পশ্চিমবঙ্গের ১০০ দিনের কাজ বন্ধ নিয়ে কোনও নির্দেশ, কোনও ব্যাখ্যা, কোনও প্রশ্নই টলাতে পারছে না মোদি সরকারকে! বরং প্রতিহিংসার রাজনীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, মনরেগা প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থান তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে। ২০০৫ সালে এই প্রকল্প সংক্রান্ত আইনে প্রতিটি আবেদনকারীকে অন্তত একশো দিন কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া যায়, এমন কথা আইনে বলা নেই। অথচ সেই দুর্নীতি, টাকা নয়ছয়ের অভিযোগেই গত সাড়ে তিন বছর ধরে এ রাজ্যে প্রকল্প বন্ধ রেখেছে মোদি সরকার! কেমন দুর্নীতি হয়েছে বাংলায়? কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ৪ কোটি ৯১ লক্ষ টাকার কাজ নিয়ে নয়ছয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ মূলত চারটি জেলায়। তা জানতে পেরে ৭৮ জন আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে মমতা সরকার। শুধু তাই নয়, ৫ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা উদ্ধার করে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রকে। এটা মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠের ছবিটা হল, মোদি-অমিত শাহের রাজ্য গুজরাতে বিজেপি সরকারের এক মন্ত্রীর ছেলে ১০০ দিনের কাজের ৭১ কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে জেলে গিয়েছে বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই রাজ্যে একদিনের জন্যও প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়নি! টাকাও পেয়েছে। উদাহরণ আরও আছে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক গত ২২ জুলাই সংসদে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ১০০ দিনের কাজে উত্তরপ্রদেশে ৪ লক্ষের বেশি, ওড়িশায় দেড় লক্ষ, রাজস্থানে ৬৯ হাজার, ছত্তিশগড়ে ৩০ হাজার, অন্ধ্রে ৫২ হাজার এবং পশ্চিমবঙ্গে ২০২৪-২৫ সালে মাত্র ২টি জব কার্ড বাতিল হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যে প্রকল্প বন্ধ হয়নি, ভুয়ো জবকার্ডের মালিকদের থেকে টাকাও উদ্ধার হয়নি। অথচ ‘শাস্তি’ পাচ্ছে একা বাংলা! এ রাজ্যের বকেয়া সহ কেন্দ্রের কাছে বর্তমান প্রাপ্যের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্র আশ্চর্যজনক নীরব!
এমন নানাবিধ পরিসংখ্যান, বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে তুলনামূলক তথ্য ও প্রশ্নকে সামনে রেখে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে দীর্ঘদিন মামলা চলে। সেই মামলায় ১ আগস্ট থেকে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালু করার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে মোদি সরকার। সর্বোচ্চ আদালতে মামলাটি এখন বিচারাধীন। কিন্তু প্রকল্প বন্ধ নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে এবার সরব হয়েছে সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, সংক্ষেপে পিএসি। বৃহস্পতিবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত পিএসি-র বৈঠকে তৃণমূল, কংগ্রেসের সদস্যরা মোদি সরকারের এই বিমাতৃসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে সরব হন। বৈঠকে সকলকে অবাক করে দিয়ে ভুবনেশ্বরের বিজেপি সাংসদও বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পরেও গরিব মানুষের টাকা আটকে রাখা উচিত নয়। খবরে প্রকাশ, সাংসদদের তোলা কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারেননি গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের কর্তারা। হয়তো বা তাঁদের কাছেও এর উপযুক্ত জবাবই নেই!
একশো দিনের কাজে টাকার কোনও নয়ছয় হয়নি, এমন দাবি কেউ করছে না। ঘুরিয়ে বললে, এদেশে সরকারি প্রকল্পে অর্থের নয়ছয় হয় না— এমন নজির খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। প্রশ্ন হল, কয়েকজনের অপরাধে কেন একটা গোটা প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হল? কেন একই অভিযোগে নির্লজ্জের মতো বৈষম্য করছে কেন্দ্রীয় সরকার? প্রশ্ন হল, কেন হাইকোর্টের রায় মানতে চাইল না কেন্দ্র? কেন বাংলার গরিব মানুষকে সমস্যায় ফেলা হল? পিএসির চেয়ারম্যান নির্দেশ দিয়েছেন, ১৫ দিনের মধ্যে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রককে এই নিয়ে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। কিন্তু যারা হাইকোর্টের নির্দেশ হেলায় অবহেলা করেছে, তারা কি পিএসি চেয়ারম্যানের হুঁশিয়ারিতে কর্ণপাত করবে? মেনে নেবে বৈষম্যের অভিযোগ? বাংলায় চালু হবে কেন্দ্রের ১০০ দিনের কাজ? সেই সম্ভাবনা কম। কারণ মোদি সরকার বারবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে, রাজধর্ম পালনের চেয়ে রাজনৈতিক লাভালাভের হিসাব কষাই তাদের পাখির চোখ। তাই কোনও যুক্তি, তথ্য, পরিসংখ্যান, ঔচিত্যের প্রশ্ন, সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনের দায় বহনে তাদের রুচি নেই। আপাতত সব চোখ তাই সুপ্রিম কোর্টের দিকে। কারণ ভরসার একমাত্র জায়গা তো এই ন্যায়ালয়ই।