মহাকাশযান বোয়িং সিএসটি-১০০ স্টারলাইনার ক্যাপসুলে চড়ে ২০২৪-এর ৫ জুন মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ওই দুই নভশ্চর পাড়ি দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের উদ্দেশে। একটা সাদা সুড়ঙ্গ পথ। তার গায়ে নানা যন্ত্রপাতি বসানো। পথের শেষে চৌকো দরজা। নবাগতদের স্বাগত জানাতে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ‘মহাকাশবাসী’ বিজ্ঞানীরা। শূন্যে ভাসতে ভাসতে, খানিক সাঁতরে মহাকাশ স্টেশনে ঢুকে পড়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস। তাঁর পিছনে আর এক মহাকাশচারী বুচ উইলমোর। মহাকাশের ‘ঘরে’ ফেরার আনন্দে নেচেছিলেন সুনীতা। কিন্তু তখনও কে জানত, আট দিনের সফরে গিয়ে ন’মাস বন্দি থাকতে হবে। নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরতে পারেননি সুনীতা উইলিয়ামসরা। কারণ, হঠাৎই বেঁকে বসেছিল তাঁদের বাহন-সংস্থা বোয়িং। স্টারলাইনার ওড়ার আগেও রকেটে হিলিয়াম লিকেজের সমস্যা ধরা পড়েছিল। যাত্রাপথে আরও নানা যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। রকেটের পাঁচটি ‘ম্যানুভারিং থ্রাস্টার’ খারাপ হয়ে যায়, সমস্যা দেখা দেয় একটি ধীর গতির ‘প্রপেল্যান্ট ভালভ্’-এও। সব মিলিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সুনীতাদের ফেরা। আরও খারাপ খবর শোনানো হয় বোয়িং সংস্থার তরফে। জানানো হয়, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে এই স্টারলাইনার মহাকাশ যানটি সর্বাধিক ৯০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তারপর তার ব্যাটারি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। তবুও নাসা ওই সংস্থার উপরেই ভরসা রেখেছে। কিন্তু সময় যত এগয়, বাড়তে থাকে আশঙ্কা।
মহাকাশে দীর্ঘ দিন থাকলে মহাকাশচারীরা যে সমস্ত শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন, ইতিমধ্যে সুনীতা এবং বুচও সেই সমস্যার মুখোমুখি হতে শুরু করেন। তাঁদের পেশি শিথিল হয়ে আসে। হাড়ও দুর্বল হয় ক্রমশ। তবে এগুলি মহাকাশচারীদের কাছে স্বাভাবিক এবং চেনা অসুস্থতা। নাসার তরফে বারবার জানানো হয়েছে, সুনীতারা ‘হালকা মেজাজে’ রয়েছেন। সুনীতা এর আগেও দু’বার মহাকাশ সফর করেছেন। ৩২২ দিন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান মহাকাশ স্টেশনে কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। মহাকাশে হাঁটার (সাত বার) রেকর্ড তাঁর কাছেই ছিল। স্পেসওয়াকের সময়েও তিনি রেকর্ড গড়েছিলেন। মোট ৫০ ঘণ্টা ৪০ মিনিট হেঁটেছেন তিনি। এ বারেও নজির গড়েছেন তিনি। সুনীতাই প্রথম মহিলা, যিনি কোনও নতুন মহাকাশযানের পাইলট হয়েছেন। বোয়িং স্টারলাইনারের উদ্বোধনী মহাকাশযানটিকে ফ্লরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে সফল ভাবে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)-এ।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেস এক্সের ক্রিউ ড্রাগন মহাকাশযানের মাধ্যমে তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে। বোয়িং স্টারলাইনার সুনীতাদের ছাড়াই ফিরে আসে পৃথিবীতে। ফলে সংস্থার বিপুল ক্ষতি হয়। অন্তত সাড়ে ১২ কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বোয়িং, ভারতীয় মুদ্রার হিসাবে যা ১০৪৮ কোটি টাকা। সুনীতাদের দেশে ফেরাতে ধনকুবের ইলন মাস্ককে নির্দেশ দিয়েছিলেন খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘অত্যন্ত সাহসী দু’জন নভশ্চরকে মহাকাশে রেখে এসে তাঁদের হাত ছেড়ে দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন! মাসের পর মাস ধরে তাঁরা মহাকাশ স্টেশনেই অপেক্ষা করছেন। শীঘ্রই ইলন তাঁদেরকে ফেরানোর জন্য রওনা দেবেন।’ আর ইলনের দাবি, পূর্ববর্তী জো বাইডেনের প্রশাসনের অকর্মণ্যতার কারণেই এত দিন ধরে আটকে থাকতে হয়েছে দুই নভশ্চরকে। এরপরই আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানায়, মার্চ মাসের শেষের দিকে চার সদস্যের ক্রিউ-১০ মিশন মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দেবে। তাতেই পৃথিবীতে ফিরবেন সুনীতা এবং বুচ। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে গোটা দুনিয়া। অবশেষে ঘরে ফিরছেন সুনীতারা। সুনীতাদের সঙ্গে ফিরবেন নাসার নিক হগ এবং রুশ নভশ্চর আলেকজান্ডার গর্বুনভ। সুনীতাদের ভিডিওবার্তা সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেছেন মাস্ক নিজেই। ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে সুনীতাকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমরা শীঘ্রই ফিরছি। খুব বেশি আর দেরি নেই। আমাকে ছাড়া কোনও পরিকল্পনা করবেন না। আমরা ফিরছি।’ তাঁর সঙ্গী বুচ বলেছেন, ‘মাস্ক এবং আমাদের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা ওঁদের সম্মান জানাচ্ছি। ওঁরা আমাদের জন্য যা করেছেন, আমরা তাতে কৃতজ্ঞ।’ গোটা দুনিয়া তাকিয়ে রয়েছে ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেস এক্সের ক্রিউ ড্রাগনের দিকে। কারণ, কল্পনা চাওলার ভয়াবহ স্মৃতি এখনও টাটকা। প্রার্থনা একটাই, সুস্থ শরীরে ফিরে আসুক সুনীতারা। তাঁদের স্বাগত জানাতে তৈরি গোটা দুনিয়া। এই ভারতও।