Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

১০০ দিনের কাজ: বিজেপির মুঠো কি খুলবে?

ছোটোবেলায় শোনা একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। এক পাড়ায় একজন কৃপণ বাস করত। হাড় কিপটে বলতে যা বোঝায় তাই। কোনওদিন কাউকে কিছু দিত না।

১০০ দিনের কাজ: বিজেপির মুঠো কি খুলবে?
  • ১ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ছোটোবেলায় শোনা একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। এক পাড়ায় একজন কৃপণ বাস করত। হাড় কিপটে বলতে যা বোঝায় তাই। কোনওদিন কাউকে কিছু দিত না। ভিখারিরাও তার বাড়িতে যেত না। ভিক্ষা চাইলে কিছু তো দিতই না, উলটে গালি শুনতে হতো। কখনও কখনও লাঠি নিয়ে তাড়াও করত। একদিন বাইরে থেকে এক সাধু এলেন। সব জেনেও তিনি কৃপণের বাড়ির দরজার কড়া নেড়ে বললেন, ‘ভিক্ষাং দেহি’। কৃপণ ব্যক্তিটি একটু অবাক হল। কারণ তার বাড়িতে কেউ ভিক্ষা চাইতে আসে না। সাধু ফের দরজার কড়া নেড়ে বললেন, ‘ভিক্ষাং দেহি’। কৃপণ ব্যক্তিটি ক্ষেপে গিয়ে একমুঠো নোংরা সাধুর চালের ঝোলায় ফেলে দিল। তাতে সাধু একটুও রুষ্ট হলেন না, উলটে হাসলেন। বললেন, ‘ছাই দাও আর যাই দাও, মুঠো তো খুলল’। এখন প্রশ্নটি হল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর কেন্দ্রীয় সরকারের মুঠো কি খুলবে? চালু হবে কি ১০০ দিনের কাজ? মিটিয়ে দেবে কি বকেয়া পাওনা? অনেকে বলছেন, না আঁচানো পর্যন্ত মোদি সরকারকে বিশ্বাস নেই।

Advertisement

স্বাধীনতা লাভের পর অধিকাংশ সময়ই কেন্দ্রে যে দল বা জোট ক্ষমতায় ছিল তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুসম্পর্ক ছিল না। বলা ভালো, সম্পর্ক ছিল অনেকটা সাপে-নেউলে। একবার বামেদের সমর্থনে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার গঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেটাও খুব অল্প সময়ের জন্য। ভারত-মার্কিন পরামাণু চুক্তি ইশ্যুতে বামেরা আচমকা সমর্থন তুলে নেয়। ফলে নীতীশ কুমার বা চন্দ্রবাবু নাইডুর স্টাইলে কেন্দ্রের কাছ থেকে বাড়তি সুযোগ রাজ্য আদায় করতে পারেনি। একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন একের পর এক রেল প্রকল্প বাংলাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেটাকে ব্যতিক্রম বলাই ভালো।
২০১১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তখন দিল্লিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ মকুব ও বেঙ্গল প্যাকেজ নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। পরিণতিতে ভেঙে যায় জোট। অধিকাংশ সময় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী দল বাংলা শাসন করায় কখনওই বিশেষ সুবিধা পায়নি। মাশুল সমীকরণ নীতি সহ বিভিন্ন কারণে বাংলাকে খেসারতও দিতে হয়েছে। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির সরকার পশ্চিমবঙ্গবাসীর সঙ্গে যে আচরণ করছে, তা বাংলাকে আগে কখনও সহ্য করতে হয়নি।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই বাংলা ছিল বিজেপির অন্যতম টার্গেট। সেই কারণে ২০১৬ সালে নারদা স্টিং অপারেশনের ভিডিও বিজেপি অফিস থেকে প্রচার করেছিল। বিজেপি মনে করেছিল, নির্বাচনের মুখে এমন একটা কেলেঙ্কারি ফাঁস করলে ফায়দা লুটবে তারা। কিন্তু লাভ হয়নি। তবে, ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন জেতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য দখল নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে গেরুয়া শিবির। একুশের ভোটে সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। তারপর থেকেই বিজেপির প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চলেছে বাংলা। 
একুশের ডিসেম্বরেই বন্ধ করে দেয় ১০০দিনের কাজ। ইশ্যু দুর্নীতি। ১০০ দিনের কাজে দুর্নীতি হয়নি, এমন রাজ্য নেই। বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্যেও মনরেগা প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্য গুজরাতে এই প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে বিজেপির পঞ্চায়েত মন্ত্রীর 
দুই ছেলেকে জেলে যেতে হয়েছে। যখন এ রাজ্যে 
বাম সরকার ছিল তখনও দুর্নীতি হতো। তার 
জন্যই জবকার্ডধারীদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো শুরু হয়েছিল। তাতে দুর্নীতি কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। 
বাংলাতেও দুর্নীতি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশমতো টাকা উদ্ধার হয়েছে। তাতেও কাজ শুরু না হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। হাইকোর্ট কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। তাতেও বরফ গলেনি। উলটে কেন্দ্র রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে গরিব মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা। 
সেই লক্ষ্যেই ছাব্বিশের নির্বাচন পর্যন্ত বাংলায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বিজেপি। কিন্তু, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা চালাকি ধরে ফেলেছেন। তাই কাজ শুরুর নির্দেশ দিতে সময় নিয়েছেন ৩০ সেকেন্ড। তবে বাংলায় কাজ বন্ধ রেখে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাঁচিয়ে ফেলেছে মোদি সরকার। এই কাজ চালু থাকলে শুধু গ্রাম বাংলার অর্থনীতি চাঙ্গা হতো না, পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে বিজেপির লাফালাফির রাস্তাও বন্ধ হয়ে যেত। 
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ১০০ দিনের কাজ বন্ধ ও বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণ, বিজেপির নিবিড় পরিকল্পনার অঙ্গ। ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকায় বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে এটাও সত্যি, বিভিন্ন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বাংলায় কাজ করছেন। ছট পুজোর আগে ভিনরাজ্যমুখী ট্রেনগুলিতে উপচে পড়া ভিড় তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কাজের সুবাদে এসে বাংলায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যাও বিপুল। তাঁরাও যাতে ভালোভাবে ছটপুজো করতে পারেন তারজন্য সরকার নানা উদ্যোগ নেয়। জলাশয়ের ঘাট পরিষ্কার, আলো লাগানো, মা, বোনেদের কাপড় বদলানোর ব্যবস্থা করে সরকার। হ্যাঁ, এটাই বাংলার সংস্কৃতি। বাঙালির কাছে ‘অতিথি দেব ভব’।
সামনেই বাংলায় ভোট। তাই ছটপুজো নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বও ছটফট করছে। বিজেপির নেতানেত্রীরাও ছটব্রতীদের পুজোর সামগ্রী বিলি করেছেন। পাশাপাশি আরও একটা কাজ করেছেন। ফতোয়া জারি করেছেন। কী সেই ফতোয়া? 
ছটপুজো উপলক্ষ্যে দু’দিন বন্ধ রাখতে হবে মাংসের দোকান। উদ্দেশ্য বিহার, উত্তরপ্রদেশের কালচার বাংলায় চালু করা। অবশ্য তাতে মুখ পুড়েছে বিজেপিরই। প্রশ্ন উঠেছে, কে কী খাবে, কী পরবে, সেটা ঠিক করে দেবে বিজেপি? 
দিল্লির কিছু এলাকায় হিন্দুত্ববাদীরা অন্য কৌশল নিয়েছে। ছটের সামগ্রী বিক্রেতাদের মধ্যে কারা সনাতনী, সেটা ওই সংগঠনটি চিহ্নিত করার দায়িত্ব নিয়েছে। তাতে মানুষ বুঝতে পারবে, যাঁদের দোকানের সামনে তাদের সংগঠনের ‘সার্টিফিকেট’ নেই, তারা অহিন্দু। গোদা বাংলায়, সংখ্যালঘু। ফলে তাঁদের দোকান থেকে ছটব্রতীরা পুজোর সামগ্রী কিনবেন না। এটাও ভাতে মারার কৌশল। তবে, সরাসরি ১০০ দিনের কাজ বন্ধ রাখার মতো নয়। একটু ঘুরিয়ে।
এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, আদালতের রায় মেনে কেন্দ্রীয় সরকার কি বাংলায় ১০০ দিনের কাজ চালু করবে? চালু করলে এতদিন কাজ বন্ধ রাখার স্বপক্ষে কী অজুহাত দেবে? নয়া কৃষি আইন প্রত্যাহারের 
সময় যেভাবে ভুল স্বীকার করেছিল, এক্ষেত্রেও 
কি তারা বাংলার গরিব মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবে? তবে অনেকে বলছেন, এরপরেও বিজেপি নতুন কোনও প্যাঁচ কষতে পারে। নতুন কোনও ফন্দি এঁটে আরও কিছুদিন কাটিয়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ এই মুহূর্তে বিজেপির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এসআইআর।
এসআইআর শুরুর আগে থেকেই বঙ্গ বিজেপির নেতারা বলতে শুরু করেছিলেন, নির্বাচন কমিশন যা করার করে দিয়েছে। এক কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। তাঁদের সেই হুঙ্কার উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নাম ‘হাওয়া’ করে দেওয়ার প্রকৃত সংখ্যাটা এখনও জানা যায়নি। তবে, যেসব তথ্য সামনে আসছে তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম আছে এমন অনেকের নাম কমিশনের দেওয়া ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে না। এক একটি বুথ থেকেই শত শত ভোটারের নাম ‘হাওয়া’ হয়ে গিয়েছে। তাতে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, মুসলিম সকলেই আতঙ্কিত। ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটানোর ভয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যাও করছেন। 
ইতিহাস বলছে, বিভাজন এবং আতঙ্ক সৃষ্টিই বিজেপির সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই ১০০ দিনের কাজকে তারা পাত্তাই দিচ্ছে না। আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা একের পর এক রাজ্যে সাফল্য পেলেও বাংলায় পায়নি। এবার এসআইআর তাদের নয়া হাতিয়ার। তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ চাপের মুখে মানুষ শুধু আত্মসমর্পণই করে না, লড়াইয়ের জন্য জোটও বাঁধে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ