। এদিকে বড় ম্যাচের আগে ফুড পয়জনে শয্যাশায়ী। খবর পেয়েই ডাক্তার নিয়ে বাড়িতে হাজির ফুটবল সচিব অজয় শ্রীমানি। চিকিৎসক জানালেন, ‘খেললে প্রাণসংশয় হতে পারে।’ একথা শুনেই কান্নাকাটি শুরু মায়ের। কোনওমতেই যেতে দেবেন না মাঠে। একদিকে ইস্ট বেঙ্গল। অপেক্ষায় লক্ষ লক্ষ সমর্থক। অন্যদিকে পরিবার। শেষ পর্যন্ত মাতৃসম ক্লাবের ডাকে গর্ভধারিনীকে বুঝিয়ে খেলতে যাই।

 

পাখি দেখলেও মনে হতো ইটের টুকরো উড়ে আসছে

উলগানাথ:  মোহন বাগান তাঁবুর ছোট্ট ড্রেসিং-রুমে শ্মশানের স্তব্ধতা। পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে। বন্ধ দরজার বাইরে থেকে ভেসে আসছে চাপা কান্নার শব্দ। বেঞ্চে গা এলানো দিকপতির মুখ দু’হাতে ঢাকা। ফিসফিসিয়ে নিমাই বলল, ‘সব শেষ হয়ে গেল।’ এত বছর পরেও ওর কথাগুলো হাহাকারের মতো কানে বাজে। নিজের মনেই প্রশ্ন করি, ‘কেন এমন হল?’
৫ গোল হজম! তাও আবার ইস্ট বেঙ্গলের বিরুদ্ধে। ১৯৭৫ সালের শিল্ড ফাইনাল। ম্যাচের আগে উত্তেজনা চরমে। হঠাৎই শোনা গেল, বড় ম্যাচের আগে ছোট্ট ক্যাম্প হবে ডায়মন্ডহারবারে। প্রস্তুতি নিয়ে সেখান থেকেই সোজা মোহন বাগান মাঠে আসবে গোটা দল। ডায়মন্ডহারবারে আপ্যায়নের ত্রুটি ছিল না। সুইমিং পুলে সাঁতার কাটানো হয় ফুটবলারদের। ফলে শরীর আর দিচ্ছিল না। শিল্ড ফাইনালের দিন এক কর্তার বাড়িতে লাঞ্চে হাজির গোটা দল। ঢালাও খাবারের আয়োজন। রাস্তাও তো কম নয়। ম্যারাথন বাসযাত্রায় পা মুড়ে বসে থাকাটাই কাল হয়েছিল। কোন অস্ত্রে সেদিন বাজিমাত করে ইস্ট বেঙ্গল? দু’দলের লাইন-আপ মনে করার চেষ্টা করুন। আমাদের দলে অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট। ভাস্কর আনকোরা। মোহন বাগানে দ্বিতীয় বছর সুব্রতর। কেষ্ট মিত্র, জহর দাসরা কিছু বোঝার আগেই ম্যাচ শেষ। মনে আছে, সেদিন সুভাষ ভৌমিকের উপর যেন ভগবান ভর করেছিলেন।  শুরুতেই কেঁপে যায় মোহন বাগান রক্ষণ। তারপর সব শেষ। ম্যাচের পর দীর্ঘক্ষণ আটকে ছিলাম ড্রেসিং-রুমে। লজ্জা, আপশোস, রাগ, চোখের জল একাকার। মাঠ থেকে বাড়ি পৌঁছে দেয় পুলিস ভ্যান। মোহন বাগান মাঠমুখো হতেও ভয় পেতাম। বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ। এমনকী আকাশে পাখি দেখলেও মনে হতো ইটের টুকরো উড়ে আসছে। তবু আমাদের ফিরতেই হতো। এ লড়াই ছিল বাঁচার লড়াই। পরের বছর ১৭ সেকেন্ডে আকবরের গোল সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দেয়।

 

পরদিন স্কুলে ঢুকতে পারিনি

দেবাংশু রায়চৌধুরী: সেদিন  বড়িশা আসর বিদ্যাপীঠ যেন এক টুকরো মোহন বাগান মাঠ। শিল্ড ফাইনাল। তড়িঘড়ি স্কুল ছুটি। চাতালে রাখা ট্রানজিস্টার। পৌনে তিনটেয় ম্যাচ শুরুর আগেই রেডিওর নব ঘুরিয়ে দিলেন কেউ। খেলা শুরু...। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুরজিৎ সেনগুপ্তের গোল। পায়ের নীচে মাটি গেল সরে। ২৪ মিনিটে ব্যবধান বাড়ান শ্যাম থাপা। ছুটে বেরিয়ে আসি স্কুল থেকে। বাড়ি ফেরার আগে পাড়ার মোড়ে জানতে পারি, মোহন বাগান ৪ গোলে পিছিয়ে। দোতলায় ওঠার আগেই শুভঙ্কর সান্যালের গোল। পরদিন স্কুলের গেটে ইস্ট বেঙ্গল সমর্থকদের জটলা। মোহন বাগানী ছাত্রদের ছুটি। ক্লাসে যাওয়ার দরকার নেই। কার্যত ঘাড়ধাক্কা। ফিরে আসি বাড়িতে। খবর আসে, আত্মহত্যা করেছেন উমাকান্ত পালোধি। তাঁর আত্মার শান্তির জন্যই ওদের পাঁচ নয়, ছ’গোল দিতে হবে।
 লেখক মোহন বাগান সমর্থক

গলা দিয়ে জল পর্যন্ত নামেনি: সুব্রত

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। টেবিলে গরম কফি। পার্ক স্ট্রিটের চেনা রেস্তোরাঁয় ঘরোয়া মেজাজে সুব্রত ভট্টাচার্য। শরতের আকাশের মতো মুড স্যুইং করে। ৫০ বছর আগে শিল্ড ফাইনাল সুব্রতর কেরিয়ারে অভিশপ্ত অধ্যায়। তবু যোগ্য নেতার মতোই সতীর্থের পাশে দাঁড়ালেন সুব্রত।  সেদিন চারটি গোল হজম করেছিলেন তরুণ গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি। অনেকের কাছে তিনিই সেই ম্যাচের ভিলেন।  সুব্রতর মন্তব্য, ‘একা ভাস্করকে কাঠগড়ায় তোলা অর্থহীন। সেদিন গোটা দল ভেঙে পড়েছিল তাসের ঘরের মতো। আমি, আমরা — সবাই দায়ী।’ ম্যাচের পর বাড়ি ফেরেননি সুব্রত। শোনা যায়, বাবুঘাটে নৌকায় রাত কাটে বাবলুর। বললেন, ‘হ্যারিকেনের আলোও অসহ্য ঠেকছিল। গোটা রাত কাটে উপোস করে। গলা দিয়ে জল পর্যন্ত নামেনি।’
১৯৭৪ সালে মোহন বাগানে সই করেন সুব্রত। তখন কিছুটা আনকোরা। অভিজ্ঞতার অভাব। বিপর্যয়ের কারণ ঠিক কী? বাবলুর ব্যাখ্যা, ‘কাউকে ছোট করছি না। ইস্ট বেঙ্গল তুলনায় অনেকটাই ব্যালান্সড। তবে আমরাও গোল মিস করেছিলাম।’ আধপোড়া সিগারেট ছাইদানিতে গুঁজে গা-ঝাড়া দেন সুব্রত। গায়ে জ্বালা ধরেনি? প্রশ্ন শুনেই ফুঁসে উঠলেন ময়দানের বাবলু। এবার সুর চড়া। বললেন, ‘লড়তে কখনও ভয় পাই নি। ১৭টা সেলাই নিয়েও ইস্ট বেঙ্গলের বিরুদ্ধে খেলেছি। সেদিনই শপথ নিয়েছিলাম হয় ঘুরে দাঁড়াব, নয়তো খেলা ছেড়ে দেব।’

 

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ