Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুবদিবসের শপথ: আগে ফুটবল, পরে গীতাপাঠ

ক’দিন আগে একটি ভিডিয়ো বেশ ঘোরাফেরা করছিল নেট-বিশ্বে। ভিডিয়োটি সাক্ষাৎকারমূলক। শ্যুটিংস্পট কলকাতারই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। সাধু-সন্তদের ভিড়। সবার মাথায় পাগড়ি। পরনে গেরুয়া আলখাল্লা। আর হাতে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা। লাখো কণ্ঠে গীতাপাঠে হাজির সকলেই। মঞ্চে একদল সাধু পাঠ করছেন।

যুবদিবসের শপথ: আগে ফুটবল, পরে গীতাপাঠ
  • ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: ক’দিন আগে একটি ভিডিয়ো বেশ ঘোরাফেরা করছিল নেট-বিশ্বে। ভিডিয়োটি সাক্ষাৎকারমূলক। শ্যুটিংস্পট কলকাতারই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। সাধু-সন্তদের ভিড়। সবার মাথায় পাগড়ি। পরনে গেরুয়া আলখাল্লা। আর হাতে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা। লাখো কণ্ঠে গীতাপাঠে হাজির সকলেই। মঞ্চে একদল সাধু পাঠ করছেন।  

Advertisement

নীচে ভিড় করা সাধুরা গলা মেলাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন কোনও এক সাংবাদিক অথবা ইউটিউবার, নিশ্চিত নই। যাঁর ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, তাঁকে দেখে সাধু বলেই মনে হয়। একের পর এক প্রশ্ন করছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নাম কী? কোথা থেকে এসেছেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চেনেন? আচ্ছা, বিবেকানন্দ কে? আমতা আমতা করে জবাব। একমাত্র নিজের সাকিন ছাড়া কোনও প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর নেই তাঁর কাছে। শেষ প্রশ্ন, আচ্ছা বলুন তো গীতার উৎস কোথায়? কাঁচুমাচু খেয়ে সাক্ষাৎকার এড়ানোর চেষ্টা গেরুয়া বসনধারীর (ভিডিয়োটির সত্যতা অবশ্য যাচাই করা হয়নি)। বুম ঘুরিয়ে উত্তরটা জানতে চেয়েছিলেন পাশে দাঁড়ানো অন্যান্যদের কাছেও। সংখ্যায় তাঁরা অন্তত পাঁচ-ছ’জন হবে। সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেন! এর মানে দাঁড়ায়, হয় তাঁরা গীতার উৎস সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে। নতুবা জেনেও বলতে চাইছেন না। ভাবখানা এমন—গীতা কোথা থেকে এল, কেনই-বা পাঠ করব? এসব জানার কীই-বা প্রয়োজন? পাঠ করলেই হল।
সেদিন ওই ব্রিগেডেই ঘটে গেল আরও একটি ভয়ংকর ঘটনা। পেটের টানে প্যাটিস বিক্রি করছিলেন আরামবাগের এক যুবক ও তপসিয়ার এক বৃদ্ধ। দীর্ঘকাল ধরে ব্রিগেড তাঁদের কর্মক্ষেত্র। সমাবেশ হলেই প্যাটিস-প্যাঁটরা নিয়ে হাজির হয়ে যান। বিক্রিবাটা হয়। ঘাম ঝরানো অর্থে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের মুখে হাসি ফোটান। কাদের সমাবেশ, কেনই-বা সমাবেশ—এসব দু’জনের কাছে অর্থহীন। যত বেশি জন সমাগম, তত বেশি প্যাটিস বিক্রি। এটাই তাঁদের মোক্ষ। সেই মোক্ষলাভে বাধা। দু’জনকে ঘিরে ধরে গণপিটুনি। ময়দানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হল প্যাটিস। অপরাধ, তাঁরা নাকি চিকেন প্যাটিস বিক্রি করছিলেন। এমন একটি ‘আধ্যাত্মিক’ সমাবেশে এ-কাজ করা যায় না। 
ঘটনাটি নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধল। হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে সরব হলেন অনেকেই। আবার অনেকে বললেন, সাধুদের মাঝে এভাবে চিকেন প্যাটিস ফেরি করা মোটেও সাধুকাজ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, সাধু কারা? এই কিছুক্ষণ আগে যিনি বা যাঁরা গেরুয়া বসন পরে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে গীতার উৎস সম্পর্কে মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন, তিনি বা তাঁরা কি সাধু পদমর্যাদায় পড়েন? নাকি সাধারণ মানুষ সাধুসাজে এসেছিলেন। এখানে মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, সেদিন উপস্থিত সবাইকে কিন্তু একই পঙক্তিতে ফেলছি না। নিশ্চয় অনেকে ছিলেন যাঁরা অ্যাধ্যাত্মিক জ্ঞানে পরিপুষ্ট, প্রকৃত সাধুসন্ত বলে ধর্মীয় সমাজে স্বীকৃত। তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যেও তো কেউ সেদিন এগিয়ে এসে দুই প্যাটিস বিক্রেতাকে মারের হাত থেকে বাঁচালেন না! এহেন নীরবতাও সম্ভবত সাধুদের গুণাবলির সঙ্গে খাপ খায় না।
কেন খায় না, সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে সাধু কারা, সেটা একবার জেনে নেওয়া যাক। স্বামীজি বলতেন, ‘আমি তাঁকেই সাধু বলে মনে করি, যিনি একমাত্র মানব সেবার মাধ্যমে ঈশ্বরের আরাধনা করে ঈশ্বরকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন। যিনি দরিদ্র, পীড়িত ও অজ্ঞ মানুষকেই জীবন্ত ঈশ্বর রূপে পূজা করেন। যিনি প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমকে ঈশ্বর সাধনার অঙ্গ মনে করেন। তিনিই সাধু।’ এই বিষয়ে স্বামীজির উপদেশ-আখ্যানটিও ভারি চমৎকার। 
স্বামীজি তখন মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) ভ্রমণ করছেন। রামেশ্বর মন্দির দর্শন শেষে তাঁকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হল। শুরু করলেন এই বলে—‘ধর্ম আসে অনুরাগে। বাহ্য অনুষ্ঠানে নয়।’ এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলতে লাগলেন, ‘কোনও এক ধনী ব্যক্তির একটি বাগান ছিল এবং দুইটি মালী ছিল। তাহাদের মধ্যে একজন খুব অলস। সে কোনও কাজই করিত না। কিন্তু প্রভু আসিবামাত্র প্রভুর কি বা রূপ, কি বা গুণ! বলিয়া সম্মুখে নৃত্য করিত। অপর মালীটি বেশী কথা জানিত না—সে খুব পরিশ্রম করিয়া প্রভুর বাগানে সকল প্রকার ফল ও শাক-সব্জি উৎপন্ন করিত ও সেইগুলি মাথায় করিয়া অনেক দূরে প্রভুর বাটিতে লইয়া যাইত। বলো দেখি, এই দুই জন মালীর মধ্যে প্রভু কাহাকে অধিকতর ভালবাসিবেন? এই রূপে শিব আমাদের সকলের প্রভু। এই জগৎ তাহার উদ্যানস্বরূপ...। যিনি শিবের সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে আগে তাঁহার সন্তানগণের সেবা সর্বাগ্রে করিতে হইবে—জগতের জীবগণের সেবা আগে করিতে হইবে। শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে যাঁহারা ভগবানের দাসগণের সেবা করেন, তাঁহারাই ভগবানের শ্রেষ্ঠ দাস।’
ধরে নেওয়া যাক, সেদিন ব্রিগেডে সাধুদের দুটি ভাগ ছিল। একদল গীতার উৎস না-জানা। অন্য দল অবশ্যই প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত। আমরা যাঁরা শ্রীচৈতন্য, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা তারও আগে শংকরাচার্য, রামানুজ, রামানন্দ পড়ে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে সামান্যতম জেনেছি বা চেতনা হয়েছে, তাঁরা কি প্যাটিস বিক্রেতার আক্রান্তের প্রেক্ষিতে এই দুই দল সাধুর মধ্যে তফাত করতে পারি? অন্তত, স্বামীজির আদর্শ মানলে বলতে হয়, কোনও তফাতই নেই। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ‘সর্বভূত হিতে রতঃ।’ অর্থাৎ, আমার যাঁরা ভক্ত তাঁরা সকলেই সকল প্রাণীর মঙ্গলকার্যে নিযুক্ত। স্বামীজি যাকে আরও সহজ করে বলেছেন, ‘জীব সেবাই, শিব সেবা।’
তা হলে বিগ্রেডে ওই প্যাটিস বিক্রেতার রুজি-রুটির উপর হামলা চালানো কি তাঁর হিতার্থে হয়েছিল? কেনই-বা গীতাজ্ঞানসর্বস্ব সাধুরা সেদিন বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করলেন না? এই প্রশ্নের উত্তরও নিহিত রয়েছে স্বামীজির সেই মহান উক্তিতে, ‘দুর্বল মস্তিষ্ক কিছু করিতে পারে না। আমাদিগকে সবল মস্তিষ্ক হইতে হবে। আমাদের যুবকগণকে প্রথমত সবল হইতে হইবে, ধর্ম পরে আসিবে।’
গীতা একটি আদ্যপ্রান্ত ধর্মগ্রন্থ। তাকেও আত্মস্থ করতে গেলে সবল মস্তিষ্ক জরুরি। আর সবল মস্তিষ্ক হতে পারে একমাত্র নিয়মিত শরীরচর্চা, খেলাধুলো ও শুদ্ধচিন্তার মাধ্যমে। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়েই গীতাপাঠের সঙ্গে ফুটবল খেলার তুলনা টেনেছিলেন স্বামীজি। আমাদের দুর্ভাগ্য, তাঁর মন্তব্যটিকে ঘিরে আজও বিতর্ক চলছে সমানে। যে যাঁর মতো ব্যাখ্যা করছেন। অপব্যাখ্যাও চলছে। কেউ কেউ বলে বেড়াচ্ছেন, গীতাপাঠের চেয়ে ফুটবল খেলা শ্রেয়। গীতাপাঠে পুণ্যলাভ হয় না। কিন্তু স্বামীজি ঠিক কী বলেছিলেন, সেটা আজ, এই যুবদিবসের দিনে একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।   
সময়টা ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। স্বামীজি কুম্বাকোনম থেকে মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) স্টেশনে পৌঁছন। সেখানে ‘বিবেকানন্দ রিসেপশন কমিটি’ তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। তারপর কয়েকদিন ধরে একের পর এক ধর্মীয় সভায়, মন্দিরে বক্তব্য রাখেন। তৃতীয় সভায় স্বামীজির বক্তব্যের বিষয় ছিল, ‘ভারতীয় জীবনে বেদান্তের কার্যকারিতা’। সেখানে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতার মাঝে তিনি এক জায়গায় বলছেন, ‘আমি তোমাদিগকে স্পষ্ট ভাষায় বলিতেছি—আমরা দুর্বল, অতি দুর্বল। প্রথমতঃ আমাদের শারীরিক দৌর্বল্য। এই শারীরিক দৌর্বল্য আমাদের অন্ততঃ এক-তৃতীয়াংশ দুঃখের কারণ...। আচরণেও আমরা পশ্চাৎপদ...। হে আমার যুবক বন্ধুগণ তোমরা সবল হও—তোমাদের নিকট ইহাই আমার বক্তব্য।’ এরপরেই স্বামীজি তাঁর অদ্বৈতবাদের জ্ঞানগর্ভ থেকে মোক্ষম উপলব্ধিটি ঘোষণা করেন যুবকদের উদ্দেশে। বললেন, ‘গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে। আমাকে অতি সাহসপূর্বক এই কথাগুলি বলিতে হইতেছে। কিন্তু না বলিলেই নয়। আমি তোমাদিগকে ভালবাসি। আমি জানি, সমস্যা কি—কাঁটা কোথায় বিঁধিতেছে। আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। তোমাদের বলি, তোমাদের শরীর একটু শক্ত হইলে তোমরা গীতা আরও ভাল বুঝিবে। তোমাদের রক্ত একটু তাজা হইলে তোমরা শ্রীকৃষ্ণের মহতী প্রতিভা ও মহান বীর্য ভাল করিয়া বুঝিতে পারিবে...।’ 
আমাদের উপনিষদেও বলা হয়েছে, ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য।’  অর্থাৎ, বলহীনের দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ হয় না। যাঁরা শারীরিকভাবে দুর্বল, যাঁরা মানসিকভাবে দুর্বল, তাঁরা এই জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম নন। শরীরচর্চার মাধ্যমে শরীরকে আগে সুস্থ ও সবল করে তুলতে হবে, মনকেও দৃঢ় করতে হবে, তবেই আমরা গীতায় শ্রীকৃষ্ণের কথার অর্থ উদ্ধার করে আত্মজ্ঞানলাভের পথে অগ্রসর হতে পারব। এই  ‘আত্মজ্ঞানলাভ’ সেদিন ব্রিগেডে উপস্থিত লাখো কণ্ঠের মধ্যে ক’জনের হয়েছে, সেটাই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে দুই হতদরিদ্র মানুষের রুজি-রুটিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায়।
আজ, ১২ জানুয়ারি। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন স্মরণে দেশজুড়ে জাতীয় যুবদিবস পালিত হবে। স্বামীজির কাটআউট নিয়ে প্রভাতফেরি হবে। ধর্মীয় আলোচনা হবে।  শুরুটা ১৯৮৫ সালে। যুব দিবস পালনের তাৎপর্য সম্পর্কে সরকারের মুখবন্ধে বলা হয়েছে—‘এটি অনুভূত হয় যে, স্বামীজির দর্শন এবং জীবন ও কর্মপদ্ধতি, যা তিনি অনুসরণ করতেন তা ভারতীয় যুবদের জন্য অনুকরণীয়।’ আসুন, আজ যুব দিবস পালন শুরুর একচল্লিশ বছর পর আমরা সবাই একবার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করি, বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ, কর্মপন্থাকে আদৌ কি অনুকরণ করতে পেরেছি? 
শেষ করি, মার্কিন লেখিকা মিসেস ওলি বুলকে লেখা স্বামীজির একটি চিঠির শেষাংশ দিয়ে—‘নিখিল আত্মার সমষ্টিরূপে যে ভগবান বিদ্যমান এবং আমি সেই ভগবানে বিশ্বাসী, সেই ভগবানের পূজার জন্য যেন আমি বারবার জন্মগ্রহণ করি এবং সহস্র যন্ত্রণা ভোগ করি, আর সর্বোপরি আমার উপাস্য, পাপী-নারায়ণ, তাপী নারায়ণ, সর্ব জাতির দরিদ্র নারায়ণ। এরাই বিশেষভাবে আমার আরাধ্য।’
অতঃপর, স্বামীজির এই ‘ভগবানকে’ জানতে ও চিনতে হলে আমাদের মস্তিষ্ককে আরও উর্বর করে তুলতে হবে। শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে গেলেও শক্তিশালী মস্তিষ্কের প্রয়োজন। আর সেটা পারে একমাত্র মাঠ-ময়দান। তাই, গীতাপাঠ অবশ্যই আবশ্যক। তার আগে যুব সমাজের চাই ফুটবল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ