নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কারও বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জল-জঙ্গল ঘেরা প্রত্যন্ত এলাকায়। কারও ঠিকানা উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা কোনও গ্রাম। প্রত্যেকের পরিবারেই আর্থিক অনটন তীব্র। সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছিল দালালরা। মিউজিক ভিডিওর অ্যালবাম তৈরির টোপ দিয়ে নাবালিকাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিহারে। সেখানে তাদের আটকে রেখে অশ্লীল নাচ পরিবেশনে বাধ্য করা হচ্ছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে পশ্চিমবঙ্গের আট নাবালিকা সহ মোট ১৭ জনকে উদ্ধার করল বিহার পুলিস। গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচ জনকে।
চলতি মাসের ২৩ তারিখ ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অব চাইল্ড রাইটস’-এর তরফে অভিযোগে বলা হয়, পাঁচটি রাজ্য থেকে নাবালিকাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিহারের সারণের মাশরাক, পানাপুর ও ইসিয়াপুর এলাকায়। কয়েকটি অর্কেস্ট্রা পার্টি তাদের বিভিন্ন হোটেল, বিয়েবাড়ি সহ অন্যান্য অনুষ্ঠানে অশ্লীল নাচ নাচতে বাধ্য করছে। সারণ পুলিসের এসপি কুমার আশিস ‘বর্তমান’-কে জানান, অভিযোগ আসার পর বিশেষ টিম তৈরি করে প্রথমে অর্কেস্ট্রা পার্টি বা তথাকথিত নাচগানের দলগুলি চিহ্নিত করা হয়। জানা যায়, বিহারের এই অর্কেস্ট্রা পার্টিগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার কিছু লোকের যোগসাজশে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব তথ্য হাতে আসার পর শুক্রবার রাতে তিনটি জায়গায় তল্লাশি চালায় পুলিস। তখন কয়েকজন নাবালিকার ‘অনুষ্ঠান’ চলছিল। আরও কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়েছিল একটি হোটেলে। সবক’টি জায়গা থকে মোট ১৭ নাবলিকাকে উদ্ধার করে পুলিস। এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আটজন, ওড়িশার চারজন, দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডের দু’জন করে এবং বিহারের একজন রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাবালিকাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, তাদের বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। কিছুদিন আগে এক যুবক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সে গানবাজনা করত এবং সেই সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করতে যেত। ওই যুবক তাদের বলে, মিউজিক ভিডিওর অ্যালবাম প্রকাশের জন্য বিহারের একটি কোম্পানি মেয়ে খুঁজছে। ভিডিওগুলি বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হবে। পাঠানো হবে মুম্বইতেও। বলিউডের কারও নজরে পড়লে সুযোগ মিলে যেতে পারে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে! সেই সঙ্গে অ্যালবাম পিছু মিলবে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা। এহেন ‘লোভনীয়’ প্রস্তাব অগ্রাহ্য করতে পারেনি অনেকেই। উদ্ধার হওয়া কিশোরীরা পুলিসকে জানিয়েছে, ওই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর তাদের বিহারের একটি হোটেলে নিয়ে যায় যুবক। সেখানে তাদের বিহারের অর্কেস্ট্রা পার্টির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তাদের অশ্লীল পোশাক পরিয়ে হোটেলের পার্টি থেকে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে নাচতে বাধ্য করা হয়। অন্য রাজ্যের নাবালিকাদেরও একইরকম প্রলোভন দেখিয়ে আনা হয়েছিল। তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, মোটা টাকার বিনিময়ে ওই নাবালিকাদের আসলে অর্কেস্ট্রা পার্টির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের অশ্লীল নাচ থেকে দেহ ব্যবসায় পর্যন্ত নামতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্কেস্ট্রা পার্টির যে পাঁচ জনকে ধরা হয়েছে, তাদের জেরা করে এই চক্রের ‘নেটওয়ার্ক’ ভাঙার চেষ্টা চলছে।