দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক। এখনও নিশ্চিত নন আপনি ভারতের নাগরিক কি না। আর কেউ নয়, আপনাকে ধাঁধায় রেখেছে খোদ রাষ্ট্রই! আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ কী? আধার কার্ড কিংবা ভোটার আইডি? না, একেবারেই নয়! সুপ্রিম কোর্টের মতে, নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বক্তব্য যথার্থ—আধার কিংবা ভোটার কার্ড (এপিক) ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণের চূড়ান্ত নথি নয়, অন্যান্য নথির সাপেক্ষেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। বিহারে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) ইস্যুতে গোটা দেশ যখন তোলপাড়, সেইসময় কমিশনের অবস্থানকেই কার্যত মান্যতা দিল শীর্ষ আদালত। মঙ্গলবার বিচারপতি সূর্য কান্ত ও
জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিল, এসআইআর নিয়ে আজকের এই বিবাদের পরিবেশ তৈরি হয়েছে মূলত অবিশ্বাস থেকে, অন্য কিছুই নয়। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি কিংবা বাতিলের অধিকার ইসিআইয়ের রয়েছে। শুধু সুপ্রিম কোর্ট নয়, বম্বে হাইকোর্টের একটি পর্যবেক্ষণও এদিন গোটা বিতর্কে নতুন ইন্ধন জুগিয়েছে। মামলাটি অবশ্য এসআইআর বিষয়ক নয়, এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর জামিনের আর্জি নিয়ে। সেই আর্জি খারিজ প্রসঙ্গে বম্বে হাইকোর্টের এক বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, আধার, প্যান বা এপিক থাকলেই একজন ‘ভারতীয় নাগরিক’ বলে প্রমাণ হয় না। এগুলি স্রেফ পরিষেবা গ্রহণ কিংবা কাউকে শনাক্তকরণের নথিমাত্র। নাগরিকত্ব নির্ধারণে শেষকথা বলবে নাগরিকত্ব আইন (১৯৫৫)।
স্বভাবতই বিতর্ক আরও বেড়েছে এতে। সংগত প্রশ্নও উঠে এসেছে, তাহলে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ গণ্য হবে কোন কার্ড বা নথি? এসআইআরের জন্য নির্ধারিত ১১টি নথিও কি নাগরিকত্বের গ্যারান্টি দেবে? কারও কাছে কোনও সদুত্তর নেই। স্বভাবতই আতঙ্কে সারা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। আদালত দেশের আইনের প্রেক্ষিতেই মন্তব্য করেছে। তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও আমাদের প্রশ্ন থাকবে, আধার কার্ডের উপর নির্ভর করেই তো রেশনে খাদ্যশস্য দেওয়া হয়। মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসা পরিষেবা পায়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সব ধরনের বিমা পলিসি ক্রয়ের অধিকার পেতে দেখা হয় আধার এবং প্যান। ব্যাঙ্কঋণ গ্রহণ এবং জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়েও আধার ও প্যানের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক। রেল এবং বিমান ভ্রমণ, হোটেল বুকিং, ভারতের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে পর্যটনের অনুমতি গ্রহণেও (যেখানে বিদেশি নাগরিকের প্রবেশাধিকার নেই) আধার তথ্য যাচাই করা হয়। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, মিড ডে মিল গ্রহণ, যেকোনও প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসা, একশো দিনের কাজ, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা লাভ এবং পেনশন প্রাপ্তিতেও আধার ও প্যান দেখা হয়। আধার ও এপিকের তথ্য যাচাই করেই ভারতীয় পাসপোর্ট মেলে। এমনকী, ডেথ সার্টিফিকেট পেতেও মৃতের আধার এবং রেশন কার্ড নেওয়া হয়।
তাই প্রশ্ন থাকবে, যেসব মানুষ ‘ভারতীয় নাগরিক’ কি না রাষ্ট্রই জানে না তাদের পিছনে কেন হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে সরকার? যাদের নাগরিক পরিচয় নিয়ে এত সংশয় ও সন্দেহ তাদের কাছেই রাষ্ট্রীয় এত সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কোন ভরসায়? আধার এবং এপিক কার্ড যদি গ্রহণযোগ্যই না-হয় তাহলে সরকার এসবের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে কেন? কেন আমরা বহু কাজকর্ম ফেলে এসব বানাবার জন্য সময় নষ্ট করছি এবং হয়রান হচ্ছি? সবাই চাইলেই ছুটি পায় না। সবার কাজ/ব্যবসা বন্ধ রাখলে পেট চলে না। এই অবাঞ্ছিত ব্যস্ততার অবসান জরুরি। আর সরকার জানাক, এই হিড়িকের শেষ কোথায়? কবে চূড়ান্ত নথি হাতে পাব আমরা, যাকে দেশের কোনও সংস্থা, আইন, আদালত সুদূর ভবিষ্যতেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। অতীতে যে এত এত কার্ড এবং নথি বানানো হল, একটার সঙ্গে আর একটার লিঙ্ক করা হল বাধ্যতামূলকভাবে, তার জন্য কত হাজার কোটি টাকা রাজকোষ থেকে খসল এবং সাধারণ মানুষের গাঁটগচ্চা গেল? সব পরিষ্কার করে জানাক সরকার। আইন মানুষকে তৈরি করে না। মানুষের প্রয়োজনে মানুষই আইন তৈরি করে। এতদিন পর্যন্ত আমরা যেসব নথিকে ভারতীয় নাগরিকত্বের যথাযথ প্রমাণপত্র বিবেচনা করতাম, সেগুলি হঠাৎই নস্যাৎ হয়ে গেল! সেগুলিকেই মান্যতা দেওয়ার জন্য এবার আইন তৈরি করা হোক। দু’দিন অন্তর হুজুগ আর হয়রানি মানুষ আর নিতে পারছে না। ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সমবেত দাবি, দয়া করে সকলকে রেহাই দেওয়া হোক। স্বীকতি পাক স্বাধীন দেশে সত্যিকার স্বাধীনতাভাবে বাঁচার অধিকার।