Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঁচতে হবে, মিরাকলের আশায় সবাই

নাম তাঁর বিশ্বাস। বিশ্বাস কুমার রমেশ। ১২ জুন, ২০২৫ আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা একমাত্র যাত্রী। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না, কীভাবে বেঁচে আছেন, বেঁচে ফিরেছেন কীভাবে!

বাঁচতে হবে, মিরাকলের আশায় সবাই
  • ১৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: নাম তাঁর বিশ্বাস। বিশ্বাস কুমার রমেশ। ১২ জুন, ২০২৫ আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা একমাত্র যাত্রী। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না, কীভাবে বেঁচে আছেন, বেঁচে ফিরেছেন কীভাবে! এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ফ্লাইট ২৪২ জন যাত্রী নিয়ে আমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল। আর সেটাই বহু মানুষের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে উঠল মুহূর্তের ব্যবধানে। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল বিমানবন্দরেরই অদূরে!

Advertisement

ওই বিমানেরই অন্যতম যাত্রী হলেন বিশ্বাস। মৃত্যুকে সত্যি সত্যি স্পর্শ করে ফিরে আসা এই যুবক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সবকিছুই আমার চোখের সামনে ঘটেছে। বিশ্বাসই করতে 
পারছি না যে আমি বেঁচে আছি! বেঁচে আছি কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম, মৃত্যু হবে আমারও। কিন্তু চোখ খুলে যখন চারপাশ দেখলাম, বুঝলাম আমি বেঁচে আছি!’
এরপরই বিশ্বাস যোগ করেন, ‘সিট বেল্ট খুলে বেরবার চেষ্টা করলাম এবং বের হয়েও গেলাম। আমার চোখের সামনে এয়ার হোস্টেস, অনেক আঙ্কল আন্টি সবাই মারা গেলেন।’
দুর্ঘটনা কীভাবে? একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান উঠে এসেছে একাধিক মিডিয়ায় এইরকম, ‘উড়ান দেওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যেই মনে হল, কিছু আটকে গিয়েছে, পরে বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে। তখন বিমানের মধ্যে সবুজ আর সাদা আলো জ্বলে উঠল। এরপর কী হল বুঝিনি। হয়তো আরও গতি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। তখনই বিমানটা ধাক্কা খেল।’
বিমানটা মেডিক্যাল কলেজ হস্টেলের দেওয়ালে ধাক্কা খেলেও বিশ্বাস কুমার রমেশের সিট ছিল উল্টো দিকে, খোলা মাঠ সেদিকে এবং তাঁর সামনে দরজাটাও ছিল উন্মুক্ত। বিশ্বাস বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, ‘আর এই কারণেই আমি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম।’
এই দুর্ঘটনায় তাঁর হাত সামান্য পুড়েছে এবং দেহের অন্যান্য অংশেও চোট লেগেছে, তবে তা ছোটখাটোই। বিশ্বাস পরিষ্কার করলেন যে, ভাগ্যদেবী সেদিন সেই মুহূর্তে অন্যদের প্রতি মোটেই প্রসন্ন ছিলেন না। আর এজন্যই ওই বিমানের ২৪১ জন তো বটেই, বিমানটি যে-হস্টেলে ধাক্কা মেরেছিল মারা পড়েছেন সেখানকারও অনেকে।
এই ঘটনায় এমন লোকজনও মারা গিয়েছেন, যাঁরা কোনোদিন বিমান ছুঁয়েও দেখেননি, তাঁদের কাছে উড়োজাহাজ ‘আকাশের ফল’ বিশেষ—কোনও বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে, সাত-সমুদ্র-তেরো-নদী ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির দেশ ঘুরেটুরে আবার অন্যকোনও বন্দরে গিয়ে নামে, কিছু সময়ের বিশ্রাম নেয়—সম্পর্ক এইটুকুই মাত্র। আর সেই আকাশযানটাই 
কি না নিরাপদ ঘরের কোণে ঢুকে পড়ে সব তছনছ করে দিয়ে গিয়েছে!
আর এরকমই একটি ভয়বাহ ছবির মধ্যে জীবনের সবচেয়ে দামি হাসিটা উপহার পেয়েছেন বিশ্বাস নামক এক মহাভাগ্যবান এক ভারতসন্তান। জানি না, কোনও অগাধ বিশ্বাস থেকেই তাঁর জীবনের পরম 
বস্তু মিলল কি না। এ যে মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনারও অধিক! 
***
দূরপাল্লার ট্রেন দুর্ঘটনার আতঙ্ক দীর্ঘদিন ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমাদের। ১২ অক্টোবর, ২০২৪ রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, গত পাঁচবছরে দেশে দুশো বড় মাপের রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর ওইসব ঘটনায় ৩৫১ জনের প্রাণ গিয়েছে এবং গুরুতর জখম হয়েছেন ৯৭০ জন। ভারতীয় রেলের ১৭টি জোনে বর্তমানে রেলভ্রমণের এই ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি বৈষ্ণব আরও দাবি করেন, ছবিটা আগে আরও ভয়াবহ ছিল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘রেলের রিপোর্ট অনুসারে, দশবছর আগে দেশজুড়ে বছরে রেলদুর্ঘটনার বার্ষিক সংখ্যা ছিল ১৭১! সংখ্যাটি এখন ৪০-এ নেমে এসেছে।’
জমানার তুল্যমূল্য বিচারে রাজনীতির কারবারিদের কিছু লাভালাভ হতেই পারে, কিন্তু যাত্রীসাধারণের তাতে কীই-বা আসে যায়! তারা এটুকুই জানে, রেলযাত্রা এখনও পুরোপুরি ভাগ্যনির্ভর। সে আপনি ব্যবসায়িক কিংবা পেশাগত কারণে রেলে চড়ুন, কিংবা পরিবার প্রিয়জন নিয়ে বেড়াতে বেরন, যে শ্রেণির এবং যত দামেরই টিকিট কাটুন—ফলাফলে কিছুমাত্র তফাত নেই। ভাগ্যে যা লেখা আছে সেটাই হবে। নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার গ্যারান্টি মোদি সরকার নেবে না, তারা শুধু ভাড়াটাই জিএসটি-সমেত অগ্রিম গুনে নেবে। স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তার দিকটি দেখবেন একমাত্র ভাগ্যদেবী!
***
কিছু তার্কিক রেলভ্রমণের যন্ত্রণার পাশে রাখছিলেন বিমানযাত্রার সৌন্দর্যকে। পরিসংখ্যানসহ বোঝাবার চেষ্টা হচ্ছিল যে, বিমানযাত্রায় কেবল সময়ের সাশ্রয়ই হয় না, তা তুলনামূলকভাবে অনেক নিরাপদও। ভারতে রেলদুর্ঘটনার যা বহর, তার পাশে বিমান দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতি নগণ্য!
কিন্তু সদ্য সংঘটিত আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনা সব তথ্য তত্ত্ব ভরসা একত্রে উল্টে দিল। 
আকাশপথে স্বপ্নভঙ্গ ১২ জুন দিনটিতেও যে থামেনি। আমেদাবাদের সঙ্গে যখন বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া অতীতের দশটি মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনার তুলনা চলছে, জারি রয়েছে তদন্ত এবং বিতর্ক—তখনই সামনে এল এক চপার দুর্ঘটনার ছবি।
***
রবিবার ভোরে উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগে গৌরীকুণ্ডের কাছে ওই দুর্ঘটনায় পাইলট এবং একটি শিশুসহ সাতজনের প্রাণ গিয়েছে। হেলিকপ্টারটি কেদারনাথ থেকে গুপ্তকাশী যাচ্ছিল। চলতি মরশুমে চারধাম যাত্রা শুরুর পর থেকে মাত্র দেড় মাসে পাঁচটি এমন দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাণ 
গিয়েছে ১৩ জনের। চপার দুর্ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। এই যাত্রায় নিরাপদ নন কেউই। সেনাপ্রধান (সিডিএস) বিপিন রাওয়াতের মতো ওজনদার ব্যক্তিও মারা গিয়েছেন চপার ভেঙে পড়ার ঘটনায়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর নীলগিরি পর্বতে ওই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। চপার দুর্ঘটনায় তার আগে পরে মারা গিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী এবং অন্যান্য ভিভিআইপি গোত্রের ব্যক্তিরাও।
এতেও কি লাগাম টানা গেল দুর্ভাগ্যে? না। একই দিনে ঘটে গেল এক মারাত্মক ব্রিজ বিপর্যয়। রবিবার পুনের কুন্দমালা গ্রামে ইন্দ্রায়ণী নদীর উপর ভেঙে পড়ল একটি পুরনো সেতু। তাতে অন্তত দু’জনের মৃত্যু হয়েছে এবং জখম হয়েছেন ৩২ জন। প্রাথমিক খবর অনুসারে, খরস্রোতা নদীর জলের তোড়েও ভেসে গিয়ে নিখোঁজ অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিস এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মিলিতভাবে কিছু লোককে উদ্ধার করেছেন অবশ্য। বাকিদের খোঁজে চলছে তল্লাশি।
***
বিপর্যয় কি যতিচিহ্ন জানে? একদম না। যুদ্ধের বিপর্যয় নেমে এসেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। রাশিয়া-ইউক্রেনের ধ্বংসলীলা চলছেই। ভারত-পাকিস্তান বিরাম নিতেই তেতে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। দিক বদল করেছে ইজরায়েল। নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইন ছেড়ে তাক করেছেন ইরানকে। তেহরান-তেলআভিভের খেলার শেষ খামেইনিও জানেন না। জানেন না সম্ভবত ট্রাম্পও। তবে তাঁদের মাস্তানিতে সরাসরি মারা পড়ছে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে নিরীহ নিরপরাধ শিশু এবং মহিলাই বেশি। আর যুদ্ধের আঁচে ঝলসে গিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। ভেঙে পড়ছে উৎপাদন ব্যবস্থা, সাপ্লাই চেইন।
***
যুদ্ধবাজদের সব বড় বড় ব্যাপার। আমরা শুধু বেঁচে থাকতে চাই। রকমারি বিপর্যয়ে আম পাবলিকের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। প্রতিটা বেঁচে থাকাই আসলে মিরাকল। যেভাবে অপারেশন সিন্দুরের সামনে বেঁচে গেল পাকিস্তান, ১০ মে আচমকা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হতেই। এমনকী, ফিল্ড (অবশ্য, পাক পাবলিক বলছে—‘ফেইলড’) মার্শাল খেতাবও জুটে গেল আসিম মুনিরের! তারপর মিরাকল দেখা গেল আমেদাবাদে বিশ্বাস কুমার রমেশকে ঘিরে। ছাত্র, গবেষক, চাকরি-সন্ধানী, ব্যবসায়ী, শেয়ারে লগ্নিকারী, রোগীসহ আমরা সকলেই মিরাকলের প্রত্যাশায়। এমন মিরাকল ঘটুক যে, দেশের সেরা রাজ্য হয়ে উঠুক বাংলা এবং ভারত প্রবেশ 
করুক ‘উন্নত’ বিশ্বের সারিতে, ২০৪৭-এ কেন, 
এখনই। সেন্সাস হয়নি, প্রয়োজনীয় তথ্যাদি এবং উপযুক্ত প্ল্যান নেই তো কী! মিরাকল কোনও যুক্তিবুদ্ধির ধার ধারে না। একুশে জুলাইকে সামনে রেখে রাজ্যের শাসক দল ছাব্বিশের জন্য বিরাট লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করতে চলেছে। তার সামনে রুগ্ন বঙ্গ বিজেপিরও হয়তো একটাই প্রার্থনা—মিরাকল অ্যান্ড ওনলি মিরাকল!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ