মৃণালকান্তি দাস: হোয়াইট হাউসের শেফরা ওয়েস্ট উইংয়ে তখন রোজমেরি চিকেন, সেলারি রুট পিউরি এবং কলার্ড গ্রিনসের প্লেট সাজাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ই ওভাল অফিস থেকে উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুরু করে।
মৃণালকান্তি দাস: হোয়াইট হাউসের শেফরা ওয়েস্ট উইংয়ে তখন রোজমেরি চিকেন, সেলারি রুট পিউরি এবং কলার্ড গ্রিনসের প্লেট সাজাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ই ওভাল অফিস থেকে উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুরু করে।
অফিসের ভিতরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁদের অতিথি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করছেন। এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অভূতপূর্ব সংকট যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হল। ইউক্রেনের সমর্থকদের জন্য যা ছিল এক হতাশাজনক মুহূর্ত। মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে দুই একরোখা নেতার বৈঠক কীভাবে ভণ্ডুল হতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠল ২৮ ফেব্রুয়ারি। তবে এমন পরিস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। আলোচনার কেন্দ্র ছিল ইউক্রেনের বিরল খনিজসম্পদ নিয়ে একটি নতুন চুক্তি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে ইউক্রেনকে অত্যন্ত অপছন্দ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। জেলেনস্কিকে ঘৃণাই করেন তিনি। প্রথম দিকে কিন্তু দু’জনের সম্পর্ক এমন ছিল না। বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সূত্রের খবর, ওই সময়ে জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। পরের বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতার বিরুদ্ধে ওঠে ভোট প্রভাবিত করার অভিযোগ। এর জন্য তিনি ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টকে কাজে লাগিয়েছেন বলে ব্যাপক প্রচার শুরু করে দেয় বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। গোটা পর্বে এর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি জেলেনস্কি। ভোটে পরাজিত হন ট্রাম্প। এর আগে সেই বছরই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা হয় ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব। যদিও তাতে তেমন লাভ হয়নি। পরবর্তী কালে তদন্তে জানা যায়, ইমপিচমেন্টের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনা ছিল কিয়েভের মস্তিষ্কপ্রসূত। ফলে ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের ঘৃণা বাড়তে শুরু করে সেই সময় থেকেই। এটা মার্কিন অফিসারদের অজানা নয়।
তাই জেলেনস্কিকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে কীভাবে আচরণ করা উচিত। ট্রাম্প তোষামোদকারীদের প্রতি সংবেদনশীল এবং তিনি কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছেন, তা নিয়েও বেশ সচেতন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যেন তিনি আলোচনাকে খনিজ চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন এবং বিতর্কে না জড়ান।
জেলেনস্কি যখন হোয়াইট হাউসের প্রবেশদ্বার পেরোলেন, তখন কেউ কল্পনাই করতে পারেনি, পরবর্তী ১৩৯ মিনিট কতটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠবে। জেলেনস্কির কালো এসইউভি থেকে নামার সময়ই কিছু মার্কিন অফিসার দূর থেকেই একটা সমস্যা শনাক্ত করেছিলেন, তা হল জেলেনস্কির পোশাক। তার সেই চিরাচরিত পোশাক ম্লান সবুজ সামরিক শার্ট ও প্যান্ট পরে এসেছিলেন তিনি। যথারীতি ট্রাম্প বিদ্রুপের সুরে বলেছিলেন, ‘ওহ, তোমরা তো সবাই বেশ সেজেগুজেই এসেছ।’ ওভাল অফিসের বৈঠক উত্তপ্ত বিতর্কে রূপ নেওয়ার আগে, এক সাংবাদিকও জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কেন আমেরিকার সর্বোচ্চ অফিসে স্যুট পরে আসেননি?’ জেলেনস্কি ইংরেজিতে জবাব দেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমি পোশাক পরব। হয়তো তোমার মতো কিছু, হয়তো আরও ভালো কিছু...।’
এর আগে হোয়াইট হাউসে আসা অন্যান্য বিদেশি নেতাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, জেলেনস্কি খালি হাতে যাননি। তিনি ইউক্রেনের বিখ্যাত বক্সার অলেক্সান্ডার উসিকের ইউএফসি বেল্ট নিয়ে গিয়েছিলেন। সোনালি রঙের সেই বেল্ট, যা আলোচনার সময় পাশের টেবিলে রাখা ছিল। আলোয় ঝলমল করছিল। তবে আলোচনায় সেই উপহার কোনও গুরুত্বই পায়নি। বৈঠকের শুরুটা অবশ্য ভালো ভাবেই হয়েছিল। একেবারে গোড়ার দিকে জেলেনস্কিকে ‘দুর্দান্ত ব্যক্তি’ বলে সম্বোধনও করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই মেজাজ হারিয়ে ফেলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের সামনেই জেডি ভান্সের সঙ্গে কথা বলতে বলতে গলা চড়ান তিনি। বলেন, ‘ওবামা ছিলেন। তারপর ট্রাম্প ছিলেন, বাইডেন ছিলেন, এখন আবার ট্রাম্প এসেছেন। ২০১৪ সালে কিন্তু কেউ পুতিনকে আটকাননি। উনি বিনা বাধায় আমাদের দেশ দখল করেছেন। মানুষ মেরেছেন।’ ঠিক তখনই বদলে যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের শরীরী ভাষা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্স বলেন, ইউক্রেনকে যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে আর্থিক এবং সামরিকভাবে সাহায্য দিয়ে আসছে আমেরিকা। কিন্তু, বিনিময়ে শুকনো ধন্যবাদটুকুও জানাননি জেলেনস্কি। যদিও এই অভিযোগ মানতে চাননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ওভাল অফিসের ঘরে বসেই চোয়াল শক্ত করে তিনি বলে ওঠেন, ‘অনেকবারই আপনাদের ধন্যবাদ দেওয়া হয়েছে।’
জেলেনস্কির উপর রীতিমতো ক্ষেপে ওঠেন ট্রাম্প। বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নিয়ে আপনি ছিনিমিনি খেলছেন। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন। আমেরিকাকে অপমান করছেন।’ এই হুমকি উপেক্ষা করে পাল্টা তর্ক চালিয়ে যান ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট। শুধু তা-ই নয়, এই সময়ে যথেষ্ট উত্তেজিত ছিলেন তিনিও। বৈঠকের শেষের দিকে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা এই যুদ্ধে জিততে পারবেন না। আমাদের সাহায্যে আপনি এর মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। আমাদের অস্ত্র না-পেলে দু’সপ্তাহও টিকত না এই যুদ্ধ।’ সঙ্গে সঙ্গেই জেলেনস্কি বলে ওঠেন, ‘আমি পুতিনের কাছ থেকেও একই কথা শুনেছিলাম। উনিও বলেছিলেন, যুদ্ধ তিনদিনও টিকবে না।’ এভাবেই চলে বাক-বিতণ্ডা। ফলে ১৩৯ মিনিটে বদলে যায় সব। উল্টো স্রোতে পা ফেলার ইঙ্গিত দেয় ট্রাম্পের আমেরিকা। জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের রাগের বহু কারণ রয়েছে। বৈঠকে তারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারে দায়িত্বে ছিলেন পল মানাফোর্ট। একটা সময়ে ইউক্রেনের প্রাক্তন রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের হয়ে কাজ করতেন তিনি। কিয়েভকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে দূরে রেখেছিলেন তিনিই। মস্কোর প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্যের জেরে ভিক্টরের উপর আম জনতার ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে উধাও হয়ে যান তিনি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের দলীয় সদর দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করে উন্মত্ত জনতা। সেখান থেকে হাতে লেখা ‘ব্ল্যাক লেজার’ নামে একটি বই উদ্ধার হয়। বইটিতে একাধিক বার মানাফোর্টের নাম লেখা ছিল। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নামের পাশে অন্তত ২২ বার ১.২৭ কোটি ডলার নিয়েছেন বলে উল্লেখ ছিল। ওই টাকা ট্রাম্পের প্রচারে খরচ করার অভিযোগ ওঠে। যদিও গোটা ঘটনাটি অস্বীকার করেন মানাফোর্ট। ২০১৬ সালের আগস্টে এই খবর ফলাও করে প্রকাশ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তখন আর বাকি মাত্র তিন মাস। সে বছর ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন হিলারি ক্লিন্টন। ভোটের পর প্রেসিডেন্ট হলেও রাশিয়ার থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তাড়া করে বেড়িয়েছে ট্রাম্পকে। আর এর জন্য ইউক্রেনকেই দায়ী করেন তিনি।
গত বছরের মার্কিন নির্বাচনে ফের নাক গলানোর অভিযোগ ওঠে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ ছিলেন সাবেক ডেমোক্র্যাটিক দলের নেত্রী কমলা হ্যারিস। জেলেনস্কি তাঁর হয়ে প্রচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউক্রেন অবশ্য তা মানতে চায়নি। তবে এটাও ঠিক, গত বছরের নির্বাচনে জেলেনস্কির কাছে কমলা হ্যারিসকে সমর্থন করা ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না। কারণ, ভোটের প্রচারেই ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, ক্ষমতায় ফিরলে ইউক্রেনকে যুদ্ধের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার দেওয়া বন্ধ করবেন তিনি। ফলে আতঙ্কিত ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট কমলাকে জেতাতে মরিয়া ছিলেন বলে অভিযোগ। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, জেলেনস্কিকে দ্রুত ইউক্রেনের কুর্সি থেকে সরাতে চাইছেন ট্রাম্প। পূর্ব ইউরোপে শান্তির জন্য এটা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এর জন্য মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘সিআইএ’কে ট্রাম্প যাবতীয় ছাড়পত্র দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর পশ্চিম দুনিয়া রাশিয়ার সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা করেছে। রাশিয়া অনেকবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ইউরোপ সে কথা শোনেনি। রাশিয়া তো আর কমিউনিস্ট দেশ নয়, তারপরও ইউরোপের বিদ্বেষ যেন শেষ হওয়ার নয়।’ রাশিয়া নিজ মর্যাদা নিয়ে উঠে দাঁড়াক— পশ্চিম দুনিয়া তা কখনওই চায়নি। ফলে রুশ নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের স্বেচ্ছাবসান ঘটালেও ইউরোপের নেতারা মস্কোকে সহায়তা করেনি। উল্টে ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ইতিহাসের সেই গতি বদলে দেওয়ার সুযোগ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে।
সেই ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের কৌশল প্রচার-নির্ভর রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। তথ্যযুদ্ধে তারা মস্কোকে পরাজিত করেছে। হয়তো সত্যকেও বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। নানা মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা জনমত নিজেদের পক্ষে নিয়েছে। এইটুকুই। বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপ হেরে যাচ্ছে। প্রতিদিন। আর যে মানুষটি নিষ্ঠুর, যিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত, যিনি প্রচারের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেন— তিনিই আসলে জয়ের পথে। তিনি কল্পনায় নয়, বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর নাম ভ্লাদিমির পুতিন।