Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিস্ফোরণের নেপথ্যে কারা?

সতেরো বছর আগে, ২০০৮-এর ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও শহরের ভিখু চকে আরডিএস বিস্ফোরণে ৬ জনের মৃত্যু ও শতাধিক আহতের ঘটনায় ঝড় উঠেছিল গোটা দেশে।

বিস্ফোরণের নেপথ্যে কারা?
  • ২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সতেরো বছর আগে, ২০০৮-এর ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও শহরের ভিখু চকে আরডিএস বিস্ফোরণে ৬ জনের মৃত্যু ও শতাধিক আহতের ঘটনায় ঝড় উঠেছিল গোটা দেশে। বৃহস্পতিবার ৩১ জুলাই ২০২৫-এ সেই মামলার রায় ঘোষণা হতেই ফের তোলপাড় গোটা দেশ। সেই ‘কুখ্যাত’ বিস্ফোরণের ঘটনায় বিজেপির নেত্রী ও প্রাক্তন সাংসদ সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর সহ সাত জনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হন প্রজ্ঞা, কর্নেল শ্রীকান্ত পুরোহিত সহ সাতজন। পরে তাঁরা জামিনে মুক্ত হন। অভিযুক্তরা প্রত্যেকে ‘অভিনব ভারত’ নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হওয়ার কারণে ওই সংগঠনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে। সেই প্রথম ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ শব্দবন্ধ প্রচারে আসে। ওই ঘটনায় প্রথমে তদন্ত শুরু করে মহারাষ্ট্র পুলিসের সন্ত্রাসদমন শাখা এটিএস। পরে তদন্তভার হাতে নেয় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। বিচারপর্বে ৩২৩ জন সরকারি সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করা হয়। ১০ হাজার ৮০০টি সাক্ষ্যপ্রমাণ জমা পড়ে আদালতে। এরপর ১৩০০ পাতার চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেয় এনআইএ। অতঃপর ৩১ জুলাই মুম্বইয়ের বিশেষ এনআইএ আদালতের বিচারক এ কে লহাটি রায় ঘোষণা করে জানান, ‘উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ’ ও ‘প্রক্রিয়াগত ত্রুটি’র কারণে সাত অভিযুক্তকেই বেকসুর খালাস করে দেওয়া হল। কারণ শুধু সন্দেহের বশে কাউকে দায়ী করা যায় না। কথাটা ঠিক ও যুক্তিযুক্ত। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার নাকি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে বিস্ফোরণ কে বা কারা ঘটাল? যার জেরে এতজন মানুষের প্রাণ গেল? অন্তত সেটা তো সামনে আসুক। 

Advertisement

আদালতের রায় নিয়ে সরাসরি কোনও বিতর্ক না হলেও প্রশ্ন উঠেছে, মোদি সরকার ও এনআইএ-র ভূমিকা নিয়ে। বিস্ফোরণের পর মহারাষ্ট্র পুলিসের এটিএস টানা তদন্ত শুরু করে ঠিক পথেই এ঩গচ্ছিল বলে নিহতের পরিবার সহ অনেকের ধারণা। তবু তাদের সরিয়ে এনআইএ-এর হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পিছনেই রহস্যের কারণ লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কেন এটিএস-এর কাছে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের থেকে নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণ করে এনআইএ, সেই প্রশ্নও উঠেছে। সন্দেহ দানা বেঁধেছে, সাক্ষীদের বয়ান বদলে ফেলা নিয়ে। বয়ান বদলের কারণ কী হতে পারে? এই মামলায় সরকারি আইনজীবী রোহিণী সালিয়ানের বক্তব্যও কম বিস্ফোরক নয়। তাঁকে তদন্তের মাঝপথে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। রায় ঘোষণার পর মহারাষ্ট্রের এই প্রবীণ দুঁদে আইনজীবী বলেছেন, ‘এমনটা যে হবে, জানাই ছিল। যদি প্রকৃত প্রমাণ না দেওয়া হয় (আদালতকে), তাহলে কী রায় আশা করা যায়? আমাকে সরিয়ে দেওয়ার আগে আমি অজস্র প্রমাণ উপস্থিত করেছিলাম। সেই প্রমাণগুলি কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গেল?’ রোহিণীর অভিযোগ ছিল, এই মামলায় আইনজীবী থাকাকালীন ‘উপরতলার নির্দেশে’ তাঁকে ‘নরম’ হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এনআইএ-র জনৈক কর্তা। এমন সব গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর সন্দেহ জাগতে পারে, তবে কি দীর্ঘ তদন্তে অশ্বডিম্ব প্রসব করল এনআইএ? নাকি অভিযুক্তদের আড়াল করতে মামলাটিকে লঘু করে দেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ অবশ্য কখনও কখনও শোনা যায় সিবিআই, ইডি-র ভূমিকা নিয়েও। এক্ষেত্রেও প্রশ্নও উঠছে, অভিযুক্তরা প্রমাণাভাবে বেকসুর হলে বিস্ফোরণ ঘটাল কে বা কারা? ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় কারা জড়িত তা মানুষ জানতে চায়।  
তবে এই রায়ে স্বস্তির পাশাপাশি গেরুয়া রাজনীতির জয় দেখছে বিজেপি! কাকতালীয় হলেও ঘটনা হল, রায় ঘোষণার আগের দিন ৩০ জুলাই সংসদে ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছিলেন, হিন্দুরা সন্ত্রাসবাদী হয় না। রায়ে সাত হিন্দুত্ববাদী বেকসুর খালাস হওয়ার পর প্রজ্ঞাও বলেছেন, আজ গেরুয়া ও হিন্দুত্বের জয় হল। বিজেপির নেতারা একই প্রচার চালিয়েছেন পরিকল্পিতভাবে। বিস্ময়ের কথা হল, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই মামলা চলাকালীন শুধু তদন্তকারী সংস্থারই বদল হয়নি, মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে বিচার চলেছে পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন বিচারকের এজলাসে। শেষবার গত এপ্রিল মাসে শুনানি শেষ করে রায় ঘোষণার দু’দিন আগে বদলি করা হয় তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারককে। তারপর নতুন বিচারকের অধীনে এই রায় ঘোষণা করা হল। এই রায়ের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট গুজরাতের বিজেপি সরকার বিলকিস বানো মামলার ১১ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে ‘অকাল মুক্তি’ দিয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট সরকারের সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করায় মুক্তিপ্রাপ্তদের ফের জেলে যেতে হয়। মালেগাঁওয়ের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে কেউ যাবে কি না এবং তেমনটা হলে শেষ পর্যন্ত কী হয়— সেটাই এখন দেখার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ