তন্ময় মল্লিক: ‘আত্মরক্ষা করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিশোধ নিতে হবে।’ ‘মা দুর্গার হাতে যে ত্রিশূল থাকে, অস্ত্র থাকে, সেই ত্রিশূল, খাঁড়া নিয়ে মিছিল হবে। ঝান্ডা থাকবে। ঝান্ডার সঙ্গে ডান্ডাও থাকবে।’
তন্ময় মল্লিক: ‘আত্মরক্ষা করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিশোধ নিতে হবে।’ ‘মা দুর্গার হাতে যে ত্রিশূল থাকে, অস্ত্র থাকে, সেই ত্রিশূল, খাঁড়া নিয়ে মিছিল হবে। ঝান্ডা থাকবে। ঝান্ডার সঙ্গে ডান্ডাও থাকবে।’
‘হিন্দু সমাজ অত্যাচারিত হতে হতে বাংলায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। আমাদের মনে হয়, হিন্দু সমাজের এবার রিটালিয়েট অর্থাৎ প্রত্যাঘাত করার সময় এসে গিয়েছে। তা না হলে হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব বাঁচানোই মুশকিল হবে। হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দু সমাজ রামনবমী পালন করে আসছে। তাতে বাধার সম্মুখীন হলে হিন্দু সমাজ রাস্তা খুঁজে নেবে। সঙ্গে বিজেপি থাকবে।’
এই সমস্ত বক্তব্য কাদের এবং কোথায় বলেছেন, সেটা বড় কথা নয়। বিচার্য বিষয় হল, প্রত্যেকের কথাতেই উস্কানি স্পষ্ট। সকলেরই উদ্দেশ্য, একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ তৈরি করা। বছর ঘুরলেই বাংলার ক্ষমতা দখলের ভোট। কিন্তু বিরোধীদের হাতে ইস্যু নেই। তাই শুরু হয়েছে উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মরিয়া চেষ্টা।
হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দু সমাজ রামনবমী পালন করে আসছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার হক কথা বলেছেন। কিন্তু, তা নিয়ে তো কোনও সমস্যা ছিল না। কোনও অশান্তি হতো না। ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত বাংলায় রামনবমীর শোভাযাত্রা ছিল পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে স্মরণের একটি বিশেষ দিন। শোভাযাত্রায় বাধা দেওয়ার কোনও ঘটনাই ঘটত না। ফলে ছিল না কোনও আতঙ্কও। তাহলে এখন সেই প্রশ্ন কেন তোলা হচ্ছে? কারণ রামনবমীর শোভাযাত্রায় জুড়ে গিয়েছে রাজনীতি। তাই ‘শোভাযাত্রা’ হয়ে গিয়েছে ‘মিছিল’। রামনবমীর মিছিল হয়ে উঠেছে আস্ফালন প্রদর্শনের প্ল্যাটফর্ম। সৌজন্যে বিজেপি।
সেই ছোট থেকে শুনে আসছি, বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্বণ। পুজো, পার্বণ লেগেই থাকে। উৎসব তো শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, একঘেয়েমির জীবনে এনে দেয় এক ঝলক স্বস্তির বাতাস। শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্ব বাঙালিকে চেনে উৎসবপ্রিয় জাতি হিসেবে। দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎসব হয় বাংলাতেই। দুর্গোৎসব। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। মানুষ সারারাত ধরে ঘুরে ঘুরে
ঠাকুর দেখে। সেখানে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ইশাই সবাই থাকে। তবে, তাকে ঘিরে কোনও আতঙ্ক থাকে না। কিন্তু রামনবমীর শোভাযাত্রাকে ঘিরে কেন এত ভয়, কেন এত হুঙ্কার? রামনবমী ঘিরে বাংলায় উত্তেজনার পারদ দিন দিন চড়ছে। আর তারজন্য
দায়ী রাজনীতির কারবারিরাই। পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা পাকাতে চাইছে।
তবে, ধর্মীয় শোভাযাত্রা ঘিরে বাংলায় উত্তেজনার সৃষ্টির চেষ্টা এই যে প্রথম, এমনটা নয়। আর সেটা যে কেবল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাই করে, সেটাও বলা যাবে না। মুসলিমদের একাংশও মহরমকে সামনে রেখে বিভিন্ন সময় বিশৃঙ্খলা পাকানোর চেষ্টা করেছে। কিছু কিছু জায়গায় জোর করে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তা নিয়ে অশান্তিও হয়েছে। এমনকী, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ডিজে বাজিয়ে কিছু মুসলিম যুবকের নাচানাচি দেখলে মনেই হবে না, মহরম একটা শোক পালনের অনুষ্ঠান।
তবে, মহরমে দাপাদাপি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, তা হয় এলাকায় কর্তৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে। কিন্তু রামনবমীকে বিজেপি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করতে চাইছে। হাওয়া গরম করার জন্য বিজেপি নেতারা এমন সব কথা বলছেন যাতে একটা প্রতিপক্ষ তৈরি হয়। মানুষ অশান্তির আশঙ্কায় ভোগে। অশান্তি হলে দায় সরকারের, লাভ বিরোধীদের। তাই রাজ্যের শাসক দল রামনবমীর দিন পুজো ও শোভাযাত্রার ডাক দিয়েছে। তৃণমূলের নেতারাও রামনবমী পালনে উদ্যোগ নিচ্ছেন। নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে রামপুজোর প্যান্ডেল বাঁধার কাজ তদারকি করছেন। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় অধিকাংশ এলাকায় রামনবমীর মিছিলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে তৃণমূলের হাতে। ফলে রামনবমীর দিন যাঁরা রাস্তায় নামবেন তাঁদের রামভক্ত বলা গেলেও সবাইকে কিছুতেই বিজেপি ভক্ত বলা যাবে না। যদিও বিজেপি সেটাই বোঝাতে চাইবে।
করোনা পর্বেও বিজেপি একইভাবে নিজেদের প্রভাব বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। আচমকা ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করে গোটা দেশের মানুষকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সরকার। তারপর করোনা মোকাবিলার জন্য থালা বাজানো, ঘরের আলো বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোমবাতি, টর্চ, প্রদীপ জ্বালানোর ডাক দিয়েছিলেন। মহামারীর আতঙ্কে বাংলার বহু মানুষ সেই পরামর্শ শুনেও ছিল। আলো বন্ধ রাখার ভিডিও অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন। তা দেখে বিজেপি ভেবেছিল, মোদিজির হাত ধরে বাংলায় গেরুয়াকরণ ঘটে গিয়েছে। ক্ষমতা বদল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু একুশের ভোটে প্রমাণ হয়েছে, তাদের সেই ভাবনা ভুল ছিল।
একইভাবে কুম্ভমেলার ভিড় দেখিয়ে বিজেপি নিজেদের পালে হাওয়া টানার চেষ্টা করেছিল। এখন রামনবমীকে সামনে রেখে হিন্দুত্বকে জাগানোর চেষ্টা চলছে। কথায় কথায় বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টানা হচ্ছে। এমন সব উস্কানিমূলক কথা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে যা সমস্ত দলের রাজনৈতিক নেতা একসময় সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। অনেক কিছু বুঝতেন, কিন্তু মুখে বলতেন না। কারণ তাঁদের কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়েও বড় ছিল শান্তি বজায় রাখা। সমাজের ও মানুষের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা ছিল অনুসরণযোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, এখন বিজেপির অধিকাংশ নেতা সেসবের ধার ধারছেন না। উল্টে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করতে গিয়ে এমন সব মন্তব্য করছেন যাতে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। উৎসব নিয়ে একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
একথা বলতে দ্বিধা নেই, দিন দিন বাংলার রাজনীতিতেও ধর্ম মিশে যাচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে বিজেপি এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হওয়ায়। সিপিএম বিজেপিকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চিহ্নিত করলে বাম কর্মী-সমর্থকরা পাইকারিহারে দল বদলাতেন না। কিন্তু জ্বালা মেটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই লাগাতার আক্রমণ করেছে সিপিএম। তার সুযোগ নিয়েছে বিজেপি। এ রাজ্যে তারা হু-হু করে বেড়েছে। তাতে দুর্বল হয়েছে বামেরা। সিপিএমের ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের প্রাক্কালে তা কার্যত ঘুরপথে স্বীকার করেছেন সিপিএম নেতা প্রকাশ কারাত।
সিপিএমের পলিটব্যুরোর কো-অর্ডিনেটর বলেছেন, ‘আরএসএস মোকাবিলার ক্ষেত্রে পার্টি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বিজেপি, আরএসএস সহ হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি এগিয়ে যাবে আর বামপন্থীদের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে, এই দু’টো ঘটনা কখনও একসাথে ঘটতে পারে না।’
প্রকাশ কারাতের এই দু’টি বক্তব্যই সিপিএমের মুখপত্র ‘গণশক্তি’ পত্রিকার প্রথম পাতায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। অথচ একটা সময় এই সিপিএম ভেবেছিল, বিজেপিকে দিয়ে মমতাকে হটিয়ে তারা ক্ষমতায় আসবে। সেই আশাতেই হুইসপারিং ক্যাম্পেন করেছিল, ‘উনিশে রাম, একুশে বাম।’
শূন্যে পৌঁছে সিপিএম কি বুঝেছে, ‘খাল কেটে
কুমির আনা’র পরিণতি কী হয়েছে! বঙ্গ সিপিএম না বুঝলেও প্রকাশ কারাত বুঝেছেন, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির (বিজেপি) ও বামেদের অগ্রগতি একইসঙ্গে ঘটা সম্ভব নয়। একজন এগলে অন্যজন নিশ্চিতভাবেই পিছবে। সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের এহেন উপলব্ধি দেখে অনেকেই বলছেন, গাছের গোড়া কেটে ডগায় জল ঢালছে সিপিএম। তাতে কোনও লাভ হবে না।
তবে একথা ঠিক, উগ্র হিন্দুত্বের লাইন নেওয়ার আগে বঙ্গ বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষতার নামাবলি গায়ে চড়ানোর চেষ্টা করেছিল। বগটুই কাণ্ডের পর স্বজনহারা মিহিলাল শেখকে কব্জা করে বিজেপি সংখ্যালঘুদের পাশে আছে, এই বার্তা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভোটের হিসেব দেখে বিজেপি বুঝেছে, ‘ভস্মে ঘি ঢেলেছে’।
বাংলায় রামপুজোর তেমন প্রচলন ছিল না। এটা হিন্দিবলয় থেকে আমদানি করা সংস্কৃতি। সাধারণভাবে বাংলা দখল সম্ভব নয় বুঝেই বিজেপি বাংলার
কৃষ্টি, সংস্কৃতি নষ্ট করার কৌশল নিয়েছে। কিন্তু তাতে কি লাভ হবে? হবে না। কারণ শুধু জয় শ্রীরাম স্লোগানে জুড়াবে না বেকারত্বের জ্বালা, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির যন্ত্রণা।