Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এ কেমন পাহারাদার?

‘পাকিস্তানি জঙ্গিরা পহেলগাঁওয়ে বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে।’ জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে চলছে এমনই প্রচার। বলা ভালো, পরিকল্পিতভাবে এই প্রচার চালানো হচ্ছে। জল্লাদের দল কাশ্মীরে যাওয়া ২৬ জন পর্যটককে তাঁদের পরিচয় যাচাই করে খুন করেছে।

এ কেমন পাহারাদার?
  • ২৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ‘পাকিস্তানি জঙ্গিরা পহেলগাঁওয়ে বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে।’ জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে চলছে এমনই প্রচার। বলা ভালো, পরিকল্পিতভাবে এই প্রচার চালানো হচ্ছে। জল্লাদের দল কাশ্মীরে যাওয়া ২৬ জন পর্যটককে তাঁদের পরিচয় যাচাই করে খুন করেছে। একজন বাদে সকলেই হিন্দু। আর মুসলিম হয়েও যিনি খুন হয়েছেন তিনি হিন্দুদেরই বাঁচাতে গিয়েছিলেন। তাই হিন্দুরাই যে আক্রমণের লক্ষ্য ছিল, তাতে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু রাজনীতির যেসব কারবারি এই ঘটনায় জঙ্গিদের চেয়েও মুসলিমদের বেশি আক্রমণ করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ফায়দা লোটা। তবে, আরও একটি নির্ভুল তথ্য হল, স্বঘোষিত চৌকিদার এবং ‘হিন্দুদের রক্ষাকর্তা’র রাজত্বেই ‘টার্গেট কিলিং’ এর শিকার হচ্ছেন হিন্দুরা। তাঁর আমলেই বারেবারে ঘটছে জঙ্গি হানার ঘটনা। তাতে নগ্ন হয়ে পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কঙ্কালসার চেহারা। তাই উঠছে প্রশ্ন, এ কেমন পাহারাদার?

Advertisement

কাশ্মীরে জঙ্গি হানার প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি জঙ্গিরা শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটকদেরই নয়, খুন করেছে নেপালের দু’জনকেও। জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ভারতবর্ষকে উত্ত্যক্ত করা। উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটানো। সেই লক্ষ্যেই তারা নানান চক্রান্ত করে। কখনও অর্থনীতিতে আঘাত হানতে ব্যাপকহারে জালনোট ঢুকিয়ে দেয়। কখনও সেনাবাহিনীর উপর আঘাত হেনে নিরাপত্তার ঘাটতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কখনওবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছে, পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানার পিছনে রয়েছে ভারতের সুস্থিতি বিনষ্ট করার চক্রান্ত। এর আগেও কাশ্মীরে জঙ্গি হানার ঘটনা ঘটেছে। জঙ্গিরা কখনও রিমোট কন্ট্রোলে ল্যান্ডমাইন ব্লাস্ট করিয়ে, কখনও অতর্কিতে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে সাধারণ মানুষকে খুন 
করে চোরের মতো লুকিয়ে পড়েছে। কিন্তু এবার 
যা ঘটল তা অতীতে কোনও দিন হয়নি। জঙ্গিরা 
কাঁধে আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলিয়ে বুক ফুলিয়ে পহেলগাঁওয়ে ঢুকেছে। পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পরিচয় যাচাই করে হিন্দুদের বেছে বেছে মেরেছে। তারপর বিনা বাধায় চলে গিয়েছে। এমনভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে যাতে সকলের মনে হয়েছে, হিন্দুদের খুন করার লাইসেন্স ঩নিয়েই তারা পাকিস্তান থেকে পহেলগাঁওয়ে ঢুকেছে।
পাকিস্তানি জঙ্গিরা ২৬ জনকে খুন করে পালায়নি। উল্টে মৃতের স্ত্রীদের বলেছে, ‘তোরা মোদিকে গিয়ে বল।’ এটা শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে ভাবলে ভুল হবে। তারা হিন্দু-মুসলিমের দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করতে চেয়েছে। পাকিস্তান জানে, ভারতের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে তারা এঁটে উঠতে পারবে না। অতীতে বারবার তার প্রমাণ মিলেছে। তাই পাকিস্তানি জঙ্গিরা এমন কৌশল নিয়েছে যাতে ভারতে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়। তাতে শুধু ভারতের উন্নয়ন ব্যাহত হবে না, জঙ্গিদের আশ্রয় পেতেও সুবিধে হবে।
দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, জঙ্গিদের ফাঁদে রাজনৈতিক ক্ষুদ্র স্বার্থে অনেকেই পা দিচ্ছেন। তাঁরা জঙ্গিদের ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখাচ্ছেন। বোঝাতে চাইছেন, মুসলিমরাই জঙ্গি হয়। কিন্তু পহেলগাঁওয়ে হিন্দুদের বাঁচানোর জন্য যিনি বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন তিনি একজন মুসলিম। সইদ আদিল হুসেন শাহ। হিন্দুদের বাঁচানোর জন্য জঙ্গিদের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরিণতি ভয়াবহ হবে জেনেও তিনি চুপ থাকতে পারেননি। জীবন দিয়ে সইদ বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি মানুষ। তিনি কোনও ধর্মের নন। তাঁর ধর্ম মানবতা। একইভাবে কাশ্মীরের উধমপুরের জঙ্গলে দেশের সুরক্ষার জন্য জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলার ঝণ্টু আলি শেখ। মনে রাখতে হবে, তাঁরও ধর্ম ইসলাম।
তাই কোনও ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, লড়াই জারি থাক স্রেফ জঙ্গির বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেকেই জঙ্গিদের চেয়েও বেশি আক্রমণ করছেন তাদের ধর্মকে। বিশেষ করে বাংলায়। হয়তো ভোট রাজনীতিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশাতেই সেটা করা হচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে পহেলগাঁও ও সামশেরগঞ্জকে এক সারিতে বসাতে চাইছেন। কিন্তু তাতে কি কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা চাপা পড়বে, নাকি দেশে অস্থিরতার পথ প্রশস্ত হবে? 
পহেলগাঁওয়ে হামলার প্রতিবাদে গোটা দেশের সঙ্গে শামিল হয়েছে কাশ্মীরও। এই প্রথম জঙ্গি হানার নিন্দা করে কাশ্মীরজুড়ে বন্ধ পালিত হয়েছে। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ মোমবাতি হাতে পথে নেমেছে। কারণ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ জঙ্গিদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চায় না। তারা বুঝেছে, পর্যটক না গেলে তাদের না খেয়ে মরতে হবে। তাই সবাই পাকিস্তানি চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রতিবাদের এই সুরটা বজায় রাখতে পারলেই ব্যর্থ হবে জঙ্গিদের চক্রান্ত।
বহিরাগত আক্রমণ ঠেকানোর জন্য দেশের কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ খরচ করা হয়। নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্যই আছে গোয়েন্দা, কেন্দ্রীয় বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী সহ আরও অনেক কিছু। কেনা হয় হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র। তবে, এই সমস্ত অর্থ এবং প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যখন সফল হয় জঙ্গিরা। আর তখনই বিপুল টাকা খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 
একথা ঠিক যে নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রচেষ্টাতেই প্রায় আড়াই দশক পর কাশ্মীরে শান্তি ফিরেছিল। একটা সময় কাশ্মীর উপত্যকায় বয়ে যেত রক্তের স্রোত। জঙ্গি হানায় ক্ষতবিক্ষত ভূস্বর্গ হয়ে উঠেছিল মৃত্যুপুরী। পর্যটকদের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ চলে গিয়েছিল কাশ্মীরের নাম। সেই কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে ছিলেন মোদি। ৩৭০ ধারার বিলোপ ঘটিয়ে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। শান্তি ফেরায় হু-হু করে বাড়ছিল পর্যটক। ভিড় যখন রেকর্ডের পথে পা বাড়াচ্ছিল ঠিক তখনই পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিহানা। নরেন্দ্র মোদির সরকারকে দাঁড় করিয়ে দিল কাঠগড়ায়। মোদিজি সঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছিলেন, কিন্তু প্রত্যাঘাতের বিষয়টি মাথায় রাখলে হয়তো এই দিনটা দেখতে হতো না।
এপ্রিল মাসে পহেলগাঁওয়ে পর্যটকের ভিড় নতুন কিছু নয়। বৈসরণ ভ্যালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ। লোকে বলে, মিনি সুইজারল্যান্ড। সেই টানে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক এই সময়টায় সেখানে যান। জায়গাটা একেবারে পাকিস্তান লাগোয়া না হলেও সীমান্ত এলাকা। এমন একটা স্পর্শকাতর এলাকায় ঘটনার সময় কোনও কেন্দ্রীয় বাহিনী বা পুলিস ছিল না। গোয়েন্দারা যে ব্যর্থ, তাতে কারও সংশয় নেই। কিন্তু, হঠাৎ করে কেন বৈসরণ ভ্যালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী উধাও 
হয়ে গেল? এটা কি কাকতালীয়, নাকি পিছনে 
আছে অন্য কোনও রহস্য! এই সময়ে এমন একটা প্রশ্ন না উঠলেই ভালো হতো। কিন্তু উঠছে। কারণ ঘটনাস্থলে তো বটেই, আশপাশেও ছিল না কেন্দ্রীয় বাহিনী। বাংলায় অনুপ্রবেশের দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই চাপিয়ে দেয় বিজেপি। কিন্তু পহেলগাঁওয়ের দায় কার? 
পুলওয়ামার ঘটনার পর জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিকের মন্তব্যে চরম অস্বস্তিতে পড়েছিল নরেন্দ্র মোদির সরকার। সমগ্র দেশবাসী চায়, পহেলগাঁও নিয়ে ভবিষ্যতে যেন কোনও সংশয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি না হয়। এই ঘটনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে যেন কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে কেউ দাঁড় করাতে না পারে।
পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় ক্ষোভে ফুটছে গোটা দেশ। সকলের একটাই দাবি, কড়া জবাব দিতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, এই জঘন্য কাজ যারা করেছে, তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে। রাষ্ট্রনায়কদের এমন আশ্বাসে দেশের যে কোনও নাগরিকের আশ্বস্ত হওয়ারই কথা। আমরাও হচ্ছি। কিন্তু সংশয় কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। জঙ্গিদের কফিনে শেষপেরেক পোঁতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে করা হয়েছিল নোটবন্দি। পুলওয়ামায় জঙ্গি হানার পরেও মিলেছিল এমনই গালভরা আশ্বাস। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা প্রচার করা হয়েছিল ফলাও করে।  কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সে সবই ছিল কথার কথা। 
নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ‘চৌকিদার’ পরিচয় দিয়ে দেশবাসীকে সুরক্ষার আশ্বাস দেন। কিন্তু তাঁরই আমলে ঘটেছে উরি, পাঠানকোট, অমরনাথ, পুলওয়ামার মতো একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা। মারা গিয়েছে অসংখ্য মানুষ। তাই প্রশ্ন উঠছে, এ কেমন চৌকিদার? 
ছোটবেলা থেকে একটা কবিতা শুনে বড় হয়েছি আমরা, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’দেশের সঙ্কটকালে দিতে হবে কাজে বড় হওয়ার সেই প্রমাণ। তাই আর কথা নয়, এবার চাই কাজ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ