মৃণালকান্তি দাস: লিবিয়ার ত্রিপোলি এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে প্লেনটির গায়ে কোনও চিহ্ন নেই! কোন দেশের প্লেন বোঝাই দায়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স-এর একটি দলকে নিয়ে প্লেনটি উড়ে যাবে কোথাও। গোপন এক মিশনের শেষ পর্যায়ে ছিলেন ওই গোয়েন্দারা। মিশনটি ছিল লিবিয়ার কর্তাদের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা। প্লেনে ওঠার আগে হঠাৎ এক অচেনা লোক এসে হাফ ডজন বাদামি খাম তাঁদের হাতে তুলে দেন।
প্লেনে ওঠার পর তাঁরা যখন খাম খুললেন, সবাই তাজ্জব। সেই চূড়ান্ত প্রমাণই তো তাঁরা এতদিন হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন। খামগুলির ভিতরে ছিল একটি পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা। নকশাটি লিবিয়ায় এসেছিল আবদুল কাদির খানের কাছ থেকে। কে এই আবদুল কাদির খান? পাকিস্তানিরা তাঁকে ‘একিউকে’ বলেই চেনে। বিবিসি লিখছে, তাঁর জীবনকাহিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রযুক্তি নিয়ে চলা লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল— এই প্রযুক্তি যাদের হাতে আছে এবং যারা তা পেতে চায়, তাদের মধ্যে। প্রাক্তন সিআইএ ডিরেক্টর জর্জ টেনেট কাদির খানকে বর্ণনা করেছিলেন ‘ওসামা বিন লাদেনের মতোই বিপজ্জনক’!
যে ব্যক্তি পশ্চিমের গোয়েন্দাদের চোখে ছিলেন বিশ্বের বিপজ্জনক মানুষ, অথচ নিজের মাতৃভূমিতে ছিলেন নায়ক— ‘মহসিন-ই-পাকিস্তান’। এই দ্বৈত পরিচয় শুধু আবদুল কাদির খানের জটিল চরিত্র নয়, বরং পারমাণবিক অস্ত্রকে বিশ্ব কীভাবে দেখে, তারও একটি প্রতিফলন। কাদির খান ইউরোপে পারমাণবিক গুপ্তচর হয়ে ঢোকেননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাই হয়ে উঠেছিলেন। ৭০-এর দশকে তিনি নেদারল্যান্ডসে আলমেলো ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট ফ্যাসিলিটিতে কাজ করতেন। যারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করত। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়, কিংবা যথেষ্ট পরিমাণে সমৃদ্ধ হলে তা বোমা তৈরির জন্যও ব্যবহারযোগ্য।
ততদিনে একাত্তরের যুদ্ধে হেরে গিয়েছে পাকিস্তান। ১৯৭৪ সালের ১৮ মে-র পর আরও এক আতঙ্ক নেমে আসে পাকিস্তানে। সেদিন রাজস্থানের থর মরুভূমির পোখরান টেস্ট রেঞ্জে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায় ভারত। যার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’। ভারতের পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ার এক বছর পর থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে মনোনিবেশ করে পাকিস্তান। পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানিরা প্রয়োজনে ঘাস খেয়ে থাকবে, তবু তারা পারমাণবিক বোমা বানাবে’। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো বিজ্ঞানী কাদির খানের শরণাপন্ন হন। কাদির খান সহজেই ইউরোপীয় কোম্পানির সবচেয়ে উন্নত সেন্ট্রিফিউজের
নকশাগুলি কপি করে ফেলেন এবং দেশে ফিরে আসেন। ভুট্টোর দ্ব্যর্থহীন সমর্থনে রাওয়ালপিন্ডি জেলার কাহুটা শহরে প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭৬ সালের ৩১ জুলাই, কাহুটায় পাকিস্তানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য পাঁচ বছর সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের পয়লা মে, আবদুল কাদির খানের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য রিসার্চ ল্যাবরেটরির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ড. একিউখান রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। যদিও পাকিস্তান তখনও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে পারেনি। কাহুটা ল্যাবরেটরির কথা ভারতের কাছে বেশি দিন গোপন থাকেনি। তাই ল্যাবরেটরির নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের গোয়েন্দারা চিন্তায় পড়ে যায়। তাদের ধারণা ছিল, ভারত যেকোনও সময় তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হানবে। কারণ, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ফলে চূড়ান্ত গোপনীয়তা পাকিস্তানের এই প্রকল্প অনেক বছর পিছিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতের দ্বিতীয় পারমাণবিক পরীক্ষার (অপারেশন শক্তি) কয়েক সপ্তাহ পরে ১৯৯৮ সালের ২৮ মে, প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায় পাকিস্তান। রাতারাতি
কাদির খান হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের ‘পরমাণু বোমার জনক’। যদিও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কাছে তাঁর পরিচয় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ‘গডফাদার’ হিসেবে।
আসলে কাদির খান গোপনে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। কাদির খান তাঁর নেটওয়ার্ককে শুধু আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তা রপ্তানিমুখী করে তোলেন। তাঁর ব্যবসা মূলত ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে, যারা এই পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য অত্যাবশ্যক উপাদান সরবরাহ করত। কাদির খান এক পর্যায়ে হয়ে ওঠেন পারমাণবিক অস্ত্রের দালাল। যিনি এমন সব দেশের সঙ্গে চুক্তি করতেন, যাদের পশ্চিমের দুনিয়া ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করত। এক ডজনের বেশি বার সফর করেছিলেন উত্তর কোরিয়াতে। ধারণা করা হয়, সেখানে পারমাণবিক প্রযুক্তির বিনিময়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রহস্য। খান আসলে একা কাজ করছিলেন, নাকি পাকিস্তান সরকারের নির্দেশেই এসব করছিলেন? বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে বহু লক্ষণই ইঙ্গিত দেয়, পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব শুধু বিষয়টি জানতই না, বরং সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তবে অনেকের দাবি, খান শুধু অর্থের পিছনেই ছুটছিলেন। একসময় জানা যায়, কাদির খানের প্রতিনিধিরা ইরানিদের সামনে একটি ‘মেনু’ পেশ করেছিলেন, যার সঙ্গে মূল্যতালিকাও সংযুক্ত ছিল। যেখান থেকে তারা যা প্রয়োজন তা অর্ডার করতে পারত। ইরানের নাতাঞ্জে অবস্থিত যে পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ে আজ এত বিতর্ক, তা গড়ে তোলা হয়েছিল একিউখানের সরবরাহ করা নকশা ও উপাদানের উপর ভিত্তি করেই।
প্রশ্ন হল, ইজরায়েলের ‘চরম শত্রু’ ইরানকে পরমাণু প্রযুক্তি পাচার করেও কাদির খান কীভাবে মোসাদের হাত থেকে বেঁচে গেলেন? ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করেছিল। তাতে সাংবাদিক ইয়োশি মেলমান তুলে ধরেছিলেন কাদির খানের ‘গোপন পরমাণু বাণিজ্যের’ দীর্ঘ ইতিহাস। মেলমান লিখেছেন, কাদির খানের কাছ থেকে পাকিস্তানের পি-ওয়ান ও পি-টু সেন্ট্রিফিউজের নকশা ও পরিকল্পনা কিনে ইরান তার শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মোহসেন ফাখরিজাদেহ-র নেতৃত্বে নিজেদের মতো করে সেন্ট্রিফিউজ বানিয়ে নেয়। মোসাদের তৎকালীন প্রধান শাবতাই শাভিত স্বীকার করেন, মোসাদ ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আমান ঠিক বুঝেই উঠতে পারেনি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কাদির খান আসলে কী করতে চলেছেন। পরবর্তীতে দেখা গিয়েছে, কাদির খানের দেওয়া সেই সেন্ট্রিফিউজ উন্নত করে ইরান আইআর-থ্রি-ফোর-ফাইভ-সিক্স-সেভেন নাম দিয়েছে। সেগুলি এখন নাতাঞ্জ ও ফোরদো পরমাণুকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার প্রতিক্রিয়ায় ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন মোসাদের হামলায় প্রাণ হারান।
সংবাদসংস্থা ‘হারেৎজ’-এ ইয়োশি মেলমান লিখছেন, প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে পরমাণু বোমায় শক্তিশালী করার পর কাদির খান অবসর নেন এবং পরমাণু বোমার ‘গোপন ব্যবসা’ শুরু করেন। তিনি দুবাইয়ে প্রতিষ্ঠান খুলে নিজের পরমাণুজ্ঞান কাজে লাগিয়ে ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, অর্থদাতা ও সহযোগীদের নিয়ে গোপনে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। কাদির খান নিজেই ১৯৮০ দশকের শেষ ও ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে অসংখ্যবার মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। সেই সময় সৌদি আরব, মিশর, আলজেরিয়া ও সিরিয়া কাদির খানের অর্থের বিনিময়ে পরমাণু বোমা বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও ইরান ও লিবিয়া তা
লুফে নেয়। লিবিয়ায় পরিকাঠামো ও বিশেষজ্ঞ না থাকায় তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার আল গদ্দাফি পরমাণু বোমা বানানোর পুরো দায়ভার কাদির খানের উপর দিতে চান। অন্যদিকে, তেলসমৃদ্ধ ইরান নিজেদের মতো করে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৩ সালে আমেরিকা ‘মানববিধ্বংসী অস্ত্র’ রাখার অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করলে গদ্দাফি বুঝতে পারেন, এরপর তাঁর পালা। সেইসময় তিনি সিআইএ ও এমআইসিক্স-র সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। বিবিসির সাংবাদিক গর্ডন কোরেরা লিখছেন, লিবিয়ার চুক্তি একদিকে যেমন সাফল্য পেয়েছিল, অন্যদিকে তেমনই কাদির খানের নেটওয়ার্কের পতনও নিশ্চিত করেছিল। লিবিয়ার তৎকালীন নেতা কর্নেল গদ্দাফি তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর বাদামি খামের মধ্যে নকশা সিআইএ-র গোয়েন্দাদের হাতে পৌঁছে দেন। সেই বাদামি খাম হাতে আসার পর এমআইসিক্স কিংবা সিআইএ সব সময়ই কাদির খানকে চোখে চোখে রাখত। তিনি কোথায় যান, কার সঙ্গে কথা বলেন, তাতে তো নজর রাখতই, তাঁর ফোনেও আড়ি পাতত। একসময় তাঁর নেটওয়ার্কে ঢুকতে কাঁড়ি
কাঁড়ি অর্থও খরচ করেছে আমেরিকা ও ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা।
ইয়োশি মেলমান লিখেছেন, কাদির খান শুধু যে মোসাদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন তাই নয়, সিআইএ-ও তাঁকে থামাতে পারেনি। অথচ, পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে কাদির খানের ভূমিকা ও পরবর্তীতে তাঁর ‘ফ্রিল্যান্স পরমাণু বাণিজ্য’ থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল সিআইএ-র হাতেই। ১৯৭৫ সালে কাদির খান নকশা হাতিয়ে নেদারল্যান্ড থেকে চলে যাওয়ার পর তৎকালীন ডাচ প্রধানমন্ত্রী রুড লুবারস জানতে পারেন, সবকিছুই ঘটেছে সিআইএ-র চোখের সামনে। আসলে পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর দেশ হতে বাধা দিতে চায়নি আমেরিকাই। কিন্তু মুসলিম দুনিয়ায় পরমাণু নকশা ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক গ্রাস করেছিল হোয়াইট হাউসকে।
একসময় সেই আমেরিকারই চাপে জেনারেল পারভেজ মোশারফের জমানায় কাদির খানকে গৃহবন্দি করা হয় এবং তাঁকে টেলিভিশনে স্বীকারোক্তিও দিতে বাধ্য করা হয়। তিনি তাঁর জীবনের বাকি সময় কাটান এক অদ্ভুত ‘মধ্যবর্তী জগতে’। না তিনি পুরোপুরি মুক্ত, না পুরোপুরি বন্দি। তাঁর বিদেশ সফর ও বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ নিষিদ্ধ ছিল। আর তাই, তিনি আসলে ঠিক কী করেছিলেন এবং কেন করেছিলেন— তার পুরো সত্যটি হয়তো আর কোনওদিন জানা যাবে না।
হয়তো আমেরিকা সেটাই চেয়েছিল— যাতে পাকিস্তানের গায়ে আঁচড় না পরে!