Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নেপালে কি ফের রাজতন্ত্র ফিরবে?

একসময় নেপালের মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহলের (প্রচণ্ড) ডাকে সাড়া দিয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রাইফেল। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক ধরে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি তুলে শামিল হয়েছিলেন ‘সশস্ত্র বিপ্লবে’।

নেপালে কি ফের রাজতন্ত্র ফিরবে?
  • ১৭ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: একসময় নেপালের মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহলের (প্রচণ্ড) ডাকে সাড়া দিয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রাইফেল। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক ধরে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি তুলে শামিল হয়েছিলেন ‘সশস্ত্র বিপ্লবে’। সেই প্রাক্তন মাওবাদী কমান্ডার দুর্গা প্রসাদই এখন হিমালয় ঘেরা দেশটিতে রাজতন্ত্র এবং হিন্দুরাষ্ট্রের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম মুখ!

Advertisement

নেপালে রাজতন্ত্র ও হিন্দুত্ব ফিরিয়ে আনার দাবিতে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক আন্দোলনে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (আরপিপি) যোগ দিয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। আন্দোলন পরিচালনার জন্য গড়ে ওঠা সেই ‘জয়েন্ট পিপল্‌স মুভমেন্ট কমিটি’র (জেপিএমসি) নেতৃত্বের অন্যতম নেতা দুর্গা প্রসাদ। কাঠমান্ডুতে অশান্তির সূচনা তাঁরই হাত ধরে। সেদিন দুর্গা গাড়ি নিয়ে সজোর ধাক্কা মেরেছিলেন পুলিসের ব্যারিকেডে। আর তারপরেই রাজপথে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। স্লোগান ওঠে, ‘ফিরে এসো রাজা, জাতিকে বাঁচাও’। রাজা জ্ঞানেন্দ্রের সমর্থকদের সঙ্গে পুলিসের সংঘর্ষে অচল হয়ে পড়ে নেপালের বিস্তীর্ণ অংশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাঠমান্ডু-সহ বিভিন্ন শহরে বলবৎ করতে হয় কার্ফু। নামাতে হয় সেনা। হিংসা ছড়ানোর অভিযোগে ‘রাজতন্ত্রের সমর্থক’ হিসাবে পরিচিত আরপিপি-র সহ-সভাপতি রবীন্দ্র মিশ্র এবং সাধারণ সম্পাদক ধাওয়াম সমশের রানা-সহ শতাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি প্রাক্তন মাওবাদী দুর্গার।
হিমালয়ের কোলের দেশটি ছিল বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র। ২০০৮ সালের মে মাসে সংবিধান সংশোধন করে ২৪০ বছরের পুরনো রাজতন্ত্র ভেঙে নেপালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১৭ বছর আগে ছুড়ে ফেলা জুতোয় নেপালবাসীর ফের পা গলাতে চাওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। ১৭ বছরে ১৩ টি সরকার। কিন্তু কোনওটাই বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নেপাল শাসন করেছে ইউনিফায়েড কমিউনিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল এবং নেপালি কংগ্রেস। প্রজাতান্ত্রিক নেপালের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহল ওরফে প্রচণ্ড। পরে হাত বদলে একে একে ক্ষমতা পান মাধব কুমার থেকে কেপি শর্মা ওলি। তিনিই এখন ক্ষমতায়। যাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ। নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, ঘনঘন ক্ষমতা হস্তান্তরের কারণে দুর্বল হয়েছে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো। ধস নেমেছে অর্থনীতিতেও।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, বছর কয়েক আগে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের (ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড বা আইএমএফ) কাছে হাত পাততে হয় হিমালয়ের কোলের দেশটিকে। আইএমএফের থেকে নেপালের নেওয়া ঋণের অঙ্ক ৪ কোটি ১৮ লক্ষ ডলার। ওই অর্থ শোধ করার জন্য কাঠমান্ডুকে অতিরিক্ত চার বছর সময় দিয়েছে এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই সময়সীমার মধ্যেও ‘এভারেস্ট-রাষ্ট্র’ ঋণ মেটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর্থিক দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় নেপালে মুদ্রাস্ফীতির হার আকাশ ছুঁয়েছে। গত বছর ভোক্তা মুদ্রাবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৩ শতাংশ। ফলে আগুন-দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি, রাজতন্ত্র চলে যাওয়ার পর গণতান্ত্রিক সরকার দেশে সেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। তাই, দ্বিদলীয় ব্যবস্থা থেকে অতীতের রাজতন্ত্রে ফেরার পক্ষপাতি নেপালের বীতশ্রদ্ধ আম জনতার একাংশ। এমনকী হিন্দুরাষ্ট্রের তকমা মুছে ২০১৫ সালে যে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় নেপাল অর্জন করে, তারও পরিবর্তন চাইছেন অনেকে।
ইতিহাস বলছে, নেপালের রাজবংশের ইতিহাসের সমাপ্তি রক্তে মাখা! ত্রিভুবন শাহের পুত্র রাজা মহেন্দ্র ১৯৫৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেছিলেন। দেশের আধুনিকীকরণেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। তবে আধুনিক রাজতন্ত্রকে তিনি আরও সুসংহত করেছিলেন। রাজার হাতে প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারও ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। জাতীয়তাবাদের নামে হিন্দু রাজতন্ত্রের প্রচার করেছিলেন নেপালি জনগণের মধ্যে। এই কর্মসূচির মূল কথা ছিল ‘এক রাজা, এক বেশ, এক ভাষা’। যাকে জাতীয় সংস্কৃতি বলা হলেও, তা ছিল আদতে রাজার ধর্ম, পোশাক, ভাষা। নেপালের কয়েক ডজন সংখ্যালঘু ভাষা এবং জাতির মানুষের উপর শুরু হয়েছিল দমন-পীড়ন। স্কুলে পড়ানো হতো শুধুমাত্র নেপালি ভাষায়। পাঠ্যক্রমে থাকত হিন্দুধর্ম এবং রাজপরিবারের প্রশংসা। জাতিগত, আঞ্চলিক এবং ধর্মীয় পার্থক্য মুছে ফেলে ঐক্যবদ্ধ নেপালের নামে স্থাপন করেছিলেন রাজতন্ত্রের কড়া শাসন। বড় ছেলে বীরেন্দ্রের হাতে সিংহাসন তুলে দিয়েছিলেন রাজা মহেন্দ্র। কিন্তু সেই নেপালি রাজপরিবারে ২০০১ সালে পড়ে শনির কুদৃষ্টি। ওই বছরের জুন মাসে হঠাৎ করেই বীরেন্দ্র-সহ পরিবারের প্রায় সবাইকে গুলি করে হত্যা করেন যুবরাজ দীপেন্দ্র। এরপর তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। রাজবাড়ির ভিতরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হন যুবরাজ দীপেন্দ্র। পরে মৃত্যুশয্যাতেই তাঁর অভিষেক হয়। কিন্তু দীপেন্দ্র প্রাণে বাঁচেননি। এই ঘটনা নেপালের হিন্দু রাজতন্ত্রের জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পরের অস্থির পরিস্থিতিতে, সিংহাসনে বসেছিলেন বীরেন্দ্রর ভাই তথা মহেন্দ্রর দ্বিতীয় ছেলে জ্ঞানেন্দ্র শাহ।
রাজা বীরেন্দ্রর মৃত্যুতে দেশের মানুষ শোকাহত। রাজ পরিবারের সদস্যদের দিকে সন্দেহের আঙুল। এই পরিস্থিতিতে গ্রামীণ নেপালে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে যেতে চেয়েছিল মাওবাদীরা। কুর্সিতে বসে জ্ঞানেন্দ্র কড়া হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলার দিকে নজর দেন। নেপালি পার্লামেন্টের ক্ষমতা খর্ব করেন তিনি। ২০০৫ সালে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে যাবতীয় ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন জ্ঞানেন্দ্র। কিন্তু এতে ফল হয় হিতে বিপরীত। স্বৈরাচারী তকমা সেঁটে যায় রাজার গায়ে। জ্ঞানেন্দ্র পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর কাঠমান্ডুতে আছড়ে পড়ে গণ আন্দোলনের ঢেউ। ক্ষমতা দখল করতে তাতে হাওয়া দিয়েছিল মাওবাদী এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলি। নেপালের শেষ রাজা জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতাচ্যুত হন ২০০৬ সালে। সমস্ত আনুষ্ঠানিক ভূমিকা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়া হয় রাজাকে। জাতীয় সঙ্গীত থেকে বাদ যায় রাজার নাম, মুদ্রা থেকে সরে রাজার ছবি। আইনত নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজতন্ত্র-পরবর্তী প্রথম সংসদে প্রতিনিধিরা শপথ গ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন ভাষায়। একটি নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধান লেখা শুরু করা হয়েছিল। নতুন জাতীয় সঙ্গীত তৈরি করা হয়, যাতে ছিল বহুত্ববাদী ঘোষণা: ‘আমরা শত শত ভিন্ন ফুলে তৈরি এক নেপালি মালা।’ ২০০৮ সালের জুন মাসে প্রাসাদ ত্যাগ করেছিলেন রাজা। রাজপ্রাসাদ পরিণত হয় জাদুঘরে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জ্ঞানেন্দ্র নেপালের সাধারণ নাগরিক হিসাবে কাঠমান্ডুর ‘নির্মল নিবাস’-এ বাস করেন। তাঁর কোনও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। অনুমতি নেই রাজপ্রাসাদে যাওয়ার। এমনকী কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পান না প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র।
দুর্ভাগ্যবশত, রাজতন্ত্রের অবসানের পরে নেপালে যতগুলি সরকার গঠিত হয়েছে, কেউই নেপালি জনগণের আশা পূরণ করতে পারেনি। সকল প্রধান নেতার বিরুদ্ধেই রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। জোট ধরে রাখতে হিমশিম খেয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। একের পর এক জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। জোট ভেঙেছে, সরকার পড়েছে। আবার নতুন জোট সরকার তৈরি হয়েছে। নেতৃত্ব এবং নীতি নির্ধারণের ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার মতো সমস্যাগুলি বড় হয়ে উঠেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেপালি বৈচিত্র্য ফিরিয়ে এনেছে ঠিকই, তবে আঞ্চলিক বৈষম্য এখনও রয়ে গিয়েছে। বরং গণতন্ত্রে আরও রাজনৈতিক ভেদাভেদ বেড়েছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই নেপালি জনগণের একাংশ এখন রাজতন্ত্রের প্রতি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। জনগণের একাংশের চাহিদা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ক্ষমতাচ্যুত রাজার। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক ভিডিও বার্তায় দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য নেপালবাসীর কাছে আবেদন জানান জ্ঞানেন্দ্র। আর তারপরই দফায় দফায় অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা। এই পরিস্থিতিতে নেপালে রাজাকে ফেরানোর দাবিতে সুর চড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি এবং গণতন্ত্রপন্থী নেপালি কংগ্রেসের সমর্থকদের একাংশ। তবে এই দুই দল ‘প্রতীকী রাজতন্ত্রের’ প্রত্যাবর্তন চাইছে। অন্যদিকে গত ২৮ মার্চ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড (পুষ্পকমল দহল) এর বিরোধিতায় জনসভা থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিলে এভারেস্ট ভূমিতে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। আগামী দিনে এই হিংসা ফের নেপালকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, এই আশঙ্কা বাড়ছে।
নেপালের রাজতন্ত্রপন্থী রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির (আরপিপি) চেয়ারপার্সন রাজেন্দ্র লিংডেন মনে করেন, রাজা নেপালিদের জাতীয় পরিচয় এবং গর্বের সঙ্গে যুক্ত। সংবাদসংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘শাসন করার ইনস্টিটিউশন হিসেবে আমরা রাজতন্ত্র চাই না। তবে দেশের অভিভাবক হিসেবে আমরা রাজতন্ত্র চাই। যেটি দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করবে।’ আরপিপি ২০১৭ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে আসন পেয়েছিল একটি। সর্বশেষ ২০২২ সালের নির্বাচনে রাজতন্ত্র ও হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি নিয়ে দলটি ১৪টি আসন পায়। আরপিপি বর্তমানে নেপালের পঞ্চম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। তাহলে কি এই আরপিপি-র হাত ধরেই ৭৭ বছরে সিংহাসন ফিরে পাবেন রাজা জ্ঞানেন্দ্র? তার থেকেও বড় প্রশ্ন হল, এই দল এত শক্তি পাচ্ছে কোথা থেকে? নেপালের অনেকেই আঙুল তুলছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের দিকে। কেন? আসলে রাজতন্ত্রপন্থীদের মিছিলে হাতে হাতে দেখা গিয়েছে যোগী আদিত্যনাথের ছবি। সেই ছবি সাউথ ব্লকের কূটনীতিকদের কপালে ভাঁজ ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ