রায় কম। নির্দেশ বেশি। যাকে অর্ডার বলা হয়। আবার অর্ডার কম। মন্তব্য বেশি। যার নাম অবজার্ভেশন। বিগত ২৫ বছরে ভারতের বিচার ব্যবস্থায় যে বিপুল পরিবর্তন এসেছে, তার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল, আদালত বহুমাত্রায় অতি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অনেক বেশি কঠোর বাক্য ও তিরস্কার, ভর্ৎসনা ইত্যাদি বেড়ে গিয়েছে। লক্ষ করা যায়, আদালতে ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতা হল, ধমকের সুরে, হুঁশিয়ারির ধাঁচে, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অবজার্ভেশন বা মন্তব্য প্রদান করা। সেইসব অবজার্ভেশন সংবাদমাধ্যমে বৃহৎ আকারে প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রায় ২৫ বছর ভারতের বিচার বিভাগ মূলত সংবিধান, আইন, অপরাধ, অনিয়ম, প্রশাসনিক সমস্যা, রাজনৈতিক জটিলতা ইত্যাদি বিষয়েই সীমাবদ্ধ ছিল বিচার বিভাগ। কিন্তু লক্ষ করা যায়, জরুরি অবস্থার আগে ও পরে থেকেই মূলত শুরু হয়েছিল বিচার বিভাগের সক্রিয়তা বৃদ্ধির একটি প্রবণতা। বিগত দুই দশক অথবা তার বেশি সময় ধরে বিভিন্ন স্তরের আদালতের রায় কিংবা অর্ডার নিয়েও প্রচুর বিতর্ক দানা বেঁধেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওইসব রায় ও অর্ডারের যুক্তি কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। এবং সর্বোপরি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একাংশের দুর্নীতি ক্রমেই একটি জাতীয় স্তরের ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ করে এমন কিছু রায় দেওয়া হয়, তা সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। অথবা যুক্তির অভাব হিসেবে আলোচিত হয়।
২০১৩ সালে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অরুণ জেটলি রাজ্যসভায় বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত একটি সংবিধান সংশোধনী বিলের আলোচনায় একটি টার্ম ব্যবহার করে বলেছিলেন, ভারতের বিচার বিভাগে দ্রুতহারে যা বাড়ছে সেটিকে বলা যায় ‘জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম’। অর্থাৎ আদালত অনেক বেশি অ্যাক্টিভিস্টের কাজ করছে। অরুণ জেটলি উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, আদালত ভুলে যাচ্ছে যে, আইন প্রণয়ন করা তার দায়িত্ব নয়। সরকারি নীতি গ্রহণ করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। বিচার বিভাগ সরকার তথা প্রশাসনের কোনও ত্রুটিকে চিহ্নিত করে সেটি সংশোধন করতে নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু কীভাবে আইন প্রণয়ন করা হবে অথবা কোনও নীতি তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে, সেটা বলে দিতে পারে না। কেন? কারণ বিচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব হল যে, কোনও মামলার জুডিশিয়াল রিভিউর সমাধান করা। এমনকী জেটলি বলেছিলেন, বিচার বিভাগের এক্তিয়ার ঠিক কত পর্যন্ত? আমরা জানি না। বিচার বিভাগ নিজেরাই ঠিক করে। অথচ সরকারের এক্তিয়ার কতটা সেটা বিচার বিভাগ বলে দেয়।
বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা কতটা? কেন বিচার বিভাগের কোনও ত্রুটি অথবা সন্দেহজনক আচরণের রিভিউ করা যাবে না? কিংবা বিচারপতি নিয়োগ এবং বদলি প্রক্রিয়ায় কেন সংস্কার হবে না? এই তাবৎ বিষয়গুলি নিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরে বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টের এক বিচারপতির বাসভবনের স্টোররুম থেকে কোটি কোটি টাকার ৫০০ টাকার বাণ্ডিল পাওয়ার পর বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আবার জাতীয় স্তরের চর্চার কেন্দ্রে এসেছে সম্প্রতি। নতুন করে ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন আইন আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও চলছে চিন্তাভাবনা। প্রসঙ্গত এই ইস্যুতে কমবেশি সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই রয়েছে ঐকমত্য। সেটি হল, বিচার বিভাগকে দায়বদ্ধতা নিতে হবে। বিচার বিভাগ নিজেদের নিয়োগ নিজেরাই করতে পারে না। এটা স্বচ্ছতা নয়। তৃতীয়ত পক্ষপাতের সম্ভাবনা ও প্রবণতার সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে। তাই একটি কমিশন হওয়াই কাম্য বলে কমবেশি সব রাজনৈতিক দল মনে করে। অর্থাৎ কমিশন স্থির করবে বিচারপতিদের নিয়োগ ও বদলি। সেই কমিশনে থাকবে সরকারের প্রতিনিধিও। একা সুপ্রিম কোর্ট নয়। অবশেষে ২০১৫ সালে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে আইন পাশ করার পর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দেয়।
বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে প্রথম যে চাঞ্চল্যকর মামলাটি জনজীবনকে আন্দোলিত করেছিল সেটি ১৯৮১ সালের ‘ফার্স্ট জাজেস কেস’। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা হবে এক্সিকিউটিভের তথা সরকারের। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ভূমিকা হবে পরামর্শদাতার। অর্থাৎ প্রাইমেসি থাকবে এক্সিকিউটিভের তথা সরকারের। এই রায়ের পর থেকে লাগাতার দেখা যায় বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের সংঘাত। বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে মতান্তর, সুপারিশ পাল্টা সুপারিশ, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির অভিমত প্রত্যাখ্যান করা ইত্যাদি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৩ সালে বৈপ্লবিক একটি মামলা এল। তার নাম সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস অন রেকর্ড ভার্সাস ইউনিয়ন অফ গভর্নমেন্ট। এই মামলার বিখ্যাত নাম হল, সেকেন্ড জাজেস কেস। ১৯৯৩ সালের ৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল, বিচারপতি নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিই কার্যত প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ এবার থেকে প্রাইমেসি প্রধান বিচারপতি। তাঁর পরামর্শদাতার ভূমিকা বদলে যাবে যৌথ ভূমিকায়। অর্থাৎ ‘কনসাল্টেশন’ হয়ে যাবে ‘কনকারেন্স’। এই লক্ষ্যেই তৈরি করা হবে একটি কলেজিয়াম। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি থাকবে। সেখানে অন্য বিচারপতিরা সদস্য। এই কমিটি তথা কলেজিয়াম সুপারিশ করবে বিচারপতি নিয়োগ ও বদলি। এক্সিকিউটিভ (রাষ্ট্রপতি তথা সরকার) সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পরামর্শ করতে পারেন বিচারপতির সঙ্গে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি তথা কলেজিয়ামের সুপারিশ চূড়ান্ত। কোনও নির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া সেই সুপারিশ খারিজ করা যাবে না। এই সিদ্ধান্তের কারণ হল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আর রাজনৈতিক মহল যেন বিচার বিভাগকে প্রভাবিত না করতে পারে। এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল সংবিধান। বলা হয়েছে, সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারের অন্যতম একটি অংশ হল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।
এই ব্যবস্থার পক্ষে বিপক্ষে বহু যুক্তি আছে। বিচারপতিরা অবসরের পর অথবা চাকরি ছেড়ে দিয়ে সরাসরি এমপি হয়ে গিয়েছেন কোনও দলের। অথবা কোনও দলের পক্ষে অথবা বিপক্ষে কর্মরত অবস্থায় বিশেষ সমর্থন কিংবা বিরুদ্ধতা দেখান। এই সব উদাহরণ বিচার বিভাগের পক্ষপাত এবং বিভিন্ন রায় কিংবা অর্ডারের ক্ষেত্রে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
বিচার বিভাগের যে সংস্কার প্রয়োজন সেকথা অনস্বীকার্য। কোটি কোটি মামলা সমাধানহীন হয়ে পড়ে রয়েছে দেশজুড়ে। বিচারপতির সংখ্যা কম। আদালতের পরিকাঠামোর উন্নতির দাবি উঠছে বহু বছর ধরে। বহু আদালতের কাজের পরিবেশ নেই। আগত বিচারপ্রার্থীদের জন্য পরিষেবা নেই। সুতরাং বিচার বিভাগের সংস্কার সর্বাগ্রে প্রয়োজন। এই সংস্কারের মধ্যেই আনা প্রয়োজন বিচারবিভাগীয় দায়বদ্ধতা। প্রশ্ন উঠেছে বিচারপতিদের যোগ্যতা নিয়েও।
ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস যে গাইডলাইন দিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে,বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেমন দরকার, তেমনই সমান গুরুত্বপূর্ণ বিচারপতিদের নীতি, মূল্যবোধ রক্ষা করা ও সেটা প্রয়োগ। ১৯৬৮ সালের জাজেস ইনকোয়ারি অ্যাক্ট অনুযায়ী বিচারপতিদের অপরাধ প্রমাণিত হলে সরিয়ে দেওয়ার বিধি রয়েছে স্পষ্ট। কিন্তু বিচারপতিদের কাজের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান, গোপন দুর্নীতির বিচার করা হবে কীভাবে?
বিচারপতিদের অভিযোগ এলে প্রধান বিচারপতি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বলেন, প্রাথমিক তদন্ত করতে। যদি সেই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রাথমিক তদন্তের পর জানান যে, গভীর তদন্ত দরকার, তখন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। যদি সেই কমিটি তদন্তের পর জানায় যে, অভিযুক্ত বিচারপতি সত্যিই অপরাধী, তখন প্রধান বিচারপতি তাঁকে ইস্তফা দিতে বলেন। অথবা স্বেচ্ছা অবসর নিতে। কিন্তু তিনি যদি ওই নির্দেশ মানতে অগ্রাহ্য করেন? তখন প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে কমিটির তদন্ত রিপোর্ট জানিয়ে বলেন সেই বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে। এসব হল গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে। কিন্তু ক্ষুদ্র তথা মাঝারি মানের অপরাধ অথবা নিয়ম? তখন সতর্ক করে, তিরস্কার করে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনটা গুরুতর, কোনটা ক্ষুদ্র অভিযোগ, সেটা সর্বদা জনগণ জানবে কীভাবে?
একই বিষয়ের নিম্ন আদালতের রায় একরকম। উচ্চ আদালতের রায় অন্যরকম। পূর্ববর্তী রায় পরে স্থগিত হয়ে যায়। কোনও রায় অথবা নির্দেশের সামাজিক প্রভাব কতটা হতে পারে সেটা নিয়ে বিচার বিভাগের চিন্তা করা উচিত কি না এই বিতর্কও দীর্ঘদিনের। বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং প্রশাসন। তিনটি স্তম্ভ রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। এই তিন শক্তির মধ্যে সংঘাত নতুন নয়। প্রত্যেকের মধ্যে চাপা প্রতিযোগিতা চলে কার ক্ষমতা বেশি সেটা প্রমাণের। কার অধিকারে কে প্রবেশ করছে এই বিতর্ক যেন অন্তহীন একটি প্রথার জন্ম দিয়েছে। আর এই চাপানউতোরের জেরে সবথেকে বড় সমস্যায় সাধারণ মানুষ। অবজার্ভেশন, রায়, অর্ডার সব হোক। আইন নীতি এবং জুডিশিয়াল রিভিউ, সব হোক। সাধারণ মানুষ বেশি কিছু চায় না। সে শুধু সুবিচার চায়। আর চায়, আদালতের বিচারে যেন পূর্ণ আস্থা রাখা যায়। স্বাধীনতার ৭৮ তম বর্ষে এসে এটা কি খুব বেশি প্রত্যাশা?