নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পূর্বতন সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের জায়গা নিতে চলেছে বিজেপি সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনা। আর তাই এবার বাংলার মহিলারা ১৫০০ টাকার বদলে পাবেন তিন হাজার টাকা। আগামী ৩ জুন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু তার আগেই উপভোক্তা সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ডবল ইঞ্জিন সরকার। কারণ, পূর্বতন সরকারের শেষ অন্তর্বর্তী বাজেটে দেওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তা সংখ্যা বর্তমান সরকারের হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। অন্তর্বর্তী বাজেটে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার জানিয়েছিল, ২ কোটি ২১ লক্ষ প্রাপকের সঙ্গে নতুন ২০ লক্ষ ৬২ হাজার উপভোক্তা যুক্ত হয়ে ‘লক্ষ্মী’র মোট সংখ্যা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লক্ষ। কিন্তু বুধবার অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেতেন ২ কোটি ২০ লক্ষ উপভোক্তা। এই পরিসংখ্যান থেকে আরও ৩০ লক্ষ নাম বাদ যেতে চলেছে। তাঁরা হয় ভুয়ো, না হলে এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠেনি। অর্থাৎ, উপভোক্তা সংখ্যা নেমে আসছে ১ কোটি ৯০ লক্ষে। এই ৩০ লক্ষের হিসাব বাদ রেখেও প্রশ্ন উঠছে, ২২ লক্ষ উপভোক্তা কোথায় গেল? স্রেফ গায়েব? নাকি দু’মাস আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে পূর্বতন সরকার ঘোষিত ২ কোটি ২১ লক্ষের অঙ্কেই অনড় থাকতে চাইছে নয়া প্রশাসন? সেই হিসাব কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। তারপর যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছেন, তাঁরা কি প্রথম দফাতেই বিনা কারণে বাদ পড়লেন?
৫ ফেব্রুয়ারি বাজেটে নতুন উপভোক্তা যুক্ত করার পাশাপাশি ৫০০ টাকা করে বাড়িয়েছিল পূর্বতন সরকার। বর্ধিত হারে উপভোক্তাদের টাকা দেওয়া শুরু হয় পরের দিনই। অর্থাৎ, ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। সেই সময়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তফসিলি জাতির ৩১ লক্ষ ৩৪ হাজার ২৩০, তফসিলি উপজাতির ৪৬ হাজার ৯০০ এবং সাধারণ ক্যাটিগরির ২ কোটি ৫ লক্ষ ১ হাজার ৬২৩ জন সুবিধা পেতে শুরু করেছিলেন। সেই কারণে প্রতি মাসে এই বাবদ রাজ্য সরকারি খরচ ২২৭৮.৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৬৯৭.৫ কোটিতে।
পালাবদলের পর চলতি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ হবে না বলেই কথা দিয়েছিল রাজ্যের নতুন সরকার। এমনকি বলা হয়েছিল, যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান, তাঁরা সকলেই অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় আসবেন। তবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকের তালিকায় অসংগতি মেলায়, ফের সকলে আবেদনপত্র দাখিল করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যের বর্তমান সরকার। তা যাচাই করেই পর্যায়ক্রমে অন্নপূর্ণা যোজনার তালিকায় সংযোজিত হবেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকরা। তবে অন্নপূর্ণার তালিকায় সংযোজন না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ আগামী তিন মাস তাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দেড় হাজার টাকা করে পাবেন। কিন্তু, অন্নপূর্ণার টাকা পেতে হলে তার মধ্যে ১২ পাতার আবেদনপত্রে পরিবারের নাড়িনক্ষত্র সব দিতে হবে। সর্বত্র সমালোচনার চাপে এই ফর্ম সরলীকরণের কথা রাজ্য ভাবতে শুরু করলেও অনেকেই এত তথ্য দিতে দোটানায় ভুগবে বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের। সেক্ষেত্রে এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া এবং ভুয়ো উপভোক্তা ছাড়া বাকি সকল উপভোক্তার আবেদন জমা পড়া নিয়েও সংশয় রয়ে যাচ্ছে। এবং সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন ঝুলছে ‘উধাও’ হয়ে যাওয়া ২২ লক্ষ উপভোক্তাকে নিয়ে। এই প্রাপককুল কারা? বাংলার সেই ‘লক্ষ্মী’রা নিজেরাও জানেন না।