


ঘটনা ১
দিন চারেক হল নামী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তমোঘ্ন সেন। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া সেভাবে মিলছে না। এদিকে বিলও বাড়ছে চড়চড়িয়ে। বাড়ির লোকজন ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইলে হাসপাতাল রিস্ক -এর জুজু দেখাচ্ছে। শেষ অবধি ভেন্টিলেশনে থেকে মৃত্যু হয়েছিল রোগীর। নানা তথ্য প্রমাণ সহ পরিজনদের দাবি, মৃত মানুষকেই গোটা একদিন ভেন্টিলেশনে রেখে দিয়েছে হাসপাতাল! উঠে আসছে পরিষেবায় গাফিলতি ও মিথ্যাচারের অভিযোগ।
ঘটনা ২
সম্পূর্ণ এক ভুল বোঝাবুঝি থেকে হাসপাতালে ঘেরাও হয়ে রয়েছেন কয়েকজন চিকিৎসক। মৃতপ্রায় রোগীই এসেছিলেন হাসপাতালে। তিনি মারা যেতেই রোগীর পরিজনরা মারমুখী। বাইরের লোকজন নিয়ে হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছেন। উন্মত্ত জনতার হাতে ভাঙচুর চলেছে হাসপাতালে। অন্যান্য রোগীর সবরকমের পরিষেবাও প্রশ্নের মুখে!
ঘটনা ৩
চোখের সামনেই দুর্ঘটনা ঘটল। ব্যস্ত সময় শহরতলির রাস্তায় গাড়ি ঘোড়ার অভাব নেই। তবু দুর্ঘটনাগ্রস্তকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে রাজি হচ্ছে না কোনও গাড়ি। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে হাসপাতালে গিয়ে জটিল সমস্যায় জড়িয়ে পড়ার জন্য।
উপরের এই তিন ঘটনা আমাদের কারও অচেনা নয়। হয়, নিজেদের সঙ্গেই ঘটেছে, নয়তো জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অন্যের জীবনের এমন ঘটনা জেনেছেন, শুনেছেন, কাগজে পড়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অসহায়ের মতো যা পরিষেবা মিলেছে যা নিতেই বাধ্য থেকেছেন রোগীর দল। আবার রোগীদের রাগের সামনে অসহায়ের মতো মার খেয়েছেন চিকিৎসক, এ ঘটনাও বিরল নয়। যদিও এই সবক’টি ঘটনা নিয়েই নির্দিষ্ট আইন ও বিধিব্যবস্থার প্রণয়নের নিয়ম আছে।
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল আইন
১৯৯৫ সালে ভি.পি শান্তা বনাম মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার একটি মামলার উপর ভিত্তি করে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বিচারপতির বেঞ্চ কিছু নির্দেশ ও গাইডলাইন প্রদান করেন। সেই গাইডলাইন মেনেই হাসপাতালের পরিষেবা উন্নত করতে বেশ কিছু কাউন্সিল তৈরি করা হয়। সেগুলিই মূলত হাসপাতালের আইন সুরক্ষিত রাখে। ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিল তৈরি করে হাসপাতালের গ্রাহক পরিষেবা উন্নত করার কথা ভাবা হয়েছে। পরিষেবা পেতে সমস্যা হলে বা অসুবিধা হলে রোগীর দায়ের কথা অভিযোগের উপর তদন্ত ও তার শাস্তি নিরূপণও করে এই কাউন্সিল। এছাড়া আছে ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিক্স অ্যাক্ট এবং হিউম্যান অর্গানস অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন অ্যাক্ট, মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাক্ট। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলির মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল অ্যাক্ট, ফার্মেসি অ্যাক্ট।
এবার নজর দেওয়া যাক কিছু বাস্তব সমস্যায়। রোগীর দিক থেকেও সমস্যার সম্মুখীন হয় হাসপাতাল, আবার হাসপাতালের কাছ থেকেও পরিষেবা ঠিক করে পায় না রোগী। কী ঘটলে কী করবেন? আইন কী বলছে? জানালেন আইনজীবী অনির্বাণ গুহঠাকুরতা।
দুর্ঘটনার কবলে পড়া বা অসুস্থ অচেনা রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুসারে হাসপাতালে অচেনা দুর্ঘটনাগ্রস্ত কাউকে কেউ নিয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনও পুলিসি ঝামেলায় না ফেলে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে বাধ্য। প্রয়োজনে ভর্তিও করতে হতে পারে বাড়ির লোকের অনুপস্থিতিতেই, যিনি নিয়ে গিয়েছেন, তাঁর ‘কনসেন্ট’ নিয়ে। এক্ষেত্রে তাঁর কনসেন্ট-ই যথেষ্ট। এরপর বাড়ির লোকজনকে জানানো, পুলিসের দায়িত্বপালন এই প্রসঙ্গ আসবে। তবে পুলিসের কাছেও নির্দেশ আছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত অচেনা ব্যক্তিকে কেউ হাসপাতালে ভর্তি করলে তাঁকে ‘নাকাল’ করা যাবে না।
মৃতদেহ আটকে রাখা
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর পরিজনরা বিল শোধ করতে পারেনি বলে হাসপাতাল রোগীর দেহ ছাড়তে চাইছেন না। এই অবস্থায় আইন অনুসারে, হাসপাতাল রোগীর দেহ ছাড়তে বাধ্য। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মৃতদেহ আটকে রাখার কোনও অধিকার হাসপাতালের নেই। টাকা শোধ না হলেও রোগীর দেহ ছাড়তে তারা বাধ্য। টাকা শোধ করার জন্য রোগীর পরিজনদের উপর মানি রিকভারি মামলা করতে
পারে হাসপাতাল। প্রয়োজনে ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিল-এর মধ্যস্থতা করে রোগী ও হাসপাতাল দু’পক্ষের সঙ্গে বসে বিল নিয়ে সমাধান সুরাহার জায়গায় আসবেন। তা করতে অক্ষম হলে হাসপাতাল মামলা করবে রোগীর পরিজনদের বিরুদ্ধে। রোগীও ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিল-ও বাড়তি বিলের অভিযোগ এনে মামলা করতে পারেন। সে পথও খোলা রয়েছে। কিন্তু মৃতদেহ আটকানো সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুয়াযী, রোগীর দেহ অন্যায়ভাবে আটকে রাখা ১২৭ ধারার আওতায় রয়েছে। এই ধারায় কোনও ব্যক্তিকে আটকে রাখা, নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করতে বাধা দেওয়া, অথবা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে তাদের চলাচল সীমিত করার কাজকে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং শাস্তি দেওয়া হয়। এর ফলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং/অথবা জরিমানা হতে পারে।
হাসপাতালে গিয়ে পরিষেবা
পাচ্ছি না
পরিষেবা না পাওয়ার নানা ধরন হয়। কেউ চিকিৎসায় গাফিলতির সম্মুখীন হতে পারেন। কারও আবার ওষুধ সংক্রান্ত সমস্যা হতে পারে। কেউ আবার অস্ত্রোপচারের পর বাড়ি ফিরে এসে বুঝতে পারেন, হাসপাতালের তরফে কোথাও কোনও ভুল থেকে গিয়েছে। এই সব ক্ষেত্রেই হাসপাতলের নোডাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বা ইমেল মারফত অভিযোগ জানাতে পারেন।
ইমেল করতে পারেন ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিল-এ। ডাক্তার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে এখানে মামলা করা যায়। বিনা অর্থে সরকারি আইনজীবীর সুবিধা নিয়ে কিংবা অভিযোগকারী নিজেও এই মামলায় নিজের আইনজীবী হয়ে লড়তে পারেন। খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান করার জন্যও নির্দেশ রয়েছে। প্রতিদিন বহু অভিযোগ এখানে জমা পড়ে। হাসপাতাল আইন ঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সাময়িক অশান্তি মেটাতে মধ্যস্থতা করা যায় কি না, এগুলো দেখবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তবে তাদের কাজও খতিয়ে দেখবে এই কাউন্সিল।
অস্ত্রোপচারের পর ভুল
কিছু সময় দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের পর বাড়ি ফিরে কোনও রোগীর নতুন করে সমস্যা তৈরি হল ও দেখা গেল, আগের হাসপাতালের বড় কোনও খামতি রয়ে গিয়েছে। পেটের ভিতর হয়তো সার্জারির গজ, তুলো বা কোনও ছোট যন্ত্র রয়ে গিয়েছে যা থেকে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এমন হলে দ্রুত ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৫ ধারায় মামলা রুজু করা যাবে।
হাসপাতালের পক্ষে আইন
শুধু রোগীর ক্ষেত্রেই নয়, হাসপাতালের পক্ষেও বেশ কিছু কড়া আইন রয়েছে। রোগীর পরিজন এসে হাসপাতালে ভাঙচুর করলে ৩২৪ (৪) ধারায় মামলা রুজু করতে পারে হাসপাতাল। কোনও চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত কাউকে বড় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে বড় ধরনের ক্ষতি করলে ১১৮ ধারায় মামলা হতে পারে। অল্প শারীরিক ক্ষতি হলে ১১৮/১-এ মামলা হতে পারে। ‘অ্যাটেম্পট টু মার্ডার’ অভিযোগ এলে ১০৯ ধারায় মামলা হতে পারে। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রটিতেও ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টস কাউন্সিল, মেডিক্যাল কাউন্সিল দায়ী থাকবে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়