কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিরা নিরীহ পর্যটকদের নির্মম ভাবে গণহত্যা করার পর ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সাজোসাজো রব। স্থল-জল-অন্তরীক্ষে দু’পক্ষের সামরিক মহড়া শুরু হতেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি না ছাড়ার অঙ্গীকারে শান দিচ্ছে দুই শিবিরই। শেষ পর্যন্ত ৭১-এর স্মৃতি উস্কে দেওয়া, নাকি আরও একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—কোন পথে এগবে ভারত তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু ‘বদলা’ নেওয়ার প্রথম ধাপে ভারত ও পাকিস্তান একে-অপরের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাতেই লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য হল, ভারতের তরফে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত ঘোষণা ও বাণিজ্যচুক্তি বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে, পাকিস্তানও বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তি স্থগিত রাখার কথা জানিয়ে দিয়েছে। দু’ দেশের মধ্যে প্রথম ধাপের এই কূটনৈতিক লড়াইয়ে পাকিস্তান পাল্টা মস্তানি দেখাতে গিয়ে নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে কি না সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ। ঘটনা হল, পাকিস্তানকে হাতে মারার আগে ভাতে ও জলে মারার এই অগ্নিবাণে ভারতের কার্যত হারানোর কিছু নেই। কিন্তু এতে পাকিস্তানের সর্বনাশ যে অনিবার্য, তা সাদা চোখেই পরিষ্কার। অতএব অন্যান্য দেশের সমর্থন নিয়ে ভারত কূটনৈতিক স্তরে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েই এগতে চাইছে। এর পাল্টা পেনসিল ছাড়া পাকিস্তানের হাতে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে পাকিস্তানের পরাজয় ও আত্মসমর্পণের পর ১৯৭২-এর ২ জুলাই হিমাচল প্রদেশের সিমলায় দু’দেশের মধ্যে সিমলা চুক্তি হয়। সেইমতো, কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অফ কন্ট্রোল) মেনে চলার শর্ত মেনে নেয় উভয়পক্ষ। কিন্তু বাস্তব হল, ভারতের অভিযোগ উড়িয়ে বারবার নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে এ দেশের সীমানায় ঢুকেছে পাকিস্তানি ফৌজ। যেমনটা হয়েছিল সিয়াচেন বা কার্গিল যুদ্ধের সময়। এখন পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে সিমলা চুক্তি স্থগিত ঘোষণা করায় নিয়ন্ত্রণ রেখার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, চুক্তি স্থগিত হলে ভারতেরও নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করায় বাধা থাকবে না। পাকিস্তান এতদিন যে কাজ অবৈধভাবে করছিল, ভারত তা এখন বৈধভাবে করতে পারবে। আর তা হলে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের দখল নিতে ভারতের আর কোনও বাধা থাকার কথা নয়। অন্তত খাতায় কলমে। তাই এই চুক্তি স্থগিতে ভারতের লাভের সম্ভাবনাই বেশি। ধরা যাক, সিন্ধু জলচুক্তির কথা। গত সাড়ে ছয় দশকে অনেক টানাপোড়েন সত্ত্বেও সিন্ধু জলচুক্তিতে হাত পড়েনি। কিন্তু এবার মোদি সরকার এই চুক্তি স্থগিত ঘোষণা করেছে। বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দু’দেশের মধ্যে হওয়া এই চুক্তিতে বলা হয়, সিন্ধু ও তার দুই উপনদী বিতস্তা ও চন্দ্রভাগার ৮০ শতাংশ জলের উপর কর্তৃত্ব বা অধিকার থাকবে পাকিস্তানের। আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তিন উপনদী বিপাশা, শতদ্রু ও ইরাবতীর জল। তথ্য বলছে, পাকিস্তানের কৃষিসেচের ৮০ শতাংশ নির্ভরশীল সিন্ধু ও তার উপনদীর জলের উপর। পাকিস্তানের জিডিপির ২১ শতাংশ কৃষির উপর নির্ভরশীল। সেদেশের ৪৫ শতাংশ কর্মজীবীর আয়ের উৎস কৃষিকাজ। এই প্রেক্ষিতে ভারত সিন্ধু চুক্তি থেকে বেরিয়ে এলে পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জীবনজীবিকা যে বড় রকম ধাক্কা খাবে, তাতে সন্দেহ নেই। এই বিপদ আঁচ করেই ভারতের জলচুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ‘জলযুদ্ধ’ বলে তোপ দেগেছে পাকিস্তান সরকার। তবে এটাও ঠিক, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও কয়েকবছর সময় দরকার ভারতের। এটা আজ চাইলে কালই হয়ে যাওয়ার নয়। তবু কূটনৈতিক চালে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ঢের এগিয়ে। সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতা পাকিস্তানকে সবক শেখাতে ভারত রীতিমতো প্রস্তুত।
বাণিজ্য ক্ষেত্রেও দিল্লির কড়া পদক্ষেপে ভারতের তেমন কোনও লোকসান দেখছেন না অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা। বরং অনেক বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা পাকিস্তানের। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের প্রথম ২৫টি রপ্তানি বাজারের মধ্যে পাকিস্তান নেই। এ দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ০.০৬ শতাংশ হয় পাকিস্তানের সঙ্গে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের প্রথম দশ মাসে ভারত রপ্তানি করেছে মোট ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে পাকিস্তানে গিয়েছে মাত্র ৪৭.৬৫ কোটি ডলারের পণ্য। আর পাকিস্তান থেকে তৈরি পোশাক, ফল, নুনের মতো কয়েকটি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য মাত্র ৪.২ কোটি ডলার। পক্ষান্তরে ভারত থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি হয়েছে ওষুধ, সার, চা-কফি, চামড়া, ইস্পাত, আনাজপাতি, চিনি, গাড়ির যন্ত্রাংশের মতো একাধিক পণ্য। এসব তথ্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে, প্রথম রাউন্ডে বিনা রক্তপাতে ‘অ্যাডভান্টেজ’ ভারতের। এরপর গোলাগুলি শুরু হলে জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা ও সাহায্যকারী ইসলামাবাদ অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে।