Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উপাসনা, উপাসক ও সাধু মহাজন

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জলানিতি শান্ত উপাসীত”- ছান্দোগ্য উপনিষদ্  অতি প্রাচীন যুগ হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানবজাতি ক্রমে ক্রমে সভ্যতার আলোকে সমুজ্জ্বল হইয়া 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই' এই প্রশংসা লাভে সমর্থ হইল।

উপাসনা, উপাসক ও সাধু মহাজন
  • ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জলানিতি শান্ত উপাসীত”- ছান্দোগ্য উপনিষদ্

Advertisement

অতি প্রাচীন যুগ হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানবজাতি ক্রমে ক্রমে সভ্যতার আলোকে সমুজ্জ্বল হইয়া 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই' এই প্রশংসা লাভে সমর্থ হইল। মানবেতিহাসে পুণ্যভূমি ভারতবর্ষই অত্যুচ্চ ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রথম ক্ষেত্র হইয়াছিল এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ভারতের প্রজ্বালিত জ্ঞানময় প্রদীপের প্রভায় ক্রমে ক্রমে উদ্ভাসিত হইল। উৎকৃষ্ট স্তরের মানবগণ সভ্য মানবসমাজের পবিত্রতা, সচ্চরিত্রতা, সংযম, শৃঙ্খলা ও সুখশান্তি প্রভৃতির জন্য বিশুদ্ধ মানব নীতি প্রণয়ন করিয়া নৈতিক ধর্মের প্রচার করিলেন এবং তাঁহারা আত্মা ও পরমাত্মা প্রভৃতি আধ্যাত্মিক বিষয়ের অনুশীলন না করিলেও এবং নিরীশ্বর ও নাস্তিক হইয়াও অনেকে জগতের কল্যাণকামী-নীতিপরায়ণ সজ্জন বলিয়া বন্দনীয় হইলেন। ভগবান্ শ্রীবুদ্ধ পরমেশ্বরের অস্তিত্ব বা অভাব সম্পর্কে নীরব থাকিয়াও পরলোক, জীবাত্মার নির্বাণ, অহিংসা, মৈত্রী, করুণা ও উৎকৃষ্ট মানবনীতিসমূহের প্রচার সহ মানবজাতিকে সৎকর্মশীল, স্বাবলম্বী ও বিশুদ্ধচিত্ত করার জন্য অত্যন্ত যত্নবান্ হইয়া এশিয়ার আলো (Light of Asia) নামে বিশ্বজনের শ্রদ্ধা ও সম্মান আকর্ষণ করিলেন। কিন্তু নৈতিক চরিত্রে সমুন্নত কিছু কিছু সজ্জনের মনে চেতন অচেতন জীবজগতের সৃষ্টিরহস্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসার উদয়ে তাঁহারা দীর্ঘকাল ব্রহ্মচর্যনিষ্ঠ হইয়া ধ্যানমগ্ন হইলেন এবং প্রগাঢ় ধ্যানযোগে হৃদয়ে উপলব্ধ সত্য পরবর্তী মানবসমাজের পরম মঙ্গলের জন্য বেদ ও উপনিষদ্‌ প্রভৃতি গ্রন্থে সংস্কৃত ভাষায় নিবদ্ধ করিয়া সেই অক্ষয় সম্পদ্‌ রাখিয়া গেলেন।
সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণের প্রদত্ত বহু মূল্যবান্ সংবাদের মধ্যে নিম্নে কয়েকটিমাত্র লিখিতেছি। যথা-"তে ধ্যানযোগানুগতা অপশ্যন্ দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈর্নিগূঢ়াম্” “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ তমেব বিদিত্বাতিমত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায়।” “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জলানিতি শান্ত উপাসীত” "আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যঃ!" "ওমিত্যেব সর্বম্” “ওঁমিতি উদ্গীথমুপাসীত” ইত্যাদি। তাঁহারা জীবজগতের সৃষ্টিস্থিতিলয়কারী সর্বশক্তিমান্ সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্ম, পরমাত্মা বা ভগবান্কে জ্ঞান ও ভক্তিযোগে জানিলেন ও দর্শন করিলেন এবং একমাত্র সেই পরম পুরুষকে জানা ও লাভ করা ছাড়া এই অনিত্য, দুঃখপূর্ণ ও মায়াময় দুস্তর সংসার-সমুদ্রের জন্মমৃত্যুপ্রবাহ হইতে চিরতরে উদ্ধার লাভ করিয়া সংসার-নিবৃত্তি ও শাশ্বত সুখ শান্তি প্রাপ্তির আর অন্য উপায় নাই এই চিরন্তন সত্যবাণী মানবজাতির হিতার্থে ঘোষণা করিলেন। আধ্যাত্মিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য নৈতিক চরিত্রের ভিত্তিভূমি একান্ত আবশ্যক সন্দেহ নাই। কিন্তু পরলোক ও ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ নৈতিক চরিত্রের সাধনা করিতে করিতে ঈশ্বরের কৃপাপ্রার্থী হইলে তাঁহার কৃপায় শক্তিমান হইয়া সত্বর মায়িক জগতের কামক্রোধাদি রিপু ও নানা প্রলোভন দমন করিতে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রেম-ভক্তি লাভ করিতেও সমর্থ হইতে পারে। সর্বনিয়ন্তা ঈশ্বরকে স্বীকার না করিয়াও কেহ যদি নিজ শক্তিতে কামাদি অন্তঃশত্রুর জয়ী, নৈতিক চরিত্রে সমুন্নত ও বিশুদ্ধচিত্ত সজ্জন হইতে পারেন তাহা নিশ্চয়ই প্রশংসার বিষয়। কিন্তু নানা প্রলোভন ও লালসায় পূর্ণ এই জগতে অতি চঞ্চল মনকে জয় করিয়া কায়মনোবাক্যে পবিত্র হওয়া কোটি কোটি নরনারীর পক্ষে অত্যন্ত সুকঠিন, এই জন্যই সকল দেশ ও জাতির জগন্মঙ্গলকারী মহাজনগণ নিজেরা প্রভূত উপকার পাইয়া বিশ্বমানবের স্থায়ী ভবরোগের চিরশান্তির উপায় ঈশ্বরোপাসনা নামক একটি সিদ্ধ মহৌষধের ব্যবস্থা দিয়াছেন ও দিতেছেন। যিনি বিশ্বাতীত হইয়াও বিশ্বানুগ, 'সত্যং শিবং সুন্দরম্', 'শান্তং শিবদ্বৈতম্', নিরাকার সাকার ও বিশ্বাকার, নির্গুণ ও সগুণ এবং 'মহতো মহীয়ান' হইয়াও 'অণোরনীয়ান্' সেই অচিন্ত্যশক্তি সর্বব্যাপী ব্রহ্ম তাঁহার উপাসককে কৃপা করিয়া নিজের তুল্য গুণসম্পন্ন করেন ('বৃহত্ত্বাৎ বৃংহণত্বাচ্চ ব্রহ্ম' 'ব্রহ্মবেদ ব্রহ্ম ভবতি' 'মম সাধ্যর্ম্যমাগতাঃ' 'মদ্ভাবমাগতাঃ') তাঁহার স্বরূপজ্ঞান, অর্চন, বন্দন, মহানাম সংকীর্তন, শরণাগতি এবং তাঁহার নিকট প্রার্থনা ও আত্মনিবেদন প্রভৃতি সকল প্রকার উপাসনা দ্বারাই সাধক মানবের অশেষ মঙ্গল সাধিত হয়। চিত্তের চাঞ্চল্য ও মালিন্য দূর হইয়া অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধ হইলে সাধনার শেষে সংসারনিবৃত্তি ও মুক্তিলাভ ঘটে। এই জন্যই মানবজাতির প্রতি সকল সাধু মহাত্মার দুইটি সংক্ষিপ্ত ও মহামূল্য উপদেশ "ব্রহ্মচর্য কর করাও, হরিনাম কর করাও”। প্রথমটি নৈতিক চরিত্রের সাধনা এবং দ্বিতীয়টি ব্রহ্মের উপাসনা। "মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে”-গীতা। "আরাধিতা সৈব নৃণাং ভোগস্বর্গাপবর্গদা”-চণ্ডী। তাই ঈশ্বরসৃষ্ট সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানবজাতিকে  সচ্চরিত্র ও সুবিশুদ্ধ করিয়া ক্রমে ক্রমে দেবমানব, ব্রহ্মজ্ঞ, ভক্ত ও মুক্ত করার জন্য ঋষিযুগ হইতে সকল সাধু মহাজন ও ধর্মগুরু প্রমুখ প্রত্যহ ঈশ্বরের উপাসনার উপর গুরুত্ব দিয়াছেন, এমনকি মহাত্মা গান্ধী, ঋষি অরবিন্দ ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ রাষ্ট্রনায়ক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও দার্শনিক এবং গুরুনানক, যীশুখৃষ্ট ও হজরত মহম্মদ, রাজা রামমোহন, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, স্বামী নিগমানন্দ পরমহংস, শ্রীনিত্যগোপাল, শ্রীচরণদাস বাবাজী, শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর, শ্রীভক্তিসিদ্ধান্ত মহারাজ, সাধক বামাক্ষ্যাপা, স্বামী দয়ানন্দ, যোগী গোরক্ষনাথ, গম্ভীরানাথ, শ্যামাচরণ লাহিড়ী ও শ্রীরামদাস বাবাজী প্রমুখ প্রসিদ্ধ ধর্মনেতা মহাপুরুষ ও সদগুরুবৃন্দ আচার্যগণ সকলেই কোনও না কোন প্রকারের ঈশ্বরোপাসনার উপদেশ দিয়াছেন। 
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘জ্যোতির্ময় রচনাঞ্জলি’ থেকে 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ