Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এসআইআর-এর আসল লক্ষ্য কী?

এগারো বছরে এত কিছু বিপ্লব করলেন, অথচ ১৪০ কোটি মানুষকে একটি স্থায়ী নাগরিকত্ব কার্ড ইশ্যু করতে পারলেন না কেন? কারণ কী? স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকার নাকি অপদার্থ, একমাত্র আপনার সরকারই আচ্ছে দিনের ভগীরথ! তাহলে ভারতবাসীর জন্য একটি দেশবাসী হিসেবে স্থায়ী পরিচয়পত্র দিতে পারলেন না?

এসআইআর-এর আসল লক্ষ্য কী?
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: এগারো বছরে এত কিছু বিপ্লব করলেন, অথচ ১৪০ কোটি মানুষকে একটি স্থায়ী নাগরিকত্ব কার্ড ইশ্যু করতে পারলেন না কেন? কারণ কী? স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকার নাকি অপদার্থ, একমাত্র আপনার সরকারই আচ্ছে দিনের ভগীরথ! তাহলে ভারতবাসীর জন্য একটি দেশবাসী হিসেবে স্থায়ী পরিচয়পত্র দিতে পারলেন না? যেটিকে আমরা বলতে পারব সিটিজেনশিপ কার্ড! মাঝেমধ্যেই এই যে অনুপ্রবেশ অনুপ্রবেশ খেলা করেন, সেটার তো দরকার হতো না! 

Advertisement

আপনারা কি অবসর সময়ে দেশবাসীর সঙ্গে নাগরিকত্ব নিয়ে ইনডোর আউডোর গেম খেলছেন নাকি?  আপনাদের নির্বাচন কমিশন বলছে আধার কার্ড তো নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়! ওটা তো পরিচয়পত্র! এই কথাটির মানে কী? একটি পরিচয়পত্রে কী থাকে? নাম, ঠিকানা, ছবি। আধার কার্ডে আমার ছবি, অন্য কারও নাম এবং আমেরিকার ঠিকানা থাকবে নাকি? আধার কার্ড যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তাহলে কি আপনাদের মতে গ্রিনল্যান্ডের মানুষও ভারতের আধার কার্ড পাবে ইচ্ছে করলে? ভারতবাসী ছাড়া আর কেউ ভারতের আধার কার্ড পেতে পারে? যদি না হয়, তাহলে আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় কেন? 
নাগরিকত্বের প্রমাণ তাহলে কোনটা? প্যান কার্ড ব্যাপারটা কী? ভোটার কার্ড বস্তুটা কী? আপনাদের কাছে এতদিন ধরে শুনে এলাম প্যান কার্ড, আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ড, এই তিনটি নাকি মোক্ষম প্রমাণ সবকিছুর। তাই লিংক করা লিংক করা খেলায় নামিয়ে দিলেন দেশবাসীকে কাজকর্ম ফেলে।  অর্থাৎ এই কার্ডের সঙ্গে ওই কার্ড লিংক করো। ওই কার্ডের সঙ্গে ওই কার্ড লিংক করো। আর লিংক করতে দেরি হলে, ১ হাজার টাকা করে আদায় করো। কোনটা নিশ্চিত নাগরিকত্ব কার্ড? পাসপোর্ট? ক’জনের আছে? রেশন কার্ড? তাও নয়, তাই তো? তাহলে কোনটা? 
এই যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর চালু করছেন, এটাকে দেখতে কেমন যেন এনআরসি এনআরসি লাগছে না!  অসমে এনআরসির কাট অফ ডেট ছিল ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ। আর এই এসআইআরে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা। আমরা লক্ষ্য করেছি তো যে, আপনারা ১১ টি প্রমাণপত্রের যে তালিকা দিয়েছেন ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য, সেইসব ডকুমেন্টের ভিড়ে মিষ্টি একটি ডকুমেন্ট লুকিয়ে আছে। এনআরসি। এর মানে কী? 
ভারতের ১২টি রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে। এই ১২ টি রা঩জ্যের কোথায় এনআরসি হয়েছে? কোথাও না। গোটা ভারতে অসমে একমাত্র হয়েছে। সেই অসমের নাগরিকদের একমাত্র এনআরসি আছে। অথচ তাদের এসআইআর হচ্ছে না। গোটা ভারতে আর কোথাও এনআরসি হয়নি। এদিকে আপনারা ১১ টি প্রধান নথির অন্যতম এনআরসি রেখেছেন! এর গোপন অর্থটা ঠিক কী? একটু বুঝিয়ে বলবেন? আপনাদের লক্ষ্যটা কী? 
নাগরিকত্ব কার্ড দিয়ে সাধারণ ভারতবাসীর সব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলুন না। সেটা তো এমন কিছু রকেট সায়েন্স না। কেন? কারণ, ভারতের সিটিজেনশিপ আইনের নিয়ম জলের মতো স্পষ্ট। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের ম঩ধ্যে যাদের ভারতে জন্ম হয়েছে, তারাই ভারতীয় নাগরিক। সোজা প্রমাণ। ১ জুলাই ১৯৮৭ থেকে ২ ডিসেম্বর ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় যাদের জন্ম, তাদের পিতামাতার মধ্যে যে কোনও অন্তত একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। অর্থাৎ ওই আগের নিয়মে। ২০০৪ সালের পর যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের পিতামাতাকে অথবা যে কোনও একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। কিন্তু তাদের কেউ বেআইনিভাবে অন্য দেশ থেকে ভারতে আসেনি এরকম হতে হবে। 
ঠিক এই কারণেই এই যে এসআইআর হচ্ছে, এখানে প্রধান শর্ত হল ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে সময়সীমায় ভারতীয় ভোটার তালিকায় যাদের নাম আছে, তাদের নাম নতুন ভোটার তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কোনও কাগজপত্র দেখাতেই হবে না। এমনকী ওই সময়সীমার ভোটার তালিকায় কারও নিজের নাম না থাকলেও চলবে, যদি পিতামাতার নাম থাকে, তাহলেও সে বৈধ ভোটার। যখন বাড়িতে বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)আসবেন, তখন একটি ইনিউমারেশন ফর্মা দেবেন সকলের নামে নামে। তিনি দেখবেন এই বাড়িতে কাদের কাদের নাম অথবা পিতামাতার নাম ২০০২-২০০৪ সময়সীমার ভোটার তালিকায় আছে। থাকলে সমস্যাই নেই। 
আর যদি না থাকে? এখান থেকে শুরু হচ্ছে আসল সমস্যা। তার ইনিউমারেশন ফর্মে স্বাক্ষর করানো হবে না। জমাও নেওয়া হবে না। বাড়িতে নোটিশ আসবে। এবং ইলেকশন রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ইআরও) কাছে শুনানি হবে। সেখানে প্রশ্ন করা হবে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আপনার নাম নেই কেন? আপনার পিতামাতার নামও নেই কেন? 
এবার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০০২ সালে আপনি অথবা আপনার পিতামাতা ও পরিবার কোথায় ছিলেন? যেখানে ছিলেন তার প্রমাণপত্র হিসেবে কী কাগজপত্র আছে? পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় সবথেকে বেশি যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছে। সে হিন্দুই হোক, মুসলমানই হোক। এবার তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কোথায় ছিল। কেন ভোটার তালিকায় নাম নেই। 
সুতরাং মোদ্দা ব্যাপার হল, বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতে বসবাস করাদের মধ্যে দুটি শ্রেণি হয়ে যাচ্ছে এখন থেকে। একদল যারা ২০০২ সালের আগে এসেছে এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম আছে। আর অন্য একটি অংশ হল, যারা ২০০২ সালের পরে এসেছে ভারতে। সুতরাং তারপর যতই তারা সমস্ত কার্ড বানিয়ে নিক, বাড়ি তৈরি করে নিক, ফ্ল্যাট কিনে নিক, স্কুলকলেজে পড়ে পাশ করে যাক, আসল কথা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই। এবং প্রমাণও নেই সেই সময় ভারতের অন্যত্র কোথাও থাকার। একমাত্র প্রকৃত ভারতবাসীদের এসআইআরে কোনও সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। যদি প্রকৃত ভারতবাসীকেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়াস শুরু হয়, তখনই স্পষ্ট হবে যে নিছক স্বচ্ছ ভোটার তালিকা নির্মাণ একমাত্র লক্ষ্য নয়। আরও কোনও গোপন উদ্দেশ্য আছে। 
এবার আসল প্রশ্ন। ধরা যাক, ২০০২ সালের তালিকায় কারও নাম নেই। তার পিতামাতার নামও নেই। এমনকী সে সন্তোষজনক প্রমাণ দিতে পারছে না যে, সত্যিই যে ভারতবাসীর নাগরিক কি না কিংবা ২০০২ সালে সে ভারতে অথবা বিদেশে কোথাও ছিল কি না তারও মোক্ষম প্রমাণ নেই। তখন কী হবে? এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না সে তো বোঝাই গেল। কিন্তু সেই ব্যক্তির নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস তাহলে কী হবে? পরবর্তী পদক্ষেপই বা কী?
সুতরাং বেআইনিভাবে বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমদেরই একমাত্র মহাসংকট হতে চলেছে, এমন নয়। বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের মধ্যেও প্রবল অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। একটি সম্ভাবনা রয়েছে যে, হিন্দুদের কোনওরকম সমস্যার কারণ হবে না। কারণ তাদের রক্ষাকবচ আছে সিএএ। আবেদন করলেই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।
কিন্তু এতদিনের স্থায়ী নাগরিকত্ব থেকে তাদের যদি আবার নতুন করে নাগরিকত্বের আবেদন করতে হয়, সেটা স্বীকার করে নেওয়া যে, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছিলাম বেআইনিভাবে। সেটা কেউ কি চাইবে? এমনকি ওই স্বীকারোক্তির ঝুঁকিও থেকে যায় সরকারিভাবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া। পরবর্তী প্রশ্ন হল, সরকারের প্ল্যান কী? এভাবে যদি বহু নাম বাদ যায়, তারপর তাদের নিয়ে কী করা হবে? 
আর এসব তো বোঝা গেল না হয় অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করা, ডুপ্লিকেট ভোটার বাদ দেওয়া, ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া ইত্যাদি। এসব করাই উচিত। কিন্তু অনুরোধ একটাই। প্রকৃত ভারতবাসীদের জন্য এবার একটা সম্মানের জীবন দিন না! 
গত ১০ বছরে ভারতবাসী কত টাকা ট্যাক্স দিয়েছে জানেন নিশ্চয়ই? ১০৬ লক্ষ কোটি টাকা। এই যে ১০ বছরের মধ্যে পাবলিকের থেকে এই বিপুল টাকা আদায় করে নিলেন, অথচ তাদের একটা স্থায়ী নাগরিকত্ব কার্ড দিতে পারছেন না? আমরা একটু গৌরব করে পকেটে ভারতের সিটিজেনশিপ কার্ড রাখতে পারব! আপনাদের কাজও তো সহজ হয়ে যাবে! সেটুকুও পারছেন না! এর থেকে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
১৯৯৩ সালে ভোটার কার্ড দেশজুড়ে চালু হয়েছিল। নরসিমা রাও ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৫ সালে চালু হয়েছিল ১০ ডিজিটের প্যান কার্ড। নরসিমা রাও ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১০ সালে আধার কার্ড চালু হয়েছিল। মনমোহন সিং ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আপনি কী করলেন? একটা স্থায়ী নাগরিকত্ব কার্ড করুন। হে মহান বিশ্বগুরু, নেহরু তো হাসছেন! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ