নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: ফাঁকা জাতীয় সড়ক ধরে পুণ্যার্থীদের নিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছিল বাস। সাগরে পুণ্যস্নান সেরে বাসে ওঠেন যাত্রীরা। লম্বা পথ ছিল। তাই বাসের মধ্যে প্রায় সকলেই ঘুমিয়েছিলেন। চালকেরও চোখ জুড়িয়ে এসেছিল। তার ফলেই ১৫ আগস্ট, শুক্রবার সকালে বর্ধমানের ফাগুপুরে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দাঁড়িয়ে থাকা একটি লরির পিছনে সজোরে ধাক্কা মারে বাসটি। বাসের গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে, সামনের অংশের প্রায় পুরোটাই দুমড়ে মুচড়ে লরিতে ঢুকে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় আর চোখ খোলার সুযোগ পাননি ১০জন। ঘটনাস্থলেই তাঁরা মারা যান। আর একজন জখম পুণ্যাথী বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গিয়েছেন। জখম হয়েছেন ৩৭ জন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিনই জখম ও নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। শনিবার জখম এবং নিহতদের পরিবারের হাতে মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার, জেলাশাসক আয়েশা রানি এ, পুলিস সুপার সায়ক দাস হাসপাতালে গিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেন। মৃতদের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা করে, গুরুতর জখমদের এক লক্ষ টাকা করে ও স্বল্প জখমদের ৫০ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানবিক। তিনি সব রকমভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিহার সরকার সহযোগিতা করছে না। তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসন বারবার যোগাযোগ করেছে। তারপরও তাদের হেলদোল নেই।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জাতীয় সড়কে সম্প্রতি এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হয়নি। বাসের ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে কোনও রকমে মৃতদেহগুলি বের করা হয়। জখমদেরও বের করতে বেগ পেতে হয়েছিল। ঘটনাস্থল রক্তে ভিজে যায়।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সড়কের পাশে নিয়ম না মেনে লরি বা ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। তার জেরে এর আগেও দুর্ঘটনা হয়েছে। শুক্রবার সকালে ওই ট্রাকটি দাঁড়িয়ে না থাকলে হয়তো এত জনের প্রাণ যেত না। বাসের চালকও বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বর্ধমান মেডিক্যালের এমএসভিপি তাপস ঘোষ বলেন, এখনও চার-পাঁচজন আশঙ্কাজনক রয়েছেন। টানা পথ গাড়ি চালানোর জন্য চালক ক্লান্ত ছিলেন। তিনি ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণেই এমন দুর্ঘটনা হতে পারে।
পুলিস জানিয়েছে, জখম ও নিহতরা বিহারের মতিয়ার থানার চিরাইয়া সারসওয়া ঘাট এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে মহিলা এবং শিশু রয়েছে। মঙ্গলবার তাঁরা বিহার থেকে গঙ্গাসাগরের উদ্দেশে রওনা দেন। জখম রণবীর যাদব বলেন, বাসের গতিবেগ অনেক বেশি ছিল। চালক প্রথম থেকেই দ্রুত গতিতে চালাচ্ছিলেন। সকালের দিকে অন্যান্যদের সঙ্গে আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ জোরালো ধাক্কায় সিট থেকে বাসের নীচে ছিটকে পড়ি। চালক সহ সামনের দিকে বসে থাকা সকলের শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। অনেক চেষ্টা করেও বেরতে পারিনি। কিছুক্ষণ পর এলাকার লোকজন ছুটে আসে। তারাই প্রথমে জখম এবং নিহতদের উদ্ধার করে। স্থানীয়দের দাবি, জাতীয় সড়কের পাশে এভাবে লরি বা ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলে আগামী দিনেও এরকম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হওয়া অসম্ভব কিছু না। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অর্ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।