নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ৪ জানুয়ারির কথা কোনোদিন ভুলবেন না পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির সপ্তমী। তিন মাসের ছোট্ট রূপাকে (নাম পরিবর্তিত) খাটে শুইয়ে গিয়েছিলেন রান্নার কাজে। একটু পরে ঘরে ফিরে যা দেখেন, তা অভাবনীয় এবং ভয়ঙ্কর। একটি মেঠো ইঁদুর তাঁর তিন মাসের মেয়ের মুখে বসে মাংস খুবলে খাচ্ছে! অসহায় রূপা শুধু গোঙাচ্ছে। প্রথমে গোঙানিটুকুও কানে আসেনি মায়ের। কারণ, পাশের বাড়িতেই ছিল অনুষ্ঠান। তুমুল জোরে বক্স বাজছিল।প্রথমে এলাকার গ্রামীণ চিকিৎসক দুধের শিশুটিকে দেখেন। তারপর তমলুক হাসপাতাল হয়ে রাত ৮টা নাগাদ পৌঁছন পিজি হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে। ক’টাকা রোজগারের আশায় খেজুর রস পাড়তে গিয়েছিলেন স্বামী রাজু পাত্র। সব জেনেশুনে
তাঁর জ্ঞান হারাবার অবস্থা। পিজিতে তখন তিনিও।
ইঁদুরে খুবলে খেয়েছে একরত্তি মেয়েটির নাক, বাম গাল ও বাম হাতের একাধিক আঙুল! মুখমণ্ডল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সেই অবস্থা থেকে কিংবদন্তী আয়ুবেদাচার্য সুশ্রুতের পন্থায় শিশুর কপাল থেকে চামড়া ও মাংস সংগ্রহ করে নতুন নাক তৈরি করলেন পিজি’র ডাক্তাররা। তৈরি হল গাল। দফায় দফায় হল চারটে অপারেশন। তিনবার রক্ত দেওয়া হল তাকে। এইভাবে মুখটি নতুনভাবে তৈরি করে দিলেন প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ কল্যাণ দাস ও তাঁর টিম। অত ছোট এবং অত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া বাচ্চাকে জেনারেল অ্যানাসথেসিয়া দেওয়া চাট্টিখানি কাজ ছিল না। ডাঃ চৈতি মাজি ঠান্ডা মাথায় সারেন সেকাজ।
ডাঃ দাস বলেন, বাবা-মায়ের কাছ থেকে মেয়েটির ছবি সংগ্রহ করে যেমন দেখতে, সেরকম কল্পনা করে ওর কপালের ফ্ল্যাপ থেকে নাক ও বামদিকের গাল তৈরি করি। রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এখন জুড়ে রেখেছি কপালের সঙ্গে। শেষ অপারেশনে আলাদা করে দেব। ও ভালো আছে। আশা করি, শীঘ্রই ছুটি পাবে। যদি কাউকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, তা প্রাপ্য শল্য চিকিৎসার জনক সুশ্রুতের। সুপ্রাচীনকালে অপরাধীদের নাক কেটে দেওয়া হত। তিনি কপাল থেকে চামড়া ও মাংস নিয়ে ফ্ল্যাপ তৈরি করে পুনর্গঠন করতেন তাদের নাকের। এদিকে মেয়েকে দেখে বাবার চোখে জল চলে আসছে বারবার। শুক্রবার রাজু বললেন, ডাক্তারবাবুরা অসাধারণ। কানাকড়িও খরচ লাগেনি পিজিতে। তবে ইনফেকশন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ত বলে বাম হাতের দুটো আঙুল বাদ দিয়েছেন। মেয়ে যখনই সেদিকে তাকাচ্ছে, দেখে খুব কষ্ট পাচ্ছি। তবে ওকে এতটাই লড়াকু বানাব যে, হারিয়ে যাওয়া আঙুলগুলি ছাড়াই ও হয়ে উঠবে জয়ী!