Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন সর্বশক্তিমান?

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে অপরাজেয় মনে করছেন কেন? কারণ তিনি জানেন যে, সত্যিই তিনি পৃথিবীর সম্রাট। অস্ত্র দিয়ে নয় শুধু। টেকনোলজি দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে মনের সব রাগ প্রকাশ করার স্থান ফেসবুক। ইনস্টাগ্রাম। হোয়াটস অ্যাপ। ইউটিউব ভিডিও। এক্স।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন সর্বশক্তিমান?
  • ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে অপরাজেয় মনে করছেন কেন? কারণ তিনি জানেন যে, সত্যিই তিনি পৃথিবীর সম্রাট। অস্ত্র দিয়ে নয় শুধু। টেকনোলজি দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে মনের সব রাগ প্রকাশ করার স্থান ফেসবুক। ইনস্টাগ্রাম। হোয়াটস অ্যাপ। ইউটিউব ভিডিও। এক্স। 

Advertisement

তিনি চা‌ই঩ছেন এই প্ল্যাটফর্মগুলিতে তাঁর বিরুদ্ধে আক্রমণের জোয়ার আসুক। কারণ এই প্রতিটি কোম্পানি আমেরিকার। আমেরিকার সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মে আমেরিকার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করার সংখ্যা যত বাড়বে, ততই বেশি করে রেভিনিউ জেনারেট করবে। অর্থাৎ এইসব কোম্পানি আরও লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞাপন পাবে। আরও বেশি করে তাদের রিচ বাড়বে। আমেরিকান কোম্পানি যত বেশি মুনাফা করবে, আমেরিকার রাজকোষে তত বেশি কর্পোরেট ট্যাক্স ঢুকবে। আমেরিকার ৩০ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি প্রতিদিন আরও বাড়বে।
অতএব আমেরিকার বিরুদ্ধে বড় বড় যা কিছু লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে মনের সব রাগ প্রকট করে, সেগুলির প্ল্যাটফর্ম কিন্তু সেই আমেরিকারই কোম্পানি। আমেরিকাপন্থী হলেও আমেরিকার মুনাফা। আমেরিকা বিরোধী হলেও আমেরিকার মুনাফা। কালচারাল সাম্রাজ্যবাদ আগেই সমাপ্ত হয়েছিল। ফ্যাশন সাম্রাজ্যবাদ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে। সোশ্যাল সাম্রাজ্যবাদও সমাপ্ত। এবার আমেরিকার প্রযুক্তি সাম্রাজ্যবাদের কাছে দুনিয়া আত্মসমর্পণ করেছে। 
একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রেসিডেন্ট অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রনায়কের শয্যাকক্ষে ডেলটা ফোর্সকে প্রবেশ করিয়ে সস্ত্রীক সেই রাষ্ট্রনায়ককে স্রেফ অপহরণ করে বিমানে চাপিয়ে নিয়ে এসে নিজেদের জেলে ঢুকিয়ে দিলেন, এরকম দৃশ্য এখনও পর্যন্ত হলিউড সিনেমাও দেখানোর কল্পনা করেনি। ট্রাম্প করে দেখালেন। 
ভেনেজুয়েলার মতো ক্ষুদ্র কিন্তু স্বাধীন দেশগুলির সরকারকে এভাবে ট্রাম্প আসলে বার্তা দিলেন যে, যেদিন ইচ্ছা হবে সেদিনই তোমাদের এভাবে তুলে আনার ক্ষমতা রাখি। বার্তা দিলেন রাশিয়া ও চীনকেও। কেন? তাদের বুঝিয়ে দিলেন যেসব দেশের সঙ্গে তোমরা বন্ধুত্ব পাতিয়ে রেখে নিজেদের দখল ভারী করার কথা জানাও, তাদের সঙ্গে আমি এরকম করলাম। আর তোমরা নিছক কিছু নিন্দা মন্দ করেই চুপ। এর বেশি কিছু করতে পারছ না। 
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বের একটিও গণতান্ত্রিক দেশ প্রবলভাবে কিছুই করতে পারছে না বিবৃতি দেওয়া ছাড়া। কেন? কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন যে, প্রতিটি দেশের সবথেকে ব্যবহার করা ই-মেল আমেরিকার কোম্পানির। নদীয়ার গ্রাম অথবা প্যারিস নামক শহর, কোনও প্রশ্ন কিংবা তথ্য দরকার হলে তাবৎ বিশ্ববাসী যার শরণাপন্ন হবে তার নাম গুগল। আমেরিকার কোম্পানি। 
এখানেই শেষ নয়। গোটা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা, পেশা আর রোজগারের সংস্থান করে দিয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম। নতুন নতুন পেশার নাম পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে এই আমেরিকার কোম্পানিগুলি। ইউটিউবার। ইনফ্লুয়েন্সার। কনটেন্ট ক্রিয়েটর। পডকাস্ট। স্ট্যান্ড আপ পারফরম্যান্স। রিলস ক্রিয়েটর। ট্র্যাভেল ভ্লগ। ফুড ব্লগার। ফুড ভ্লগার। লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে এইসব প্ল্যাটফর্ম থেকে কোটি কোটি বিশ্ববাসী সংসার চালাচ্ছে এবং সেলেব্রিটি হয়ে যাচ্ছে। 
ডোনাল্ড ট্রাম্প রেগে গেলে এসব একদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা যদি এই প্রতিটি কোম্পানি আমেরিকার বাইরে নিজেদের সার্ভিস বন্ধ করে দেয় তাহলে দুনিয়ার অর্থনীতি ধসে যাবে। সুতরাং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অহংকার হওয়া অযৌক্তিক নয়। আবার তাঁর এই আগ্রাসনের কারণে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  ক্রোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, কেন তিনি এরকম আচরণ করেন। কেন তিনি আমেরিকাকে সর্বশক্তিমান ভাবেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, আই অ্যাম দ্য কিং। তাঁর সেক্রেটারি অফ স্টেট বলেছেন, এই গোলার্ধ আমাদের। আমরা ঠিক করব কোন দেশ কী আচরণ করবে। ল্যাটিন আমেরিকা আমাদের গোলার্ধে। এখানে চীন রাশিয়া আসছে কেন? 
ভারতকে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত অপছন্দ করেন। কেন? কারণ ভারত যতই এই প্রতিটি আমেরিকান কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হোক, আমেরিকায় থাকা সিংহভাগ ভারতীয় পরিবার বিশ্বের অন্য কোনও দেশের মতো মার্কিন সরকারের সামাজিক সুরক্ষার দয়াদাক্ষিণ্যে কিন্তু বেঁচে নেই। নিজেদের ক্ষমতা, মেধা, প্রতিভায় আমেরিকায় তারা বাস করে। 
হোয়াইট আমেরিকানদের গড় বার্ষিক আয় কত? ৯৩ হাজার ডলার। ভারতীয়দের গড় বার্ষিক আয় কত আমেরিকায়? ১ লক্ষ ৫২ হাজার ডলার। গড় হোয়াইট আমেরিকানরা দিনে কতক্ষণ কাজ করে অফিসে? ৭ ঘণ্টা। মার্কিন ভারতীয়রা গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে। বাড়িতেও কাজ করে তারা। আর তাই সব কোম্পানির কাছে হোয়াইট আমেরিকানদের থেকে যোগ্য ভারতীয়দের চাহিদা বেশি। 
সম্প্রতি ট্রাম্প একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে কোন কোন দেশের অধিবাসীরা আমেরিকায় থেকে মার্কিন সরকারের থেকে 
সবরকম সামাজিক  সুযোগসুবিধা অর্থ 
সহায়তা নিচ্ছে। সেই অসংখ্য দেশের তালিকায় ভারত নেই। কারণ ভারতীয়রা আমেরিকায় ভ্যালিড ওয়ার্ক ভিসা নিয়ে যাচ্ছে। স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যাচ্ছে। যে অংশটি অবৈধভাবে ঢুকেছে কিংবা থাকছে, সেই অংশ নগণ্য। 
কিন্তু এসব সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আমেরিকার শক্তি যে বিশ্বে সম্রাটসম সেটি নিয়ে কোনও সংশয় নেই। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য কারা? আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স। অর্থাৎ গোটা বিশ্বে যত ঘটনা ঘটে, সেসব নিয়ে রাষ্ট্রসংঘকে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে এই পাঁচ দেশের মতামতকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। আমেরিকা ছাড়া আর কোনও দেশকে রাষ্ট্রসংঘ আসলে গুরুত্বই দেয় না। সেটা তো চোখের সামনেই দেখা যায়। কেন? কারণ রাষ্ট্রসংঘকে আমেরিকা সবথেকে বেশি অর্থ প্রদান করে। বছরে ১৫০০ কোটি ডলার। সেখানে চীন যে এত হম্বিতম্বি করে থাকে আমেরিকার বিরুদ্ধে, সে কত দেয়? ৬৮ কোটি ডলার। ভারত কত দেয়? ৪ কোটি ডলার! রাষ্ট্রসংঘের এত বাবুগিরি কার টাকায় চলে তাহলে? আমেরিকার। রাষ্ট্রসংঘের কী ক্ষমতা আছে তাহলে যে তারা ইজরায়েলকে ধমক দেবে? যেখানে ইজরায়েলের মাথায় আমেরিকার আশীর্বাদের হাত?
আমাদের প্রশ্ন চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান এবং ভারতকে। সেটি হল তারা সকলে মিলে কেন প্রযুক্তিতে আমেরিকার এই প্রবল পরাক্রম প্রতিরোধ করতে পারছে না? কেন এইসব দেশ নিজেদের একটিও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারছে না? গোটা বিশ্ব কেন শুধুই ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, গুগল, ইউটিউব ব্যবহার করে? গোটা বিশ্বের সব যুবকের কেন স্বপ্ন একটা অ্যাপল ফোন কবে পাবো? কাদের কোম্পানি অ্যাপল? আমেরিকার। কেন আমেরিকা থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এইসব দেশে চাকরি করতে কিংবা পড়াশোনা করার জন্য ভিসা চাইছে না? কেন গোটা বিশ্বের প্রতিটি দেশের যুবসমাজের স্বপ্ন আমেরিকায় একবার সেটল করতে পারলে আর চিন্তা নেই? 
ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি এক বড়সড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছেন। বিগত ৮০ বছরে এরকম সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব আর আসেনি মহাবিশ্বে। সবই ঠিক। এখনই অবিলম্বে ট্রাম্পের সর্বনাশা এই আগ্রাসন বন্ধ হওয়া দরকার। নচেৎ যুদ্ধ শিয়রে। ধ্বংস শিয়রে। সভ্যতার সংকট শিয়রে। সকলেই ভাবছে ট্রাম্পকে থামানো দরকার। 
 প্রশ্ন হল, এই বিজয়রথ কীভাবে থামানো যাবে? সেই নিয়ে একজোট হয়ে ইওরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়াকে ভাবতে হবে। বসতে হবে। এদিকেও আছি, ওদিকেও আছি এভাবে চলবে না। আজকের বাণিজ্য সভ্যতায় হঠাৎ করে আমেরিকার মুখের উপর সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়া যায় না। ইচ্ছা কর঩লেই যুদ্ধ করা যায় না। 
এত সবের পরও বলা যায় আশাবাদের কথা। সেটি নিয়তি নির্ধারিত। এক সময় ব্রিটিশরাজ ছিল গনগনে সূর্যের মতো। এশিয়া আফ্রিকাজুড়ে ছিল বৃহৎ এক উপনিবেশ। ২০০ বছর ধরে ভারতকে রীতিমতো লুণ্ঠন করে দেশে নিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশরা। ভারত ছিল গোটা দুনিয়ার মোট সম্পদের ২৭ শতাংশের অধিকারী। আর ব্রিটিশরা যখন চলে গেল, তখন সেই ভারত গরিবস্য গরিব দেশে রূপান্তরিত। ৮০ বছরে আজ সেই ব্রিটিশকে ছাপিয়ে ভারত বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি। সুতরাং পৃথিবীর ইতিহাস এক বৃহৎ নাগরদোলা। আমেরিকার সূর্যও অস্ত যাবে একদিন। উদিত হবে নতুন কোনও সূর্য। কবে? সেই উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু তার আ঩গেই তাবৎ দেশকে চিন্তা করতে হবে যে, আমেরিকার বিজয়রথ কীভাবে থামানো সম্ভব? এশিয়া ইওরোপ একজোট হয়ে রাস্তা বের করুক! সফটওয়্যারে ভারত শ্রেষ্ঠ। ভারতই নেতৃত্ব দিক প্রযুক্তি বিশ্বযুদ্ধে! কিন্তু ভারত সরকার কি এসব আদৌ ভাবছে? 
আর হ্যাঁ, ডলারকে চ্যালেঞ্জ করুক সব দেশ মিলে। আমেরিকার মেরুদণ্ড ওটাই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার বয়কট হলেই আমেরিকা নতজানু হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ