করৌলি (রাজস্থান): মরুরাজ্য রাজস্থান! রুক্ষ এই ভূখণ্ডে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের সঙ্গেই প্রতিবছর পাল্লা দিয়ে কমছে ভূগর্ভস্থ জলস্তরও। ফলে সেখানে জল সংরক্ষণ শুধু একটি প্রয়োজন নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে পরিণত হয়েছে। আর এই সঙ্কটের মুখে হাল ধরেছেন সম্পত্তিদেবী-প্রেমদেবীর মতো গ্রামীণ মহিলারা। তাঁদের অদম্য সাহস, নিষ্ঠা এবং সকলকে নিয়ে কাজ করার নৈপুণ্য রাজ্যের জল সংরক্ষণের আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।
রাজস্থানের সর্বাধিক জলসঙ্কটগ্রস্ত অঞ্চলগুলির অন্যতম করৌলি জেলার আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা সম্পত্তিদেবী। চলতি মে মাসের তীব্র গরমেও গ্রামের পুকুরগুলিতে টলমল করছে জল। অগভীর কুয়োগুলিরও তাই। দৈনন্দিন জীবনযাপনের পাশাপাশি পশুপালন ও কৃষির সেচের কাজেও লাগছে সেই জল। কিন্তু বছর পনেরো আগেও ছবিটা এমন ছিল না। জয়বায়ু পরিবর্তনের জেরে প্রতি বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে থাকায় ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছিল করৌলি। কৃষিকাজ, পশুপালন সব ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। ফলে রুটিরুজি হারিয়ে ডাকাতি, লুটপাটের মতো অপরাধের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্থানীয় বেশিরভাগ পুরুষ। স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার।
এই পরিস্থিতিতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সম্পত্তিদেবীরা ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। সালটা ২০১০। প্রথমে স্বামীদের বুঝিয়ে দস্যু-জীবন থেকে ফিরিয়ে আনেন তাঁরা। তারপর শুরু হয় জল বাঁচানোর লড়াই। তাঁদের পাশে দাঁড়ায় আলওয়ারের স্বেচ্ছসেবী সংস্থা ‘তরুণ ভারত সঙ্ঘ’ (টিবিএস)। ২০১৫-১৬ সালে গরু-ছাগলের দুধ বিক্রির টাকায় গ্রামে প্রথম পুকুর খোঁড়েন সম্পতিদেবী ও তাঁর স্বামী জগদীশ। এখন করৌলির আলমপুর সহ পড়শি গ্রামগুলি মিলিয়ে অন্তত ১৬টি পুকুর (স্থানীয় ভাষায় পোখর) রয়েছে। আলমপুরের প্রতিবেশী ভুরখেড়া গ্রামের বাসিন্দা ৫৫ বছরের প্রেমদেবী সংসারের অভাব উপেক্ষা করেই (তাঁর স্বামীও অপরাধের রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন) পুকুরের জন্য নিজের চার বিঘা জমি দান করেন। এখন সেই পুকুরের জলে গোটা গ্রামের রুটিরুজির সংস্থান হওয়ায় তৃপ্তির হাসি প্রেমদেবীর মুখে। সম্পত্তিদেবীদের লাগাতার প্রচার গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলেছে। জল-আন্দোলনের জেরে স্থানীয় সেরনি নদীতেও বছরভর জল থাকে। টিবিএসের কর্ণধার ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ও স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ প্রাপ্ত রাজেন্দ্র সিংয়ের কথায়, ‘ভূগর্ভস্থ জলস্তর মাত্র ৫ থেকে ১০ ফুট বেড়ে যাওয়াতেই নদীর এই পুনরুজ্জীবন। গ্রামের মহিলাদের অদম্য জেদই এটা সম্ভব করেছে।’ করৌলির এই ভোলবদলের জেরে তাঁদের জীবনও যে বদলে গিয়েছে, তা স্বীকার করছেন সম্পত্তিদেবীও। নিজেরই খোঁড়া পুকুরের ধারে বসে গর্বের সুরে প্রৌঢ়া বলেন, ‘আমরা এখন সর্ষে, গম, মিলেট এবং কিছু শাকসব্জিও চাষ করি। পানিফল চাষের জন্যও ভাড়া দিই পুকুর। তা থেকে প্রতি মরশুমে ১ লক্ষ টাকা মতো আয় হয়।’ স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে ৫৮ বছরের জগদীশ বলেন, ‘এখন সুখে আছি। ও আমাকে না ফেরালে এতদিনে হয়তো পুলিসের গুলিতে মরেই যেতাম।’ রাজস্থানের সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে ‘কুখ্যাত’ করৌলি এখন অনেক বদলে গিয়েছে বলে জানাচ্ছেন জেলার পুলিস সুপার ব্রিজেশজ্যোতি উপাধ্যায়ও। তাঁর কথায়, ‘করৌলিতে জল শুধু জীবন নয়, শান্তিরও প্রতীক।’