নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: আর রেখেঢেকে নয়! এই প্রথম আমেরিকা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম করে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিল ভারত। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর সাফ জানিয়ে দিলেন, কোথা থেকে তেল কিনবে কিংবা কিনবে না, সেটা ভারতই ঠিক করবে। ভারত থেকে বিশুদ্ধ পেট্রপণ্য অনেকেই ক্রয় করে। ইউরোপ, আমেরিকা... যার পছন্দ নয়, সে কিনবে না! কেউ তো জোর করছে না। পোষালে কিনবে। না পোষালে কিনবে না। ভারতের তেল কিনতে হবে না আমেরিকাকে। এমনকী এদিনই ভারতের ডাকবিভাগ ঘোষণা করেছে, মার্কিন মুলুকে আর বড় পার্সেল পাঠানো হবে না।
শনিবার দিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী। সেখানে কোনও রাখঢাক না রেখে তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় এরকম একজন প্রেসিডেন্ট এই প্রথম, যিনি বিদেশনীতির কথা এভাবে প্রকাশ্যে জানিয়ে দিচ্ছেন। এই ভাষায় হুঁশিয়ারি দেওয়া আমেরিকার এতকালের ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ সরে আসা। এমনকী বাণিজ্য নীতি কী হবে, কোন দেশের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে কী আলোচনা চলছে, এসবই হল দ্বিপাক্ষিক। অথচ এই প্রথম এমন একজন প্রেসিডেন্ট দেখা যাচ্ছে, যিনি সেই বাণিজ্য নীতির কথাও প্রকাশ করে দিচ্ছেন। কূটনীতির যে মার্কিন প্রোটোকলের সঙ্গে এতদিন ধরে সকলে পরিচিত ছিল, সেটি আর নেই। এটা বেশ বিস্ময়কর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গোটা বিশ্বের সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করছেন, এমনকী নিজের দেশের সম্পর্কেও তাঁর যে মনোভাব, সেটি এতকালের মার্কিন অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’ এরপরই নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করে দেন জয়শংকর। বলেন, ‘আমেরিকা কীভাবে চলবে সেটা অবশ্যই তারা স্থির করবে। তবে আমরা এটা স্পষ্ট করে জানাতে চাই যে, ভারত তার কৃষকদের, ক্ষুদ্র শিল্প পরিচালকদের, শ্রমিকদের, সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে। কোনওরকম চাপের কাছে আপস করবে না।’
তবে বিদেশমন্ত্রীর সবথেকে কঠোর যে মন্তব্য, সেটা হল —‘আমাদের তেল কিনতে হবে না।’ এতদিনের ভারত বনাম মার্কিন টানাপোড়েনের মধ্যে এটাই নয়াদিল্লির সবথেকে তীব্র প্রত্যাঘাত। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে ভারত শুধু সস্তায় তেল কেনেনি, তা বাজারে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটেছে। সেপ্রসঙ্গে এদিন জয়শংকরের জবাব, ‘এটা তো ভারী মজার কথা। আমেরিকা নিজেই সর্বদা বাণিজ্যমুখী, মুনাফামুখী অবস্থান নেওয়াকে সঠিক মনে করে। আর সেকাজ অন্য কেউ করলেই সমালোচনা?’
আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের হৃদ্যতাকেও এদিন বিঁধেছেন জয়শংকর। বলেছেন, ‘আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সৌহার্দ্যের একটি ইতিহাস আছে। আবার সেসব ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও ইতিহাসও রয়েছে। ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে, কোনও অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বরদাস্ত করা হবে না। যদি কারও সমস্যা হয়, তাহলে জানিয়ে দিক যে তারা ভারতের সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেয় না।’ বিদেশমন্ত্রীর মুখ দিয়ে ভারত সরকার এমন সময় এই কঠোর বার্তা দিয়েছে, যখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চলছে ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লির। সেই আলোচনা কি তাহলে ব্যর্থ? জয়শংকরের অবশ্য দাবি, আলোচনা চলতেই পারে। তা তো কেউ বাতিল বলে ঘোষণা করেনি। আলোচনা চলুক। কিন্তু ভারত নিজের স্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। এটা নিয়ে কোনও দ্বিমত অথবা সংশয়ের স্থান নেই।
শুক্রবারই ভারতের নিজস্ব ফাইটার জেটের ইঞ্জিন ক্রয় এবং নির্মাণে ফ্রান্সের সংস্থার সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। আত্মনির্ভর ভারতের অন্যতম বিজ্ঞাপন হবে ৯৭টি নতুন যুদ্ধবিমান। আমেরিকার দুই সংস্থাও এই জেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি বিক্রয়ের তালিকায় ছিল। কিন্তু ভারত বাছাই করেছে ফরাসি সংস্থা স্যাফ্রোঁকে। স্বাভাবিকভাবেই যা আমেরিকাকে বড়সড় ধাক্কা। ভারতের নতুন অবস্থান। ইটের বদলে পাটকেল!