‘গ্যারান্টি’ শব্দের মানে কি? বাংলা অভিধান বলছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো পণ্যের মান ও স্থায়িত্বের ব্যাপারে লিখিত বা মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া। অন্যভাবে বললে, নিশ্চয়তা। অর্থাৎ উল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্যটি খারাপ হলে কোম্পানি তা পরিবর্তন করে দেওয়ার দায়ভার গ্রহণ করবে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘গ্যারান্টি’র কোনো ‘এক্সপায়ারি ডেট’ নেই! তিনি যে প্রতিশ্রুতি দেন, তা বছর বছর দিয়েই চলেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারলে কী হবে—তা বলেন না। মুশকিল হল, তাঁর বারো বছরের রাজত্বকালে মোদি নিজের তৈরি একটি নিষেধাজ্ঞা প্রায় নিয়ম করে ফেলেছেন, তা হল, তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না। কারণ তিনি সেই সুযোগই দেন না। তথ্য বলছে, তিনি সাধারণত কোনো দিন সাংবাদিক বৈঠক করেন না। আর সরকারি বা রাজনৈতিক মঞ্চে থাকলে নিরাপত্তার কারণে তাঁর ত্রিসীমানায় পৌঁছানোটা একেবারেই অসম্ভব। ফলে সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ হোক বা নির্বাচনি জনসভা—একই প্রতিশ্রুতি বছরের পর বছর দিয়ে যেতে নরেন্দ্র মোদি যেন ক্লান্তিহীন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের কী হল, তা বলার কোনো দায় নেন না প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বাংলায় ছিন্নমূল মতুয়া, নমঃশূদ্রসহ হিন্দু উদ্বাস্তুদের একটা বড়ো অংশ অনেকদিন ধরেই বিজেপির ‘ভোটব্যাংক’ হিসাবে পরিচিত। ২০২১-এর বিধানসভা কিংবা ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তার প্রমাণও মিলেছে। ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে এদেশে আগত এই উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে সেই ২০১৪ সাল থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে মোদির দল। তারা যে এই বিষয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস, তা বোঝাতে ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনও করে। তাতে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা এপারে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এ হল মোদির ‘গ্যারান্টি’। ঘটনা হল, এরপর দেশে দু’বার লোকসভা ও দু’বার রাজ্যে বিধানসভা ভোট হয়েছে। রাজ্যে ফের একটি বিধানসভা নির্বাচন দোরগোড়ায়। অথচ গত কয়েকবছরে কয়েক হাজার মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলেও গত ১০ মার্চ পর্যন্ত শংসাপত্র পেয়েছেন মাত্র ৮০ জন! নাগরিকত্ব নিয়ে মতুয়া, নমঃশূদ্র বা অন্যান্য উদ্বাস্তুদের সঙ্গে এমন নিদারুণ পরিহাস করা হলেও নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা বঙ্গের ভোট প্রচারে এসে রোজ সেই নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই চলেছেন! এই বিষয়ে তাঁদের নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন সংযোজন হল, রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনলে নিশ্চিত নাগরিকত্ব দেওয়া মোদির ‘গ্যারান্টি’। প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার উপায় নেই যে, তাহলে কেন এত বছর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষার আশ্বাস দিয়ে ভোট চাওয়া হল? ভোটের তথ্য বলছে, রাজ্যের কয়েকটি জেলায় কমবেশি ১২০টি আসনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মতুয়া ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসআইআর-এর কল্যাণে যে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েক লক্ষ শুধু মতুয়া রয়েছেন। এঁদের শুধু নাগরিকত্ব নেই তাই নয়, স্বাভাবিকভাবেই এবারের নির্বাচনে তাঁরা ভোটও দিতে পারবেন না। এককথায় আম ও ছাল দুইই গিয়েছে। এমন আতঙ্কের পরিস্থিতিতেও মোদির দেওয়া নাগরিকত্বের আশ্বাস অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটছে! কারণ ভোট বড়ো বালাই।
এসআইআর-এর শুরু থেকে বিজেপি নেতাদের হুংকার ছিল, এর ফলে বহু অনুপ্রবেশকারী মুসলমানের নাম বাদ চলে যাবে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটব্যাংকে ধস নামবে। ঘটনা হল, বাদ যাওয়া ৯১ লক্ষের মধ্যে ৫৫ লক্ষের মতো হিন্দু ভোটার রয়েছেন। শতাংশের হিসাবে বাদ পড়া ৬৩.৩ শতাংশ হিন্দু ও ৩৪.৩২ শতাংশ মুসলিম। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এ রাজ্যে মূলত হিন্দুদের ভোটের উপর নির্ভর করে আসন পায় বিজেপি। এই বাদ পড়া হিন্দু ভোটের একটা বড়ো অংশ মতুয়া, নমঃশূদ্র ও অন্যান্য উদ্বাস্তু সম্প্রদায়ের, যাঁরা মূলত বিজেপির ভোটব্যাংক হিসাবে পরিচিত। ফলে শুধু মতুয়া গড় নয়, গোটা রাজ্যে এই বিপুল সংখ্যক হিন্দু-ভোট বাদ যাওয়াটা বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বের কাছে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ঠেকছে। শেষপর্যন্ত নিজেদের পাতা ফাঁদে নিজেরাই আটকে পড়বে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। তবে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য বিশেষত মতুয়ারা এবার ইভিএম-এ বদলা নেয় কি না— সেটাই দেখার।