পক্ষে
সুজাতা সরকার
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৮৬.২২ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ যেখানে বাংলায় কথা বলতে এবং লিখতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন, সেক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষ, সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার আবশ্যক। এখনও বহু সংখ্যক মানুষ সরকারি অথবা বেসরকারি কাজকর্ম বাংলা ভাষায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে করে থাকেন। প্রযুক্তি নির্ভর অনেকেই নন। বাংলা ছাড়া অন্য ভাষাতেও তাঁরা স্বচ্ছন্দ নন। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত ব্যক্তিদের অন্তত বুনিয়াদি স্তরের বাংলা ভাষা শেখা প্রয়োজন। দক্ষিণ ভারতের নানা রাজ্যে তো প্রশাসনিক ও নিত্যনৈমিত্তিক কাজ তাদের আঞ্চলিক ভাষায় হয়। তাহলে বাংলা শিখবেন না কেন?
গৃহিণী
শ্বেতা চ্যাটার্জি
আমরা বঙ্গবাসীরা এটাই জানি যে অন্য রাজ্যে চাকরিসূত্রে গেলে সেই রাজ্যের মাতৃভাষা আমাদের একটু হলেও জানতে হবে ও দরকারে বলতে হবে। সঙ্গে ইংরেজি ভাষাটা জানাও দরকার। অধিকাংশ বাঙালি সেটাই করে থাকে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গে অন্য রাজ্যের মানুষ চাকরি, থাকা-খাওয়া সবকিছুর সুবিধা নিয়ে থাকলে তিনি বাংলা ভাষা কেন জানবেন না? রাজ্যবাসীর সঙ্গে চলতে, ওঠাবসা করতে তাঁদেরও আমাদের মাতৃভাষাকে সম্মান করা দস্তুর।
স্নাতকোত্তর পড়ুয়া
শংকর সাহা
বাংলা ভাষার মধ্যে জড়িয়ে থাকে এক আবেগ, ঐতিহ্য ও পরম্পরা। এই মধুর ভাষায় মনের সকল অভিব্যক্তি আমরা প্রকাশ করি। শৈশবে মা ডাক শিখি এই ভাষাতেই। বাংলা ভাষা আমাদের অহঙ্কার। তাই কাজের সুবাদে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষেরা যদি কখনও এই বাংলায় আসেন তাদেরও বাংলা ভাষা জানতে হবে। এতে তাদের যেমন কাজের ক্ষেত্রে সুবিধে হবে, তেমনই ভাব বিনিময়ও অনেকটা সহজ হবে। ভিন্ন ভাষার প্রতি সমাদর রেখেই বলি, ভিন্ন ভাষার মানুষকে কাজের সুবাদে বাংলা ভাষা শিখতেই হবে।
গবেষক, দঃ দিনাজপুর
অর্পিতা বর্মন
কাজের খাতিরে কেউ বাংলায় থাকলে অবশ্যই বাংলা জানতে হবে— কারণ এই বাংলার স্থায়ী বাসিন্দাদের বেশিরভাগই শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলেন। তাই যখন কেউ কর্মসূত্রে বাংলায় থাকেন, বাংলা না জানায় তিনি সকলের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে পারেন না। বাংলায় এসে যদি বাংলা বলতে না পারেন বা বুঝতে না পারেন তাহলে শুধু কর্মক্ষেত্রই নয়, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনেও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। তার জন্যই বাংলা জেনে রাখাটা জরুরি।
নার্সিং ছাত্রী
বিপক্ষে
ঝিম্পা রায়
বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ যুব সম্প্রদায়। কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা মারাত্মক। তাই জীবিকার কারণে প্রায় অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এবার বাঙালিকে কাজের সূত্রে দক্ষিণ ভারতে যেতে হলে সেখানকার ভাষা শিখতে হবে, যা একদিনে সম্ভব নয়। আবার যারা কর্মসূত্রে এরাজ্যে আসছে তাদেরও বাংলা শিখতে হবে, এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অনৈতিক দাবি। দক্ষিণ ভারতের ভাষা তুলনামূলকভাবে বেশ শক্ত। একবার ভেবে দেখুন ওঁরা যদি নিজের ভাষা ছাড়া কথা না বলেন, তবে ওখানে গেলে কী চরম সমস্যায় পড়তে হবে আমাদের! যে কোনও ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়।
গৃহবধূ
লক্ষ্মী দাস দত্ত
কাজের ক্ষেত্রে বাংলায় থাকলে বাংলা জানতেই হবে, এ আবার কেমন কথা! তাহলে তো মানুষকে ভাষাবিদ হতে হবে। কারণ আমরা কাজের প্রয়োজনে রাজ্য বা দেশ ত্যাগ করি। যদি আমাকে রাজ্য বা দেশ ছেড়ে যেতে হয় তাহলে সেই জায়গায় যাওয়ার আগে আমাকে ভাষা শিখতে হবে? আমাদের রাজ্যের শ্রমিক বন্ধুরা যখন বাইরের রাজ্যে কাজে যান, তখন কি তাঁরা সেই রাজ্যের ভাষা শিখে যান? বাংলার মানুষ বাইরে গেলে যদি ভাষা শিখে না যায় তাহলে বাইরের মানুষরা বাংলায় এলে কেন ভাষা শিখবে?
শিক্ষক
অয়ন মণ্ডল
অন্য রাজ্য থেকে আমাদের রাজ্যে কাজ করতে হলে বাংলা জানা অবশ্যই কাজে দেবে, তবে তা বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়। কাজের প্রয়োজনে অনেকে এখানে আসেন, কিন্তু তাঁদের মাতৃভাষা ভিন্ন হতে পারে। ভাষা জানার উপর কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ভর করা উচিত নয়, বরং দক্ষতা ও যোগ্যতাই প্রধান হওয়া উচিত। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অনুবাদ ও ভাষাগত সহায়তা সহজলভ্য, তাই বাংলা না জানলেও কাজ করা সম্ভব। ভাষা শেখা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটি জোর করে চাপিয়ে দিলে বহুজাতিক কর্মসংস্কৃতির পরিপন্থী হবে। তাই এটি ব্যক্তিগত পছন্দ হওয়াই উচিত।
ছাত্র
রোহিত রায়
কর্মসূত্রে বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকার দরুন দেখেছি যে কোনও আঞ্চলিক ভাষা শিখতে পারলে যোগাযোগ ও নানা বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। আমি যেমন অন্য রাজ্যের ভাষা একদিনে শিখতে পারব না, ঠিক তেমনই অন্য কেউ বাংলায় এসে একদিনে বাংলা ভাষা শিখতে পারবে না। সেইজন্যই ভারতে হিন্দি, ইংরেজি সহ ২১টি ভাষাকে সরকারিভাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে সহজ যোগাযোগের জন্য। কেউ এই ভাষাগুলোর যে কোনও একটিকে ব্যবহার করতে পারে। ভিন রাজ্যে গিয়ে সেই রাজ্যেরই আঞ্চলিক ভাষা জানতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এই দাবি তাই অযৌক্তিক।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার