বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: দিল্লি এইমস-এ এমডি পড়ার সুযোগ পেয়েছে বাড়ির মেধাবী ছেলেটি। পাড়া-প্রতিবেশীর আলোচনা যখন কানে আসে, গর্বে বুক ফুলে ওঠে বাবার। বছর দশেক আগের এই দৃশ্য আজকের দিনে কতটা প্রযোজ্য, বলা খুব কঠিন! কারণ, তথ্য জানার অধিকার আইনে (আরটিআই) যেসব পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তাকে মেডিকেল শিক্ষাক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর বললেও কম বলা হয়। দিল্লি এইমসসহ দেশের প্রথম সারির মেডিকেল প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে কতজন উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থী চিকিৎসক বা জুনিয়র রেসিডেন্টের কাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছিল আরটিআই করে। আরটিআই-এর তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে ৩৬ জন ও ২০২৪ সালে ৬০ জন পিজিটি দিল্লি এইমস ছেড়েছেন। বছর কয়েক আগেই চালু হয়েছে এইমস কল্যাণী। সেখানে ২০২৫ ও ২৬ সালে কাজ ছেড়েছেন যথাক্রমে ১৫ ও ১১ জন পিজিটি। ২০২৪ ও ২৫ সাল জিপমার পন্ডিচেরি ছেড়েছেন যথাক্রমে ৬০ ও ৪৩ জন জুনিয়র ডাক্তার (ডিএম/এমসিএইচ, পোস্ট ডক্টরাল মিলিয়ে)। ২০২৫ ও ২০২৬ মিলিয়ে এইমস হৃষিকেশ থেকে ‘কুইট’ করেছেন ৬৪ জন মেধাবী চিকিৎসক। ২০২৩ থেকে ’২৬—এই তিন বছরে এইমস গোরক্ষপুর ছেড়েছেন ৫৮ জন জুনিয়র রেসিডেন্ট বা পিজিটি। ২০২৫ ও ’২৬ সাল মিলিয়ে এইমস পাটনা ছেড়েছেন ২০ জন।
চিকিৎসকদেরই অভিযোগ, এখন চাহিদার থেকে দেশে ডাক্তারের জোগান বেশি। সম্মানের চাকরি এবং বেতন পেতে কালঘাম ছুটছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লি এইমস, কল্যাণী এইমস, গোরক্ষপুর এইমস, হৃষিকেশ এইমস, পাটনা এইমস, জিপমার পণ্ডীচেরির মতো শীর্ষস্তরের প্রতিষ্ঠানে পাঠরত পিজিটি, পিডিটি কাতারে কাতারে কলেজ ছাড়ছেন।
পৃথক পরীক্ষার মাধ্যমে এইমস-এ ভরতির বিরল সুযোগ পান মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। সেই সুযোগ পেয়েও স্নাতকোত্তর পঠনপাঠন এবং তারই অঙ্গ হিসাবে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তারি ছাড়ার সিদ্ধান্ত কারও পক্ষেই সহজ নয়। তা সত্ত্বেও কেন? আরটিআই করে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কতজন শিক্ষার্থী চিকিৎসক মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সেলিং করাচ্ছেন? তার উত্তরটিও বিস্ফোরক! কয়েকটি এইমস সংখ্যা উল্লেখ করে জানিয়েছে, তাদের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করাচ্ছেন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে। এ বিষয়ে দেশজুড়ে সরব অন্যতম সর্বভারতীয় চিকিৎসক সংগঠন ইউনাইটেড ডক্টরস ফ্রন্ট। তাদের চেয়ারপার্সন ডাঃ লক্ষ্য মিত্তল বলেন, ‘টানা ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ডিউটি। বিষাক্ত পরিবেশ। আমিও অমানুষিক খেটেছি, তাই তোরাও খাটবি, আমার সঙ্গেও এমন হয়েছে, তাই তোদের সঙ্গেও হবে—এমন সহানুভূতিহীন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলিতেও। তাই ডাক্তারি পড়াই ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে।’ ডাঃ মিত্তল আরও বলেন, ‘এইমস-এর সার্কুলারই আছে, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা ডিউটির। আদৌ মানা হয়? কেন্দ্রীয় সরকার এবং এনএমসি-কে অনুরোধ, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগে হস্তক্ষেপ করুন। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ান। সবাই একে একে চলে গেলে পরে ডাক্তারি করার লোক মিলবে তো?’



