


আগামী শুক্রবার জওহরলাল নেহরুর জন্মদিন। এদিন পালিত হয় শিশু দিবস। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর জীবনের নানা অজানা গল্প শোনালেন মৃণালকান্তি দাস
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর জীবনীশক্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করতেন। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং স্তূপাকৃতি নথির মধ্যেও তাঁর চোখ এড়িয়ে যেত না একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়। আর কোনও ছবি বাঁকাভাবে টাঙানো থাকলে কিংবা জিনিসপত্র অগোছালো থাকলে তিনি বিচলিত বোধ করতেন। ততক্ষণ স্থির হয়ে কোনও কাজ করতে পারতেন না, যতক্ষণ না সেটা কেউ ঠিক করে বা গুছিয়ে দেয়।
সাদা গান্ধী টুপি বড় প্রিয়
নেহরুর নিরাপত্তা অফিসার এবং পরবর্তীকালে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষকর্তা কে এফ রুস্তমজি তাঁর বই ‘আই ওয়াজ নেহরু’স শ্যাডো’-তে লিখেছেন, ‘আমি যখন নেহরুর সঙ্গে কাজ শুরু করি, তখন তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর। কিন্তু মনে হতো যেন ৩৩। তাঁর পরনে থাকত সাদা আচকান ও চুড়িদার পাজামা। তিনি একটা সাদা গান্ধী টুপি পরতেন, যেটা তাঁর কেশহীন মাথা ঢেকে রাখত। অনেক জায়গায় তাঁকে ফুল ও মালা দিয়ে স্বাগত জানানো হতো। গলায় কিছু মালা পরলেও বাকি মালা কিন্তু তিনি হাতে নিতেন। এর কারণ, মালা খোলার সময় তাঁর টুপি যেন না পড়ে যায়। যা তিনি মোটেও পছন্দ
করতেন না।’
জওহরলাল নেহরুর সরকারি বাসভবনে একাধিক পোষ্য ছিল। সেই তালিকায় ছিল কুকুর, এক জোড়া হিমালয়ান পান্ডা, হরিণ, ময়ূর, টিয়া, কাঠবিড়ালির মতো বিভিন্ন প্রাণী। শুধু তাই নয়, এই তালিকায় ছিল তিনটে বাঘের বাচ্চাও। বড় হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য তাদের চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেওয়া হয়। নৈশভোজে প্রায়শই তাঁর বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ না কেউ উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের আপ্যায়ন করতেন জওহরলাল নেহরু।
চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে
বিখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন নিজের আত্মজীবনীতে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে তার সাক্ষাতের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। চার্লি চ্যাপলিন যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, সেই সময় তাঁদের মধ্যে এতই মধুর কথা হয়েছিল যে, পরের দিন নেহরুকে নিজের বাগানবাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেন তিনি। চ্যাপলিনের গাড়িতে তাঁর পাশে বসে ওই বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন নেহরু। সেই গাড়ির পিছু পিছু গিয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিজের গাড়ি। ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব জগৎ এস মেহতা তাঁর বই ‘দ্য ট্রিস্ট বিট্রেড’ এই বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
শিশুদের কাছে চাচা নেহরু
তাঁকে কেউ বলতেন পণ্ডিতজি, কেউ বলতেন নেহরুজি। আবার কেউ ডাকতেন জওহর নামেই। কিন্তু, শুধু দেশের কেন, বিদেশের বাচ্চারাও তাঁকে চিনত চাচা নেহরু নামে। তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন ‘চাচাজি’। সেই কারণেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর জন্মদিনটি অর্থাৎ ১৪ নভেম্বর শিশুদিবস হিসেবে পালন করা হয়। নেহরু শিশুদের ভালোবাসতেন। তিনি মনে করতেন, শিশুরাই আগামী দিনে দেশকে গড়ে তুলবে। তাদের ভিতরের প্রাণশক্তি এবং দেশের প্রতি ভালোবাসাটুকু জাগিয়ে দিতে পারলেই হবে। তারাই আগামী দিনে দেশের অসংখ্য সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে এনে দিতে পারবে আরও অনেক আলোকোজ্জ্বল সকাল। প্রতি শিশুর মুখে তিনি দেখতেন সেই আলো জ্বালানোর একজন দক্ষ কারিগরকে।
সালটা ছিল ১৯৪৯। অক্টোবর। নেহরুর দপ্তরে একটি চিঠি এল সুদূর জাপান থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দগদগে ঘা তখনও মোছেনি। মিত্রশক্তির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, বিশেষত আমেরিকার পরমাণু বোমার হামলায় জাপান উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। জাপানের সঙ্গে তখন বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর অর্থ আমেরিকা সহ ইউরোপীয় দেশগুলির বিষ-নজরে পড়া। সেই অবস্থার মধ্যেও নেহরু চিঠি পেলেন জাপান থেকে। সেখানকার একটি স্কুলের বাচ্চারা তাঁকে চিঠি লিখেছে। জাপানি কচিকাঁচাদের আবদার চাচা নেহরুর কাছে। তাদের একটি হাতি চাই। বাচ্চারা লিখেছে, যুদ্ধের বোমায় টোকিওর উয়েনো চিড়িয়াখানার সব হাতি মরে গিয়েছে। একটাও হাতি নেই সেখানে। হাতি ছাড়া কি চিড়িয়াখানা দেখা সম্পন্ন হয়? জাপানি বাচ্চাদের সেই আবদারে মুগ্ধ নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য একটি হাতি বাছাই করলেন উপহার দেওয়ার জন্য। নেহরু-কন্যা ইন্দিরার নামে হাতিটির নাম। অবশেষে সাগর পেরিয়ে সেই ইন্দিরা রওনা দিল জাপানের রাজধানী টোকিওতে। সেই হাতি শুঁড়ে করে নিয়ে গেল নেহরুর লেখা একটি চিঠিও। তাতে নেহরু লিখেছিলেন, প্রিয় বাচ্চারা, তোমাদের জন্য আমাদের দেশের একটি হাতি পাঠাতে পেরে আমি খুবই খুশি। তোমরা যেমনটি চেয়েছিলে তেমনই করেছি। এটা খুবই ভালো হাতি। তোমরা একে আমার উপহার হিসেবে মনে করো না। একে জাপানের শিশুদের জন্য পাঠানো ভারতের শিশুদের উপহার মনে করবে। ...ভারত ও জাপানের এই শিশুরা যখন বড় হয়ে উঠবে, তখন তারা কেবল তাদের দেশের জন্যই নয়, এশীয় সব দেশগুলিতে শান্তি বজায় রাখার কাজ করবে।’
ভালো মানুষ
একবার শীতকালে ভারতে এসে ট্রেনে সফর করছিলেন ঘানার নেতা কোয়ামে এনক্রুমাহ। হঠাৎই কোনও পূর্ব কর্মসূচি ছাড়াই তাঁকে পৌঁছতে দিল্লি রেলস্টেশনে চলে আসেন নেহরু। একটা ওভারসাইজ ওভারকোট পরেছিলেন তিনি। তিনি কোয়ামে এনক্রুমাকে বলেছিলেন, ‘এই কোটটা আমার গায়ে বড় তবে আপনার পুরোপুরি ফিট হবে। এটা আপনি পরে নিন।’ কোয়ামে এনক্রুমাহ তৎক্ষণাৎ সেই কোট পরেন। কোটের মাপ তাঁরই মতো ছিল। ট্রেন চলতে শুরু করলে সেই কোটের পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে অবাক হয়ে যান কোয়ামে এনক্রুমাহ। কোটের পকেটে তাঁর জন্য মাফলার ও একজোড়া দস্তানা রেখে দিয়েছিলেন নেহরু। তবে তাঁর এই সৌজন্যবোধ যে শুধুমাত্র গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য ছিল, এমনটা নয়। একবার শ্রীনগরে পৌঁছনোর পর জানা যায়, তাঁর স্টেনোগ্রাফারের স্যুটকেস এসে পৌঁছয়নি। একটা সুতির শার্ট পরেছিলেন স্টেনোগ্রাফার, যা শ্রীনগরের ঠান্ডার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিষয়টা নজরে আসতেই তৎক্ষণাৎ তাঁর জন্য গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করেন নেহরু নিজেই।
স্বাধীনতার পর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো জওহরলাল নেহরুর সব মুসলিম পরিচারকদের বদলি করার পরামর্শ দেয়, বিশেষত রান্নাঘরে যাঁরা কর্মরত ছিলেন। আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাঁর খাবারে বিষ মেশানো হতে পারে। কারণ, তাঁর মুসলিম কর্মচারীদের অনেক আত্মীয়ই পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক এম জে আকবর লিখেছেন, ‘যখন এই প্রস্তাব নেহরুর কাছে যায়, তখন তিনি তা সরাসরি খারিজ করে দেন। যাঁরা নেহরুর জন্য কাজ করতেন, তাঁরা একপ্রকার তাঁকে পুজো করতেন। তবে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বলে নয়, তিনি ভালো মানুষ সেই কারণে।’
পণ্ডিতজি সর্বত্রই বেস্টসেলার
তাঁর দর্জিদের মধ্যে মহম্মদ ওমর নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। দিল্লিতে তাঁর দুটো দোকান ছিল, একটা পুরনো দিল্লিতে এবং অন্যটা নয়াদিল্লিতে। দাঙ্গার সময় নয়াদিল্লিতে তাঁর দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই দোকান পুনর্নির্মাণে মহম্মদ ওমরকে অনেক সাহায্য করেছিলেন নেহরু। মহম্মদ ওমর নিজের দোকানে লিখে রেখেছিলেন ‘প্রধানমন্ত্রীর দর্জি’। তাঁর ছেলে পাকিস্তানে চলে গেলে করাচিতে তাঁর দোকানেও তিনি লিখিয়েছিলেন ‘প্রধানমন্ত্রীর দর্জি’। নেহরুর ব্যক্তিগত সহকারী এম ও মাথাই তাঁর বই ‘মাই ডেজ উইথ নেহরু’-তে লিখেছেন, ‘আমি একবার ওমরকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, করাচিতে নেহরুর নামের জন্য ছেলের কোনও উপকার হয়েছে? এর উত্তরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, পণ্ডিতজি সর্বত্রই বেস্টসেলার।’ জওহরলাল নেহরুর দর্জি হওয়ায় সৌদি আরবের বাদশাসহ অনেক বিদেশি অতিথির জন্য কাপড় সেলাই করার সুযোগও পেয়েছিলেন মহম্মদ ওমর।
নেহরু যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেন, তখন তাঁকে ১৭ ইয়র্ক রোডে চার বেডরুমের একটা বাংলো দেওয়া হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই বাংলোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়, কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য তেমন জায়গা ছিল না সেখানে। তাই তার বাংলোর সামনে তাঁবু খাটিয়ে কাজ শুরু করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। লর্ড মাউন্টব্যাটেন চেয়েছিলেন নিরাপত্তার কারণে নেহরুর বাসস্থান তিন মূর্তি ভবনে স্থানান্তরিত হয়ে যাক। কিন্তু তিনি রাজি হননি। নেহরুকে রাজি করাতে স্বয়ং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁর কাছে যান। এম ও মাথাই তাঁর ‘রেমিনিসেন্সেস অব নেহরু’স এজ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেল নেহরুকে বলেছিলেন, গান্ধীকে বাঁচাতে না পারার জন্য তিনি অপরাধবোধে ভুগছেন।’ সর্দার প্যাটেল তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি আর আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারি না। তাই আপনি বরং তিন মূর্তি ভবনে থাকুন, যেখানে আপনি আরও বেশি সুরক্ষিত থাকতে পারবেন।’ মাথাই লিখেছেন, ‘প্যাটেল আমাকে ডেকে বলেছিলেন, জওহরলাল আমার প্রস্তাব শুনে চুপ করেছিলেন। তাঁর এই নীরবতাকে আমাদের অনুমোদন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আপনি মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে দেখা করে নেহরুর বাসস্থান বদলির ব্যবস্থা করুন।’ নেহরুকে না জানিয়েই ক্যাবিনেট সেক্রেটারির কাছে এই মর্মে একটা নোট পাঠান মাউন্টব্যাটেন। নেহরু ইতস্তত করে নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত হন। তবে এই বদলের পর তাঁকে দেওয়া ৫০০ টাকার আতিথেয়তা ভাতা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
অর্থের অপচয় অপছন্দ করতেন
তাঁর ক্যাবিনেট মন্ত্রী গোপালস্বামী আয়েঙ্গার তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ব্রিটেনের মতো ভারতেও প্রধানমন্ত্রীর বেতন একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর বেতনের দ্বিগুণ হওয়া উচিত। কিন্তু এই পরামর্শ মানতে রাজি হননি জওহরলাল নেহরু। প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের বেতন মাসিক তিন হাজার টাকা রাখা হয়েছিল। নেহরু এবং তাঁর মন্ত্রীরা নিজেরাই নিজেদের বেতন কমিয়ে প্রথমে প্রতি মাসে ২,২৫০ টাকা এবং তারপরে প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা করে দেন। অর্থের অপচয় অপছন্দ করতেন তিনি। রুস্তমজি লিখেছেন, ‘একবার ডিব্রুগড় ভ্রমণের সময় আমি তাঁর ঘরে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলাম, নেহরুর সহকারী হরি তাঁর ছেঁড়া মোজা সেলাই করছেন। নেহরু মাঝে মাঝেই গাড়ি থামিয়ে চালককে খোলা জলের কল বন্ধ করতে বলতেন। একবার সৌদির রাজধানী রিয়াধে গিয়ে দেখি তিনি নিজের হাতে তাঁর রুমের আশপাশের আলো নিভিয়ে দিচ্ছেন।’ এমনটাই ছিলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।