Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

২২ গজের হিটম্যান

নাগপুরের বানসোদে ধুলোমাখা এক কামরার ঘর। জানলা দিয়ে রোদ কম, দারিদ্র্য বেশি ঢোকে

২২ গজের হিটম্যান
  • ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একদিনের ক্রিকেটে আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে তিনি রয়েছেন প্রথম স্থানে। তাঁর হাত ধরেই ভারতে এসেছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও টি-২০ বিশ্বকাপ। তিনি রোহিত শর্মা। অনুরাগীদের কাছে তাঁর পরিচয় ‘হিটম্যান’ নামে। এই বিখ্যাত ক্রিকেটারের ছেলেবেলার লড়াইয়ের কাহিনি তুলে ধরলেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়।

Advertisement

নাগপুরের বানসোদে ধুলোমাখা এক কামরার ঘর। জানলা দিয়ে রোদ কম, দারিদ্র্য বেশি ঢোকে। সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন গুদামের কেয়ারটেকার গুরুনাথ শর্মা। কিন্তু তাঁর ছেলে শূন্য আকাশে চেয়ে স্বপ্ন দেখে। পুরনো টেনিস বল আর ভাঙা ব্যাট নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত ছেলেটি। হামেশাই আদুরে গলায় বায়না করে, ‘বাবা, আমি ক্রিকেটার হব।’ কিশোরের স্বপ্নভরা দু’চোখ দেখে একদিন গুরুনাথ ঠিক করে ফেলেন, ছেলেকে ক্রিকেট শেখাবেন। তাই ভাইয়ের সাহায্যে মুম্বইয়ের বোরিভালিতে ঠাকুরদা-ঠাকুরমার কাছে রেখে আসেন তিনি। ভর্তি করেন মুম্বইয়ের স্কুলে। কিন্তু ক্রিকেট সরঞ্জাম কেনার পয়সা কোথায়? ছেলেটিও বাবার অবস্থা দেখে কিছু চাইতে পারে না। তাই সে ঠিক করে নিজেই কিছু উপার্জন করে খেলার সরঞ্জাম কিনবে। তাই দুধের প্যাকেট ডেলিভারির কাজ করতে থাকে। স্বপ্নপূরণের পথে কোনও বাধাই তাকে দমাতে পারেনি। আজ সেই ছেলেটিই বিশ্বক্রিকেটের মহাতারকা! হিটম্যান! হ্যাঁ, ঠিকই পড়লে ছোট্ট বন্ধুরা। সেই ছোট্ট ছেলেটি আর কেউ নন, রোহিত শর্মা। ভারতের টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক। শৈশবের সেই কষ্ট এখনও তাঁর হাঁকানো গগনচুম্বী ছক্কায় প্রতিধ্বনিত হয়।
১৯৮৭ সালের ৩০ এপ্রিলে রোহিতের জন্ম হয়েছিল নাগপুরে ঠিকই। কিন্তু তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে স্বপ্ননগরী মুম্বই। স্কুল ক্রিকেটে খেলার সময় একদিন তাঁর প্রতিভা চোখে পড়ে কোচ দীনেশ লাডের। তিনি তাঁকে পরামর্শ দেন স্বামী বিবেকানন্দ স্কুলে ভর্তি হওয়ার। আর রোহিতের পরিবার তা মেনেও নেয়। শুরুর দিকে রোহিত অফস্পিনার ছিলেন। কিন্তু বিবেকানন্দ স্কুলে একদিন তাঁকে স্যাডো প্র্যাকটিস করতে দেখেন কোচ। পরে তাঁকে ব্যাটিংয়ে সুযোগ দিতেই চোখ কপালে কোচের। রোহিতের ব্যাটিংয়ে রীতিমতো মুগ্ধ তিনি। এরপর ব্যাটার হিসেবেই চলতে থাকে তালিম। ক্রমেই রোহিত শর্মার নাম ছড়িয়ে পড়ে মুম্বইয়ে। অনূর্ধ্ব-১৭ ও ১৯ দলেও স্থান পান। দেওধর ট্রফিতে রোহিতের অভিষেক হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর বয়সেই। ২০০৭ টি-২০ বিশ্বকাপে জাতীয় দলেও সুযোগ পান তিনি। আর মেগা আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অর্ধশতরান করে জানান দেন, রোহিত শর্মা লম্বা রেসের ঘোড়া। বিরাট কোহলি এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘একটা সময় রোহিত শর্মার হেব্বি নামডাক ছিল। তখন ভাবতাম আমরাও তো উঠতি ক্রিকেটার। কিন্তু আমাদের নিয়ে কেউ আলোচনা করে না। তারপর ২০০৭ সালে প্রথম রোহিতের ব্যাটিং দেখলাম। তখনই রোহিতের প্রতিভা বুঝতে পারি। নিজেকেই বলছিলাম, আজকের পর আর রোহিতকে নিয়ে কোনও কথা নয়। অসাধারণ ক্রিকেটার। ব্যাটিংয়ের সময় বাকিদের থেকে যেন দেড় সেকেন্ড বেশি সময় থাকে তার কাছে।’ ২০০৮ আইপিএলে ডেকান চার্জার্সের হয়ে অভিষেক হয় রোহিতের। ২০০৯ সালে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতেও বড় ভূমিকা রাখেন। এরপর ২০১১ সালে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে যোগ দেন তিনি। ২০১৩ সালে ওই ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্যাপ্টেনের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে ওঠে। বাকিটা তো ইতিহাস। রোহিতের অধীনে এক-আধবার নয়, পাঁচবার আইপিএল জিতেছে মুম্বই। সেই সাফল্যের মাঝেও জাতীয় দল থেকে বারবার বাদ পড়া, নম্বর আটে বসে থাকা— আত্মবিশ্বাস বাড়াতে লড়াই করে গিয়েছেন তিনি। ২০১১ সালে দেশের মাটিতে আয়োজিত ওডিআই বিশ্বকাপের স্কোয়াডে জায়গা হয়নি তাঁর। মিডল অর্ডারে তাঁকে ব্যর্থ হতে দেখে তত্কালীন ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিং ধোনি রোহিতকে ওপেন করান। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ওপেনার হিসেবে বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে জন্ম নেন ‘হিটম্যান’। ২০১৪ সালে ইডেন গার্ডেন্সে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর ২৬৪ রানের ইনিংস আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মননে গাঁথা। যা একদিনের ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের নজির। শুধু তাই নয়, একদিনের ক্রিকেটে তিনটি দ্বিশতরানের রেকর্ডের মালিক হিটম্যান। ওডিআই, টি-২০, টেস্ট— সব ফরম্যাটেই সেঞ্চুরির কীর্তি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
ক্যাপ্টেন হিসেবেও সফল হিটম্যান। মুম্বইকে পাঁচবার আইপিএল জেতানো তো আছেই। নেতা হিসেবে জাতীয় দলকেও অনেক সাফল্য এনে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের পর দীর্ঘদিন আইসিসি ট্রফি পায়নি ভারত। তারজন্য ২০২১ সালের শেষদিকে বিরাটকে সরিয়ে ওডিআই ও টি-২০’তে ক্যাপ্টেন করা হয় রোহিতকে। পরে ২০২২ সালে বিরাট টেস্টের অধিনায়কত্ব ছাড়লে তিন ফরম্যাটেই নেতা হন হিটম্যান। ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু খেতাবি লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। তবে ২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে কোনও ভুল হয়নি। দেশকে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতিয়ে দীর্ঘদিনের আইসিসি ট্রফির খরা কাটান। আর সেদিনই টি-২০ ফরম্যাটকে আলবিদা বলেন। ২০২৫ সালে ভারতকে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও জেতান রোহিত। তবে টেস্টে গত বছর বর্ডার-গাভাসকর ট্রফিতে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স মেলে ধরতে পারেননি তিনি। দেশে ফিরে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। কিন্তু এত সাফল্য দেওয়ার পরও ওডিআই ফরম্যাটে তাঁকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকী, বাদ দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু রোহিতও যে হার মানার পাত্র নন। চলতি বছর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে প্রমাণ করেন, ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।’ কোচ দীনেশ লাড আশাবাদী, ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলবেন তাঁর ছাত্র। ব্যর্থতার কানাগলি থেকে সাফল্যের রাজপথ, দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে স্টেডিয়ামের আলো— রোহিত শর্মা শুধু একজন ক্রিকেটার নন, অনুরাগীদের কাছে আবেগের অপর নাম। নাগপুরের সেই ছোট্ট ছেলে আজ কোটি কোটি হৃদয় জয় করেছেন। শহরের জনতার কাছে তিনি— ‘মুম্বই কা রাজা’।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ