নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বীরভূমের ‘পাথর সম্রাট’ টুলু মণ্ডল ওরফে নিজামউদ্দিনের বাড়িতে বিএমডব্লু, মার্সিডিজ, অডি গাড়ির ছড়াছড়ি! সব মিলিয়ে ২৪২টি। বেশিরভাগই বিলাসবহুল। আর একাধিক ডাম্পার। বেআইনি খাদান থেকে পাথর আনার জন্য। তারও এক একটির দাম ৬০-৭০ লক্ষ টাকা। সেগুলির ডালা এতটাই উঁচু ছিল যে, তাতে কী যাচ্ছে, বাইরে থেকে দেখে বোঝা দায়। গাড়ির এই বহর দেখে তাজ্জব বীরভূম জেলা পুলিশের তদন্তকারী অফিসাররা। সবক’টিই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সঙ্গে চলছে লাগাতার খানা-তল্লাশি। প্রশ্ন একটাই—আর কত ‘সম্পদ’ ছড়িয়ে রয়েছে টুলুর? আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে হানা দিয়ে যে নগদ ও সোনা উদ্ধার হয়েছিল, তার মোট অঙ্কই পৌঁছে গিয়েছে ৫৩ কোটিতে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মিলেছে ৯৩ কোটি টাকা। সেই সবটাই ফ্রিজ করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, টুলুর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মিলেছে একটি ফুলস্কেপ খাতা। সেটাই এখন তদন্তকারীদের তুরুপের তাস। কারণ, কাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, কার থেকে টাকা মিলেছে, এই সবই লেখা রয়েছে তাতে।
টুলু মণ্ডলের বাড়িতে হানা দেওয়ার পর থেকেই পরতে পরতে খুলছে তাঁর সম্পত্তির খতিয়ান। শুক্রবার নবান্নে এ নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি জানিয়েছেন, ‘মিনারের বাড়ি থেকে ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা ও বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারের মোট মূল্য ৫০ কোটি টাকা। টুলুর যতগুলি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাতে ৯৩ কোটি টাকা রয়েছে। এই সবেরই লেনদেন বন্ধ করেছে জেলা পুলিশ। বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয়েছে আরও ৫৪ লক্ষ টাকা নগদ। এই টাকা যে টুলুর, তা তাঁর আত্মীয়রাও স্বীকার করেছেন। এর বাইরে ২৬৮ গ্রাম সোনা, ৪০০ গ্রাম রুপো ও ২৩ গ্রাম প্ল্যাটিনাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। মিলেছে তিনটি টাকা গোনার যন্ত্র, ডিসিআর, চেক বই, সিপিইউসহ বিভিন্ন নথি। টুলুর ৮৩টি ট্রাক ও ডাম্পার উদ্ধার হয়েছে। এর বাইরে তাঁর বাড়িতে অডি, বিএমডব্লুর মতো একাধিক গাড়িও বাজেয়াপ্ত করেছেন তদন্তকারীরা।’ এই কাজের জন্য রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তা ও বীরভূমের এসপি বিদিত রাজ বুন্দেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু আরও বলেন, ‘টুলুর ২১টি সম্পত্তি মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে সাতটা বাড়ি, দুটো পেট্রল পাম্প, একটি ইটভাঁটা, তিনটে স্টোন মাইন, দু’টি ক্রাশার। এই স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিঘা। এগুলি আইনানুযায়ী বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। টুলুর হিসাবরক্ষক পিনাকী দে, সহকারী হিসাবরক্ষক রাকিবুল ইসলাম, পেট্রল পাম্পের ম্যানেজার সহ পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
জেলা পুলিশ সূত্রে খবর, পাথর খাদান থেকে আসা অবৈধ টাকা পাচার করা হতো টুলুর বিলাসবহুল গাড়িতে করেই। তাঁর গাড়ি ‘পাইলট’ করত পুলিশের ভ্যান। স্থানীয় থানার তদানীন্তন এক ওসি এই টাকা পাচারে টুলুকে সাহায্য করেন বলে অভিযোগ। এমনকি, তাঁর ভয়ে কাঁপতেন জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও। বেআইনি ব্যবসা চালানোর জন্য তিনি বিভিন্ন মহলে দু’হাতে টাকা বিলোতেন। তার মধ্যে রাজনৈতিক নেতা থেকে পুলিশের পদস্থ অফিসার, অনেকেই ছিলেন। এর প্রমাণ মিলছে টুলুর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া একটি খাতায়। সূত্রের খবর, সেখানে প্রতিদিন কত টাকা কোন খাদান থেকে আসত, নগদের ডিনমিনেশন কী, কে টাকা নিয়ে এসেছে, কার কার কাছে এই টাকা গিয়েছে, কে পৌঁছে দিয়েছে, তার যাবতীয় তালিকা রয়েছে। হাতেই লেখা হত হিসাব। সেটি রাখতেন টুলুর আত্মীয় মিনার। তদন্তকারীরা জেনেছেন, টুলুর টাকা ভরতি গাড়ি পৌঁছেছে ক্যামাক স্ট্রিটে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তার প্রমাণ এসেছে বলে খবর। যাঁরা এই টাকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁদের তালিকা তৈরি করে নোটিস দিয়ে ডাকা হবে।