Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজনীতিতে দুর্বলতা মানেই কিন্তু বিকল্প নয়

এফবিআই, ‘র’ বা মোসাদের মতো গোয়েন্দা এজেন্সির মধ্যে একটা শব্দ বহুল প্রচলিত—অ্যাসেট। সেটা কী?

রাজনীতিতে দুর্বলতা মানেই কিন্তু বিকল্প নয়
  • ১১ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: এফবিআই, ‘র’ বা মোসাদের মতো গোয়েন্দা এজেন্সির মধ্যে একটা শব্দ বহুল প্রচলিত—অ্যাসেট। সেটা কী? এজেন্সিরই কোনও দক্ষ কর্মী ভিন দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকবে। কিন্তু কেউ তার পরিচয় জানবে না। সে আড়ালে থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যাবে। আবার তার রাষ্ট্র বা এজেন্সির প্রয়োজনে যাবতীয় ব্যবস্থাপনাও সেরে ফেলবে। নিঃশব্দে। রাজনীতির অঙ্কে অবশ্য ‘অ্যাসেট’-এর কোনও লুকোছাপা নেই। যেমন, বিহার ভোটে বিজেপির অ্যাসেটের নাম নীতীশ কুমার। নরেন্দ্র মোদি যখন একক ক্যারিশ্মায় দলের বৈতরণী পার করতে পারতেন, তখনও বিহারে এনডিএ’র মুখ তথা ‘অ্যাসেট’ হিসেবে সামনে রাখা হতো নীতীশকেই। আর এখন তো মোদিজি অস্তাচলে। আসন্ন ভোটে জেডিইউ সুপ্রিমো ছাড়া এমনিতেই গতি নেই। সম্প্রতি তাই বিজেপি ঘোষণাও করে দিয়েছে, নীতীশই পরের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ’র মুখ। আর বিহারে যদি গেরুয়া শিবিরের অ্যাসেট নীতীশ কুমার হয়ে থাকেন, তাহলে কেন্দ্রে অবশ্যই রাহুল গান্ধী। সেটাও স্বীকার করে নিয়েছে বিজেপি। কারণ, তিনি ৯৫ পর্যন্ত দারুণ ব্যাট করেও এমনভাবে উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসবেন, যা হারা ম্যাচ বিজেপিকে জিতিয়ে দেবে। অর্থাৎ, ভয়ঙ্কর রকমের কোনও ‘ফাউল’ আচরণ বা কথা। যেমন শনিবার গুজরাতে গিয়ে রাহুল নিজেই বলেছেন, তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা নাকি বিজেপির জন্য কাজ করেন। যতদিন না মানুষের জন্য ভালো কিছু তাঁরা না করছেন, ততদিন কংগ্রেসকে গুজরাতবাসী যেন ভোট না দেন। লোকে নিজের পায়ে কুড়ুল মারে। কিন্তু কুড়ুল খুঁজে গিয়ে তাতে পা মারার কৌশল রাহুল গান্ধীর থেকে শিক্ষণীয়। রাজনীতির মঞ্চে এমন কুশীলবকে বিরোধীদের ‘অ্যাসেট’ ছাড়া কীই বা বলা যায়? প্রতিষ্ঠান বিরোধী নৌকার পালে জোরদার হাওয়া লাগা সত্ত্বেও তাই লোকসভা ভোটে বিজেপি ২৩০ পেরিয়ে যেতে পেরেছিল। মুম্বই-লখনউয়ের বহু পরিচিত মানুষকে বলতে শুনেছি, ইভিএমের সামনে দাঁড়িয়ে যখনই বিকল্প হিসেবে রাহুল গান্ধীর মুখটা ভেবেছি, আর কংগ্রেসকে ভোট দিতে পারিনি। ঠিক এই কারণেই রাহুল গান্ধী বিজেপির অ্যাসেট। কেন্দ্র থেকে রাজ্য, প্রত্যেক মঞ্চেই মোদি ব্রিগেড এভাবে অ্যাসেটের খোঁজে থাকে। ব্যতিক্রম থেকে যায় শুধু বাংলায়। ছাব্বিশের ভোটে আর বছরখানেক বাকি। সব ঠিক থাকলে আগামী বছর ফেব্রুয়ারির শেষ অথবা মার্চের শুরুতেই নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে যাবে। জমি যাচাইয়ের জন্য এটাই মোক্ষম সময়। অথচ এখানে এখনও অ্যাসেটের খোঁজ পেল না বিজেপি। চেষ্টা চলছে সেই ২০১৬ থেকে। নারদ কাণ্ড নিয়ে দেদার প্রচারও ফেল করেছে। তারপর দলবদলু নেতা-হোতা ধরে নিয়ে গিয়ে বিজেপি ভাবল, এইবার সরকারই ফেলে দেব। সেই নেতা একটার পর একটা তারিখ দেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কিন্তু পড়ে না। সবশেষে দুর্নীতির বেহালা তো আছেই। কাকুর, ভাইপোর, শিক্ষার, ১০০ দিনের কাজের... কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এতকিছুর পরও বাংলার মানুষকে হাত করা যাচ্ছে না! কপালে তিলক কেটে, ফুলবাবুটির মতো সেজে সংবাদমাধ্যমের বুমের সামনে এসে হাঁকডাক করলেই কি আর ভোটে জেতা যায়? আজ এ রাজ্যে বিজেপির যতটুকু পেনিট্রেশন, তার কৃতিত্ব বঙ্গ নেতাদের নয়। বরং সিংহভাগই আরএসএসের। দিনের পর দিন নিঃশব্দে ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থেকেছে তারা। বিশেষত উত্তরবঙ্গে... চা-বলয়ে। তাই সেখানেই সংগঠন মজবুত হয়েছিল বিজেপির। সঙ্ঘের সঙ্গে বিজেপির তালমেল কোথায় থাকার কথা? প্রথমজন রেঁধেবেড়ে দেবে, আর দ্বিতীয়জন পরিবেশন করবে। অর্থাৎ, সঙ্ঘ জমি তৈরি করে দেবে, সেখানে কাজ করে এবং পরিষেবা দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখবে বিজেপি। এটাই ফান্ডা। বাংলায় এই বেসিক ফর্মুলা ধরে রাখতে গিয়েই যে হোঁচট খাচ্ছে বঙ্গ বিজেপি। এমনকী উত্তরবঙ্গের তৈরি জমির মাটিও ঝুরঝুরে হয়ে গিয়েছে। গত লোকসভা ভোটের ফলই তার প্রমাণ। স্বয়ং বঙ্গ বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদারই জিতেছেন মাত্র ১০ হাজার ভোটে। দার্জিলিং ছাড়া সর্বত্র হু হু করে ভোট কমেছে বিজেপির। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের কোচবিহার তো হাতছাড়াই হয়েছে। ধস খেয়েছে জঙ্গলমহলও। দক্ষিণবঙ্গে জেতা আসনগুলোর কোথাও জয়ের ব্যবধান ০.৩ শতাংশ, কোথাও ৪ শতাংশ, আবার কোথাও ১ শতাংশ। মানেটা স্পষ্ট, ভোটাররা আর ভরসা রাখতে পারছেন না বিজেপির উপর। যাঁরা তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে গেরুয়া বাহিনীকে মাথায় তুলে নাচছিলেন, তাঁরা বুঝেছেন, বোঝা বাড়িয়ে লাভ নেই। নামিয়ে দেওয়াই ভালো। ফাঁকা আওয়াজ নয়। উপ নির্বাচনের ফল দেখেই সেটা ঠাহর করা যায়। একুশের ভোটে ৭৭টা আসন জিতেছিল বিজেপি (২০০ পারের দাবি তুলে)। সেই সংখ্যাটা এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? ৬৫। অর্থাৎ, বিজেপি বিধায়করা একটু ফাঁক পেলেই তৃণমূলের দরজা গলে ঢুকে পড়ছেন। আর তথাকথিত নেতৃত্ব শুধু শাসকের দুর্বলতা খোঁজার চুলচেরা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও যদি কেউ যথাযথ ফিল্ড ওয়ার্ক করে থাকে, তাহলে সেটা আরএসএস। সম্প্রতি মোহন ভাগবত বাংলায় এসে দিন দশেক কাটিয়ে গিয়েছেন। প্রকাশ্য কর্মসূচি বলতে গোটা কয়েক সভা, আর কর্মী-বৈঠক ছিল। তলে তলে তিনি কী চাল দিয়ে গিয়েছেন, সেটাই দেখার। তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস কি সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে? সিপিএম বা কংগ্রেস একে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না। অন্তত তাদের কর্মিসভা, সম্মেলনে এ নিয়ে দারুণ কিছু মাথাব্যথা করতে দেখা যায়নি। উল্টে মোদি সরকার ফ্যাসিবাদী নয় বলেই সিপিএম ল্যাজ নাড়া শুরু করেছে। এতে তাদের রাজনৈতিক লাভ কী হবে, জানা নেই। তবে বাংলায় আসন শূন্য থেকে ১০ হয়ে যাবে না। কারণ, এখনও মহম্মদ সেলিমদের উপর ভরসা। দলে তিনি জনপ্রিয় হতে পারেন, আম জনতার মধ্যে তাঁর মতো নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা, সেটা নিক্তি দিয়ে মেপে নেওয়া উচিত সিপিএমের। সে সব না করে তারা হয় টুম্পা সোনায় মন দিচ্ছে, না হলে আনপ্রফেশনাল এআই দিয়ে খবর পড়াচ্ছে। তাদের প্রধান কোনও দপ্তরে গেলে আগে লাল চা দেওয়া হতো। এখন মেশিনে কফি আসছে। তাতেও বিপদ। লোকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। বলছে, সর্বহারার পার্টি তো সবই হারিয়ে বসে আছে। চা তাহলে কফি হয়ে যাচ্ছে কীভাবে? রাজ্য সম্মেলনে বিলাসিতার বহর দেখে প্রশ্ন উঠছে, আসন কি বাড়বে? মোহন ভাগবত নিয়ে তারা খুব একটা ভাবনাচিন্তা করবে বলে মনে হয় না। সিপিএম তো এখনও বিজেপিকে প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতেই পারে না। তাদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’। ভাবনার দৈন্য না ঘুচলে বিরোধী বেঞ্চ বসেও গঠনমূলক কিছু আশা করা বৃথা। আর কংগ্রেস? বেঁচে থাকতে সিপিএমের হাত ধরেছে। এক পক্ষ ছবি, তো আর এক পক্ষ ফসিল। তাদেরও যে বাংলায় এক রোগ। কেন্দ্রে হাত ধরতে পারি, বাংলায় মমতার বিরোধিতা করতেই হবে। এই ইগোর ঠেলায় অধীর চৌধুরী মিথটাই মুর্শিদাবাদ-বহরমপুর থেকে গুটিয়ে গেল। তাদের ভাবনায় আসবে আরএসএসের ছক?

Advertisement

তৃণমূলের নিচুতলার একাংশের বিরুদ্ধে চোখ বুজে কামাই চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও সামান্য কিছু খবর এখনও তারাই রাখে। তারা বলছে, ভাগবত এই ক’দিনে ছাব্বিশের ভোটের লাইন ঠিক করে দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, হিন্দুত্ব ফর্মুলা ছাড়া গতি নেই। আর এক্ষেত্রে হাতিয়ার করতে হবে বাংলাদেশকে। ওখানকার বর্তমান পরিস্থিতিকে। বঙ্গ বিজেপির সংগঠনের উপর ভরসা না রেখে নিজেদের ফাঁকফোঁকর বন্ধ করারই নির্দেশ দিয়েছেন সরসঙ্ঘচালক। তার জন্য পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা, স্কুলের ছেলেমেয়েদের মগজধোলাই, সবই আছে। ভাগবত জানেন, সমাজের নিচুতলায় যত পেনিট্রেট করা যাবে, ততই লাভ। ওরাই আসল ভোটব্যাঙ্ক। যেখানে যেখানে শাসক তৃণমূলের পা আর মাটিতে নেই, সেখানে সুচ হয়ে ঢুকে পড়তে হবে। সঙ্ঘের উপর মানুষের ভরসা থাকলে বিজেপি ভোট পাবে। আর হিন্দুত্বের মুখ বিজেপি ভোট পেলে মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে থাকবে সঙ্ঘ। 
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাহলে কার শক্তি কতটা? আর দুর্বলতাই বা কী? একটা বিষয় বুঝতে হবে, বিজেপির শক্তি কিন্তু তাদের দলের নেতারা নন। বরং সবটাই হিন্দুত্ব এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলে সরকার বিরোধী একটা সুর জন্ম নিয়েই থাকে। বাংলাতেও তার অন্যথা হবে না। তখনই মানুষ বিকল্প খুঁজতে চায়। বিজেপির দুর্বলতা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প হিসেবে বাংলার মানুষ গেরুয়া পার্টিকে এখনও ভাবতে বা মানতে পারছে না। ৩৪ বছরের পাঁকে বাংলা এমনভাবে ডুবেছিল যে, সিপিএমের উপর আস্থা অদূর ভবিষ্যতেও ফেরার সম্ভাবনা দেখা যায় না। কংগ্রেস তো সেখানে আব্বুলিশ। কাজেই যতটুকু ভোট প্রাপ্তির সুযোগ আছে, পুরোটাই বিজেপির। তৃণমূলের কি দুর্বলতা নেই? সেটাও আছে। যেমন কাটমানি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচুর ধমক-চমক দেওয়ার পর কিছু মাত্রায় বিষয়টা কমেছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি। হবেও না। এটা আসলে এক শ্রেণির ডিএনএতে ঢুকে গিয়েছে। কিছুতেই বের করা যাচ্ছে না। তাহলে মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেয় কেন? সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানীয় জল এবং অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনও প্রত্যেকটা আসনে তিনিই প্রার্থী তৃণমূলের। এটা একদিকে যেমন আশীর্বাদ, তেমনই দলের জন্য অভিশাপও বটে। মানুষ এখনও তাঁকে দেখে ভোট দেয়, আশা করে আরও ভালো কিছুর। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বার্ধক্য ভাতা, কন্যাশ্রী, কৃষক বন্ধু... বাংলার মানুষ জানে, মমতা আছেন। কিন্তু বছরের পর বছর সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পেতে পেতে সেটাও মানুষের গা সওয়া হয়ে যায়। তখন মানুষ খোঁজে আরও বেশি কিছু। হয়তো চাকরি। বা ব্যবসা। একেও দুর্বলতা বললে ভুল হবে না। মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করছেন এই দিকগুলোতেও আলো ফেলার। তিনি সেটা করবেন। আর ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, তিনি বেরিয়েও পড়বেন। জেলায়, গ্রামে, পাড়ায়... তাঁকে দেখা যাবে তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করতে। রাজ্যবাসীর প্রতিনিধিত্ব করতে। তাই তো বাংলার মানুষের আশা তাঁর কাছে একটু বেশিই। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ