মৃণালকান্তি দাস: কালো হিজাবে ঢাকা, চোখে কালো চশমা পরা লাস্যময়ীর বেশ ধরেই তেহরানের মাটিতে পা রেখেছিলেন এক ফরাসি মহিলা। সঙ্গে ফ্রান্সের পাসপোর্ট। তেহরান তাঁকে চিনত, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া আউটলেটে নিয়মিত আমেরিকা-ইজরায়েল বিরোধী লেখালেখি করতেন। এটাই ছিল ক্যাথরিন পেরেজ-শাকদামের পরিচয়।
মধ্যপ্রাচ্য, ইসলামিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান। ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা ও অ্যান্টি-সেমিটিজম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। লন্ডনে পড়াশোনার সময় এক ইয়েমেনি মুসলিম ছেলের সঙ্গে প্রেম এবং তাঁকে বিয়ের পর সুন্নি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে শিয়া মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং শিয়া ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে বেশ কিছু বই ও প্রবন্ধ লেখেন। শুধু তাই নয়, কালো হিজাবে নিজের চেহারা বদল করে রাতারাতি ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়াতেও নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেই সূত্রেই ঢুকে পড়েছিলেন ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অভিজাত শ্রেণির অন্দরে।
ক্যাথরিন পেরেজ-শাকদাম মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক লেখালেখি ও বিশ্লেষণের জন্য মিডল ইস্ট আই, মিডল ইস্ট মনিটরের মতো বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকার ‘মিন্টপ্রেস’ নিউজেও লিখতেন। এমনকী ওই প্ল্যাটফর্মে টিভি ও ভিডিও উপস্থাপক হওয়ার জন্য লবিংও করেছিলেন। সম্প্রতি মিন্টপ্রেস–এর সিইও মনার অ্যাডলি জানিয়েছেন, ক্যাথরিন নিজেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ‘নিজেকে একজন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত, যুদ্ধবিরোধী সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর উগ্র মার্ক্সবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লেখাগুলি তাঁকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। ক্যাথরিন মিন্টপ্রেসকে ব্যবহার করেছেন সেইসব মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য, যারা ইরানিদের
প্রতি সহানুভূতিশীল, কিংবা যারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ও যুদ্ধ হুমকির শিকার... এটা খুবই নাড়া দেওয়ার মতো বিষয়।’
ক্যাথরিনের লেখালেখি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকেন্দ্রিক ছিল। ২০১৬ সালে লিখেছিলেন, ‘নির্মম সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে আক্রমণ চালিয়েছে, যা দক্ষিণ আরবের সবচেয়ে দরিদ্র দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। অসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করেছে... ইয়েমেনকে কার্যত আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেন রিয়াধ তাদের দীর্ঘদিনের তেলসম্পদের একচেটিয়া মালিকানার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।’ তিনি প্রায়ই রুশ কমিউনিস্ট নেতা লেনিনের ভাবনায় ভর করে আজকের সমাজ ব্যাখ্যা করতেন। বলতেন, ‘পুঁজিবাদ চায় আরও জমি, আরও সম্পদ কর্পোরেশন ও তাদের মালিকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে— যাদের নব্য-রক্ষণশীলতা বহু বিলিয়ন ডলারের মালিকদের মর্যাদায় উন্নীত করেছে, আর বাকি ৯৯ শতাংশকে ফেলে দিয়েছে উচ্ছিষ্ট খোঁজার অবস্থায়।’ এসবই ছিল নিজেকে আড়াল করার কৌশল...
একসময় মিন্টপ্রেস ক্যাথরিন সম্পর্কে ঘনিষ্ঠদের কাছে খোঁজ নেওয়া শুরু করে। ওই সূত্রেই জানা যায়, ক্যাথরিন কাউকে কাউকে প্রতি মাসে হাজার হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। শর্ত ছিল, তাকে মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু শহরের নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হবে এবং সেখানকার ছবি ও ভিডিও তুলে দিতে হবে। ক্যাথরিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই অর্থ আমেরিকা থেকে আসছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর অনেক সময় মনে হয়েছিল, ক্যাথরিন হয়তো ইজরায়েলি গুপ্তচর! বলেছিলেন খোদ মিন্টপ্রেসের সিইও। এও বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, তিনি মিন্টপ্রেস-এ কাজের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেছেন নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য। যাতে ইরানে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। আমার আত্মবিশ্বাস, ক্যাথরিন একজন গুপ্তচর।’
শেষ পর্যন্ত মিন্টপ্রেস ক্যাথরিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু ততদিনে, অর্থাৎ ২০১৭ সালের মধ্যে, তিনি বিকল্প সংবাদমাধ্যমে কাজ করে ইরানি মিডিয়ায় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। ২০১৭ সালে তিনি ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ইব্রাহিম রাইসির প্রচার দলে সরাসরি যোগ দেন। ভোট প্রচারে রাইসির ব্যক্তিগত বিমানে সফরসঙ্গীর তালিকায় অন্যতম ছিলেন ক্যাথরিন। পশ্চিমী দুনিয়ার একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে রাইসির একচেটিয়া সাক্ষাৎকারও নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও রাইসি সেই নির্বাচনে পরাজিত হন। তবে ২০২১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
রাইসির সূত্র ধরেই ক্যাথরিন একসময় হয়ে উঠেছিলেন জেনারেল কাশেম সোলেইমানি এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খামেনেই-র বিশ্বস্ত। তাঁকে দেখা গিয়েছে ইরানের প্রেস টিভির বিশ্লেষক হিসেবে। মাশরেক নিউজ, তাসনিম নিউজ ও মেহর নিউজে নিয়মিত ইয়েমেন যুদ্ধ, সৌদি ও ইজরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। খামেনেই-র নামে তিনিই লিখতেন সব লেখা। চলতি বছরের গোড়ায় তা ফাঁস হওয়ার পর ক্যাথরিনের সব লেখা ডিলিট করে নিজেদের মুখ রক্ষা করার চেষ্টা করে তেহরান। যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওয়েবসাইট ‘খামেনেই ডট আইআর’–এ তাঁর ১৮টির বেশি প্রতিবেদন এখনও ওয়েব্যাক মেশিনে সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর লেখায় থাকত প্যালেস্তাইনের সশস্ত্র প্রতিরোধকে সমর্থন এবং ইরান সরকারের প্রতি গোঁড়া সহানুভূতি। বছরের পর বছর ধরে কেউ টেরই পায়নি, ইরানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশের আড়ালে রয়েছে ক্যাথরিনের অন্য খেলা। ইরানকে ধ্বংস করাই ছিল তাঁর একমাত্র টার্গেট!
একজন জায়োনিস্ট সাংবাদিক এমন ঘনিষ্ঠভাবে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের সংস্পর্শে কীভাবে আসতে পারেন— এটাই এখন ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির জন্য উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন তেহরান জানতেই পারেনি, ক্যাথরিনের জন্ম আসলে এক ইহুদি পরিবারে। প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি মোসাদ কিংবা অন্য কোনও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার গুপ্তচর? ক্যাথরিন বরাবরই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে যুক্তি দিয়েছেন, এমন একজন ফার্সি ভাষা না জানা ফরাসি নাগরিককে ইরান সংক্রান্ত অভিযানে নিয়োগ করা একেবারেই অযৌক্তিক। যদিও মোসাদ বহু বিদেশিকেই গুপ্তচরের কাজে নামায়। বিশেষ করে ইরাকি ইহুদিদের। দেখা গিয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এমনভাবে, যাতে প্যালেস্তিনীয় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ক্যাথরিন নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বলা শুরু করেছেন, ওই ফরাসি মহিলা আসলে ইজরায়েলের ‘মিস্তাআরভিম’-এর সদস্য। আরবি শব্দ ‘মুস্তাআরাবি’ থেকে নেওয়া, যার অর্থ ‘আরবদের মধ্যে বসবাসকারী’। এই মিস্তাআরভিম ইউনিট হল, ইজরায়েলি সেনাবাহিনী, পুলিস এবং গোয়েন্দা সংস্থার অংশ। যারা শত্রু রাষ্ট্রে গোপন অভিযান পরিচালনা, তথ্য সংগ্রহ, এবং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। হিজাব ও কালো চশমার আড়ালে সেই মোসাদের এজেন্ট নারী গুপ্তচররা ইরানের সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু হানিট্র্যাপ নয়, নিজেদের পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ, এমনকী বিয়ে— এসব ব্যবহার করে বহুদিন ধরে ইরানি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে পড়েছে ইজরায়েলের হয়ে কাজ করা ঘরের শত্রু বিভীষণরা। যারা তেহরানের সরকারি নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে ইরানে একের পর এক ভয়ঙ্কর অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত। সেই তালিকায় নাতালি খোদাদাদি, ফারজানে শারাফি থেকে ক্যাথরিন পেরেজ-শাকদাম। এরাই ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী, সামরিক অফিসার ও একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির গতিবিধির খবর পৌঁছে দিয়েছে মোসাদের কাছে। ২০১৮ সালে মোসাদের এক অপারেশনাল রিপোর্টে ‘নওয়া’ নামে এক এজেন্টের ছদ্মনাম প্রকাশ করা হয়। নওয়া ছিলেন সেই দম্পতির একজন, যারা ইরানের পারমাণবিক ঘাঁটিতে ঢোকার পথ খুঁজে পায় এবং গোপন ভিডিও তুলে মোসাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তার কৌশল ছিল একজন এনজিও কর্মী হিসেবে ইরানে ঢোকা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা।
ক্যাথরিন মোসাদের জন্য কী কী তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা এখনও জানা যায়নি। তবে মোসাদ এজেন্টরা ২০১৮ সালে ইরানের পরমাণু ডকুমেন্ট চুরি করে। ২০২০ সালে শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদেকে হত্যা করে। একই সময়ের মধ্যে স্টাক্সনেট ভাইরাস দিয়ে নাতাঞ্জে সাইবার হামলা, হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা, হিজবুল্লা নেতা হাসান নাসরাল্লাকে হত্যা কিংবা একের পর এক পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা— সবই একসূত্রে গাঁথা।
ইরান থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর ক্যাথরিন আত্মপ্রকাশ করেন ‘টাইমস অব ইজরায়েল’-এ। সেখানে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধে বর্ণনা করেন, কীভাবে তিনি ‘দানবের পেটে ঢুকে পড়েন’ অর্থাৎ তেহরানে প্রবেশ করেন। ‘আমি দ্রুত বুঝে গিয়েছিলাম, আমাকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে হবে।’ ইরানকে তুলনা করেন ১৯৩০-এর দশকের নাৎসি জার্মানির সঙ্গে। পেশাগত জীবনে তিনি তাঁর ইহুদি পরিচয় গোপন রেখে স্বামীর পদবি ‘শাকদাম’ ব্যবহার করতেন। এখন তিনি ইজরায়েলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকী এও বলেছেন, তাঁর সন্তান ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দিতে চায়। তবে একথাও স্বীকার করেছেন, তিনি কোনও ইজরায়েলি গুপ্তচর নন, ইরানের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র তৈরির আগে কাজ করেছেন ইজরায়েলি-আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ‘উইকিস্ট্রাট’-এর জন্য।
২০১০ সালে ইজরায়েলে প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘উইকিস্ট্রাট’ মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও এর শীর্ষ পর্যায়ের অফিসাররা মূলত ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন সদস্য। এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সিইও এলাদ শ্যাফারের লিঙ্কডইন প্রোফাইলে লেখা আছে, তিনি ইজরায়েলের এক সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কোনও একটি ডেস্কের প্রধান ছিলেন। শ্যাফার যে লোগো ব্যবহার করেছেন, তা দেখে ধারণা করা যায়, সেই সংস্থাটি সম্ভবত বিখ্যাত ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা, ইউনিট ৮২০০।
আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার কাজ শুধু ছায়া-আবরণ ও গোপন হ্যান্ডশেকেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অনেকাংশেরই এখন কাজ রাজনীতি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) এবং সাংবাদিকতার জগতে নিজেদের অ্যাসেট তৈরি করা। সাংবাদিকদের প্রয়োজন তথ্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তার করার জন্য, জনমতকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। ‘উইকিস্ট্রাট’ কি ক্যাথরিন পেরেজ-শাকদামকে সেই কাজেই নামিয়েছিল? তার উত্তর এখনও মেলেনি। তবে ক্যাথরিনের রহস্যময়
ঘটনা যুদ্ধবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগঠন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এবং প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যমের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: ‘আপনার আশপাশেও গুপ্তচর থাকতে পারে।’