Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নাগরিকত্ব নিয়ে ছেলেখেলা চলছে কেন?

এই যে প্রতি বছর ট্যাক্স নিয়ে চলেছেন আমাদের কাছে, ট্যাক্স নেওয়ার সময় সন্দেহ হয়নি যে, আমরা ভারতীয় নাগরিক কি না? আমাদের রাজ্যে ভোট চাইতে এসে মনে পড়ে না যে, আমরা নাগরিক কি না?

নাগরিকত্ব নিয়ে ছেলেখেলা চলছে কেন?
  • ১১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: এই যে প্রতি বছর ট্যাক্স নিয়ে চলেছেন আমাদের কাছে, ট্যাক্স নেওয়ার সময় সন্দেহ হয়নি যে, আমরা ভারতীয় নাগরিক কি না? আমাদের রাজ্যে ভোট চাইতে এসে মনে পড়ে না যে, আমরা নাগরিক কি না? তখন প্রশ্ন করতে দেখি না তো যে, আমাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ আছে তো? এই যে আধার কার্ডের সঙ্গে প্যান কার্ড লিঙ্ক করার জন্য ১ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন, সেটা তাহলে ঠিক আছে? নাগরিকদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং সবরকম আর্থিক লেনদেনে যাতে স্বচ্ছতা আসে, সেই কারণে আধার ও প্যানের লিঙ্ক করা। তাই তো? আবার আপনারাই  এখন বলছেন আধার কার্ড নাকি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়? ওই যে আধার কার্ডের সঙ্গে ভোটার কার্ডের লিঙ্কও করানোর জন্য মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন? কেন? এখন তো বলছেন আধার কার্ড নাগরিকত্ব নয়? একটা কথা বলুন তো! ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ তো? প্যান কার্ড? পাসপোর্ট? রেশন কার্ড? এসব নাগরিকত্বের প্রমাণ? যদি হয়, তাহলে তাবৎ পরিষেবা পাওয়ার জন্য  বাধ্যতামূলকভাবে সর্বত্র আধার কার্ড নম্বর দিতে হয় কেন? মোবাইল সিম কার্ড পাওয়া হোক কিংবা লোনের জন্য আবেদন। সরকারি নথি পেতে গেলেই হোক কিংবা জমি-বাড়ির রেজিস্ট্রেশন। কই ভোটার কার্ড কিংবা পাসপোর্টে তো কাজ চলে না? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আধার কার্ড বাধ্যতামূলক নয়। অথচ বাস্তবে তো বাধ্যতামূলক শুধু নয়, জোর জবরদস্তি করা হয় যে, আধার কার্ডই লাগবে সবরকম সরকারি ব্যবস্থায়। আর এখন বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় যাকে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বলা হচ্ছে, তখন আপনাদের নির্বাচন কমিশন বলছে আধার কার্ড চলবে না। রেশন কার্ড চলবে না। তার মানে আধার কার্ড কি মূল্যহীন? আপনি বলবেন, ওটা তো নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তাহলে ওটা কী? উত্তর ২৪ পরগনায় আধার কার্ড অ্যাপ্লাই করলে কম্বোডিয়া অথবা গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারাও কি সেটা পেতে পারেন? যদি বলেন, আধার কার্ড তো ভারতীয় নাগরিকদের জন্য। অন্যরা পাবে কেন? ভারতীয়রাই পাবে। তাহলে কমিশন বলছে কেন আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়? যে কার্ড দেখিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের সব রকম পরিষেবা পেতে হয়, সেটা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?

Advertisement

এই যে মাঝেমধ্যেই দেশজুড়ে বিগত ১১ বছর ধরে নাগরিকত্ব নাগরিকত্ব চোরপুলিস খেলছেন আপনারা দিল্লিতে বসে, এর কারণ কী? কখনও এনআরসি। কখনও সিএএ। আবার কিছুদিন পর পর আপনাদের হঠাৎ মনে হয়, আরে, অনেক দিন তো কেওয়াইসি কেওয়াইসি খেলা হয়নি, তখন আবার কেওয়াইসি দিতে হবে ফতোয়া দেওয়া হয়। কখনও ব্যাঙ্কে, কখনও রান্নার গ্যাসে, কখনও পোস্ট অফিসে ইত্যাদি। কেওয়াইসি নেওয়া হয় কেন? কারণ আমরা জেনুইন নাগরিক, এই হল আমাদের বর্তমান ঠিকানা, এটা হল ফোন নম্বর, এই হল বয়স, এসব যা যা তথ্য আপডেটেড, সেটাই জমা দিচ্ছি এবং সেই আপডেটেডে তথ্য সরকারের কাছে জমা থাকছে, এই কারণেই তো! তাহলে আবার কতবার করে আমরা নাগরিক কি না তার প্রমাণ দিতে হবে? ভোটার তালিকা রিভিশন নামক একটি নতুন খেলার আবিষ্কার করে আবার নাগরিকত্ব নাগরিকত্ব মোবাইল গেম টাইপের খেলা চলবে এখন? 
বিহারে ভোটের আগে স্পেশাল রিভিশন করে নতুন ভোটার তালিকা করার নতুন প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন শুরু হয়েছ। এরপর হবে বাংলায়। হবে বাকি সব রাজ্যেও। বিহারের নিয়ম ধার্য 
হয়েছে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকাকে মাপকাঠি ধরা হবে। যাদের নাম সেখানে আছে তাদের কিছু প্রমাণপত্র জমা দিয়ে নিজেদের আপডেট করতে 
হবে। কিন্তু যাদের নাম নেই অর্থাৎ পরবর্তীকালে যাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাদের একঝাঁক জটিল প্রমাণপত্র দিতে হবে। এবং বাংলার বিধানসভা ভোটের আগেও এই একই প্রক্রিয়া হবে। কী সেই প্রক্রিয়া? 
১৯৮৭ সালের আগে যাদের জন্ম, তারা জমা দেবে জন্মতারিখ এবং জন্মস্থানের ডকুমেন্ট। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তাদের দেখাতে হবে নিজেদের জন্মতারিখ, জন্মস্থানের নথিপত্র এবং পিতামাতার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান। ২০০৪ সালের পর যাদের জন্ম তাদের আরও কঠোর পদ্ধতি। তাদের দেধাতে হবে নিজেদের জন্মতারিখ, জন্মস্থানের নথি। আবার পিতামাতারও জন্মতারিখ, জন্মস্থানের ডকুমেন্ট। মোট ১১টি নথিকে নির্ধারিত করা হয়েছে। সেখানে আধার কার্ড নেই। ১০০ দিনের কাজের জবকার্ড দেখালেও হবে না। অথচ গ্রামীণ ভারতে সবথেকে বেশি গ্রামবাসী, দরিদ্র, অনগ্রসর শ্রেণির কাছে এসবই আছে। 
সংবিধানের ২১ নং ধারা হল রাইট টু প্রাইভেসি। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের পরিসরে কেউ অনুপ্রবেশ করতে পারে না। সবথেকে বেশি এই সংবিধানের লঙ্ঘন করছে কে? রাষ্ট্র। ভারত সরকার। যখন তখন, আধার কার্ড চায়। আবার যখন তখন বলে আধার কার্ড চলবে না। 
বাংলা, বিহার, অসমে সবথেকে বড় বিপদে পড়তে চলেছে কারা? বিগত ৫৫ বছরে যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে স্থায়ী নাগরিক হয়ে গিয়েছে। সেটা শুধু মুসলিম নয়। তার থেকে অনেক বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী। ১৯৬৯ সালের পর থেকে অনবরত যারা এসেছে, আটের দশক, নয়ের দশক, নতুন শতাব্দী, গত ২৫ বছর, যারাই এসেছে, তাদের এবার জন্ম তারিখ, জন্ম স্থানের প্রমাণপত্র দিতে হবে। অথচ তারা পারিবারিকভাবে এই এতকাল ধরে সব নাগরিকত্বের কার্ডই পেয়ে গিয়েছে। এমনকী সম্প্রতি সিএএ তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আরও সুযোগ করে দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালের  ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারাই এসেছে, তারা আবেদন করতে পারে নাগরিকত্বের জন্য। প্রশ্ন হল, যারা যারা সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পেয়ে গেল বা যাবে, তাদের ক্ষেত্রে এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের নিয়ম কী হবে?
কিন্তু ১৯৪৭ সালের আগে অথবা পরে থেকেই যারা ভারতের বাসিন্দা, তাদের কাছে একটি রাষ্ট্র ১১ বছর ধরে বারংবার প্রমাণ চাইছে নাগরিকত্বের, এটা অপমান নয়? এই যে অসমে এনআরসি করা হল। এবার বাংলাতেও করা হবে স্পেশাল রিভিশন। ২০২৬ সাল থেকে শুরু হবে সেন্সাস। প্রথমে বাড়ি বাড়ি এসে গৃহগণনা। তারপর জনগণনা। সেই সময়ই ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার তৈরি। জনগণনায় একটি মানুষ অথবা পরিবারের হাঁড়ির খবর নিয়ে নেওয়া হবে। জনগণনায় প্রশ্ন করা হবে যে, এই ঠিকানায় আপনি কতদিন ধরে আছেন, এর আগে কোথায় ছিলেন। কাগজ দেখতে চাওয়া হবে। এসবই তো হবে। তাহলে তার আগে আবার এই স্পেশাল ভোটার তালিকা রিভিশনে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে বৈধ নাগরিকদের কাছে? 
সীমান্ত বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের অধীনে। অনুপ্রবেশ হয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার উভয়েই সেটা প্রতিরোধ করবে কিংবা চিহ্নিত করবে। কাকে জাল আধার কার্ড দেওয়া হয়েছে, কে ভুয়ো ভোটার কার্ড পেয়েছে, কতজনের 
আদৌ কোনও নাগরিকত্বের প্রমাণ নেই, এসব খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। বৈধ নাগরিককে এত বিপদে ফেলছেন কেন? এত অসম্মান করছেন 
কেন? আমরা কেন বারংবার ফর্ম ফিল আপ করব? কেন আমরা ভয়ে ভয়ে বারংবার কেওয়াইসি জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়াব? কেন বছরে দশবার করে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, প্যান কার্ড—এসবের ফোটোকপি করে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে বেড়াতে হবে আমাদের? একটি দেশের নাগরিকদের কাছে এতরকম কার্ড থাকে? যতরকম কার্ড ভারতবাসীকে কাছে রাখতে হয়? তারপরও আবার ভোটার তালিকা রিভিশনের নামে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে আমাদেরই! 
আমাদের প্যান নম্বর আপনাদের কাছে আছে। সামান্য কোনও আর্থিক অস্বাভাবিকতার লেনদেন দেখলে আপনাদের নজরে আমরা চলে আসব। আমাদের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা করতে হবে বলে ভয় দেখান। আমাদের থেকে গড়ে মাসে দেড় লক্ষ কোটি টাকা করে জিএসটি নিয়ে চলেছেন। জনতার থেকে ২২ লক্ষ কোটি টাকা সার্বিক ট্যাক্স পেয়েছেন বিগত বছরেই। আপনারা জানেন না আমরা সত্যিকারের নাগরিক কি না? করোনার সময় ব্যালকনিতে থালা বাজানোর নির্দেশ দেওয়ার সময় মনে পড়েনি নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র চাওয়ার কথা? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ