Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

রাজবল্লভপাড়ায় ১৩২ বছরের নিস্তারিণী কালীমন্দির, মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া ১২২ কেজির ঘর্মাক্ত কষ্টিপাথরেই মায়ের পুজো

উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে রাজবল্লভপাড়ায় নিস্তারিণী কালীমন্দিরের পুজো এবার ১৩২ বছরে পড়ল। এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন প্রয়াত বিহারীলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজবল্লভপাড়ায় ১৩২ বছরের নিস্তারিণী কালীমন্দির, মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া ১২২ কেজির ঘর্মাক্ত কষ্টিপাথরেই মায়ের পুজো
  • ২১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে রাজবল্লভপাড়ায় নিস্তারিণী কালীমন্দিরের পুজো এবার ১৩২ বছরে পড়ল। এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন প্রয়াত বিহারীলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার তখন থাকত উত্তর কলকাতার শোভাবাজার স্ট্রিটের হাটখোলায়। এক রাতে বিহারিলালবাবু স্বপ্নে দেখেন, বাড়ির উঠোনে একটি ১২২ কিলোগ্রাম ওজনের কষ্টিপাথর পড়ে রয়েছে। তা থেকে ক্রমাগত ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আর একটি বাচ্চা মেয়ে বলছে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে মাটির তলা থেকে তোল। ওই কষ্টি পাথর তুলে তা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে নিত্য কালীপুজোর ব্যবস্থা কর। ভোর হতেই বিহারীলালবাবু লোকজন ডেকে স্বপ্নে দেখা নির্দিষ্ট স্থানে এক মানুষ সমান গর্ত করতেই বেরিয়ে আসে ওই দীর্ঘ ওজনের কষ্টিপাথর। সেটি তিনি বাড়ির মন্দিরে রেখে তাতেই শুরু করেন নিত্য কালীপুজো। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বিশ্বাস, কষ্টিপাথরের উপর ওই ঘাম আসলে মায়ের চোখের জল। ওই পরিবারের সদস্য সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘১৩২ বছর ধরে ওই কষ্টিপাথরকে মাতৃরূপে পুজো করার পাশাপাশি মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি কালী মূর্তি। ৭০ কিলোগ্রাম ওজনের কষ্টিপাথরের ওই কালীমূর্তি আনা হয় এলাহাবাদ থেকে। মূর্তির উচ্চতা তিন ফুট। বর্তমানে শ্যামাপুজোর রাতে এই কালীমূর্তিকে পুজো করার পাশাপাশি প্রতি অমাবস্যা ও মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসে নিষ্ঠা সহকারে মায়ের পুজো হয়।’ মন্দিরে যে সিংহাসনে মাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার আদল অনেকটা বরানগরে রামকৃষ্ণদেবের পদধূলি ধন্য জয়মিত্র ও প্রামাণিক কালীবাড়ির মন্দিরের সিংহাসনের মতো। মাতৃমূর্তির একধারে রয়েছে সাদা রঙের একটি বিশাল শিবলিঙ্গ, পিতলের গোপাল, প্রভু জগন্নাথদেবের কাঠের মূর্তি। আছে নারায়ণ শিলা। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বিশ্বাস, কুলদেবতা হিসেবে নারায়ণ শিলা বাড়ির ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে কাজ করেন।

Advertisement

এই মন্দিরে তন্ত্রমতে পুজো হয়। প্রতি অমাবস্যার রাতে চার ঘণ্টা ধরে চলে পুজো। সত্যেনবাবুর দাদা গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ই পুরোহিত। মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, কালীপুজোর রাতে মাকে অন্ন ভোগের সঙ্গে দেওয়া হয় মাছ ভোগও। রুই এবং কাতলা মাছ ভাজা দেওয়া হয় মাকে। এছাড়াও থাকে সাদা ভাত, খিচুড়ি, পোলাও, পাঁচ রকম ভাজা, বিভিন্ন সবজি দিয়ে তরকারি, চাটনি, পায়েস, ১০ রকম মিষ্টি। মাকে দেওয়া হয় ফল, নাড়ু, খই, চিঁড়ে, বাতাসা, কদমা, মুড়কি, মিছরি। পরিবারের আরেক সদস্যা সৃজিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কালীপুজোর রাতে এই মন্দিরে এখন আর বলি হয় না। তবে চালকুমড়ো, আখ ইত্যাদি ফল বলির পরিবর্তে মাকে নিবেদন করা হয়। ৫০ বছর আগেই বলি বন্ধ হয়ে যায়। বাকি রীতি, আচার নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করা হয়। এই মন্দিরে পুজো দেখতে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন। কালীপুজোর দিন শিশিতে থাকা শিশিরের জল, বৃষ্টি, বিভিন্ন নদ-নদী ও সমুদ্রের জল একটি পাত্রে ঢেলে তাতে গোলাপ জল, আতর, বিভিন্ন সুগন্ধি মিশিয়ে মাকে স্নান করানো হয়। মাকে লাল পাড়ের তসরের শাড়ি পরানো হয়। সাজানো হয় নানা ধরনের ফুল দিয়ে। ১০৮ জবা ও বেলপাতার মালার পাশাপাশি মায়ের চরণে পদ্ম নিবেদন করা হয়। ১৩২ বছর আগে যে ঘট বসিয়ে মাকে পুজো শুরু করা হয়েছিল, আজও সেই ঘটেই মা পূজিতা হন। সিঁদুর লেপা সেই ঘটের কোনও পরিবর্তন হয়নি। মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, মন্দির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বিহারীলালবাবুর বিশ্বাস ছিল, প্রতি কালীপুজোর রাতে ১২২ কিলোগ্রাম ওজনের ওই কষ্টিপাথরের শিলায় স্বয়ং মা কালী বিরাজ করেন। সেকারণে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিকে পুজো করা হলেও নিয়ম মেনে প্রথম পুজো করা হয় ওই কষ্টিপাথরকে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ