নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এক মহিলার মৃতদেহের ছয় টুকরো মিলেছিল শিয়ালদহ স্টেশনের ভিআইপি পার্কিং লটে। সে খুনের ঘটনার তদন্তে নেমে এক মহিলা সহ তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিস। সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ওই তিন জনকেই ফাঁসির সাজাও শুনিয়েছিল শিয়ালদহ আদালত। কিন্তু সাজা ঘোষণার ছ’বছর পর বৃহস্পতিবার পুলিসি তদন্তে চূড়ান্ত গাফিলতি ও পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণে চূড়ান্ত খামতি থাকায়, ওই তিন জনকেই বেকসুর খালাসের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। সাম্প্রতিক সময়ে যা কি না, নজিরবিহীন বলেই মনে করছে আইনজীবী মহল।
২০১৪ সালের ২০ মে সন্ধ্যায় শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে ভিআইপি পার্কিং লটে ডিউটি করছিলেন রেলপুলিসের সাব-ইনস্পেক্টর অভিজিৎ সাহা। হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ে, একটি ট্রলি ব্যাগ এবং হোল্ডঅল ধরে টানাটানি করছে একটি কুকুর। আর হোল্ডঅলের ভিতর থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। সন্দেহ হওয়ায় অভিজিৎবাবু অন্য পুলিস কর্মীদের ডেকে ট্রলি ব্যাগটি খোলেন। দেখা যায়, ভিতরে রয়েছে এক মহিলার কাটা মাথা, হাত ও পায়ের অংশ। তদন্ত শুরু করে রেল পুলিস। ট্রলি ব্যাগ থেকে পাওয়া একটি রসিদের সূত্র ধরে জানা যায়, ওই মহিলার নাম জয়ন্তী দেব। বাড়ি লেক টাউনে। তদন্তে পুলিস জানতে পারে মহিলার স্বামীর নাম সুরজিৎ দেব। তাঁদের একটি মেয়ে রয়েছে। স্বামীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই ওই দম্পতির মধ্যে অশান্তি হতো। তার জেরে ঘটনার চার বছর আগে থেকেই আলাদা থাকতেন জয়ন্তী ও সুরজিৎ। জয়ন্তী লেক টাউনে থাকলেও, সুরজিৎ থাকতেন বিরাটিতে। তদন্তকারীরা আরও জানতে পারেন, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে লেক টাউনের ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে ওই দম্পতি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পুলিস জানতে পারে, ঘটনার দিন দুপুরে দু’জনের মধ্যে অশান্তি চরমে ওঠে। কিন্তু রাত থেকে তাঁদের আর দেখা যায়নি।
জয়ন্তীর দেহ উদ্ধারের পরের দিন, ২১ মে সুরজিৎকে আটক করে পুলিস। পুলিসের দাবি, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রীকে খুনের কথা স্বীকার করেন তিনি। পুলিসের আরও দাবি, সুরজিৎকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই জানা যায়, ঘটনার পিছনে রয়েছে তাঁর বান্ধবী লিপিকা পোদ্দার এবং বিরাটিরই বাসিন্দা, পেশায় কসাই সঞ্জয় বিশ্বাস।
পুলিসের দাবি, ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৯ মে সন্ধ্যায় সুরজিৎ ও জয়ন্তীর ঝগড়া চরমে ওঠে। সে সময়ে তাঁদের মেয়ে ছিল জেঠুর বাড়িতে। গোলমালের মধ্যে স্ত্রীর মাথায় প্রদীপদানি দিয়ে আঘাত করে সুরজিৎ। অচৈতন্য হয়ে পড়েন জয়ন্তী। এর পরেই সুরজিৎ ফোন করে লিপিকাকে ডাকে। পরে দু’জনে মিলে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করে জয়ন্তীকে। এরপর দেহ লোপাটের জন্য লিপিকা যোগাযোগ করে সঞ্জয়ের সঙ্গে। ১২ হাজার টাকার বিনিময়ে দেহটি পাচার করতে রাজি হয় ওই যুবক। সেই মতো জয়ন্তীর দেহ ছ’টুকরো করে ট্রলি এবং হোল্ড অলে ভরে, গাড়ি ভাড়া করে শিয়ালদহে যায় তিন জন। পার্কিং লটে ব্যাগ দু’টি ফেলেই চলে যায় তাঁরা।
এই ঘটনায় সুরজিৎ দেব, লিপিকা পোদ্দার ও সঞ্জয় বিশ্বাস তিন জনেরই ফাঁসির সাজা শোনান তৎকালীন শিয়ালদহ প্রথম অতিরিক্ত দায়রা আদালতের বিচারক জীমূতবাহন বিশ্বাস। সেই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে তিন জনই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ শুনানির পর হাইকোর্ট জানিয়েছে, শুধু ১৬৪ ধারায় এক জনের গোপন জবানবন্দির ভিত্তিতে নিম্ন আদালত ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে। পুলিস যে পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণ পেশ করেছে, তাতে যথেষ্ট খামতি রয়েছে। যে কারণে তিন আসামিকেই এদিন বেকসুর খালাসের নির্দেশ দেয় বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ শাব্বার রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ।