সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: জ্বলে উঠেছে আগুন। ক্ষোভের আগুন। প্রতিবাদেরও। নিট-ইউজির প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে সরব ছাত্র-যুব আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে সোমবার বেলাগাম লাঠিচার্জ করেছিল অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ দিল্লি পুলিশ। মঙ্গলবার তার পালটা প্রতিবাদে যেন আগুনের ফুলকি ছুটল সংসদ থেকে রাজপথে। দাবি, ১) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা। ২) সংসদে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আলোচনা। ৩) অমিত শাহের বিবৃতি। ৪) প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে। ফল? প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, আন্দোলনে কোণঠাসা কেন্দ্র। উত্তাল দিল্লি। সাধারণ পড়ুয়া-অভিভাবকদের আন্দোলনের আঁচ অরাজনৈতিক পরিসর থেকে প্রবেশ করল রাজনীতির মহামঞ্চে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থানে বসা রাহুল গান্ধীদের টেনে হিঁচড়ে, চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ।
সংসদের বাদল অধিবেশনের সূচনাপর্ব। তাই গোটা দেশের নজর ছিল সেদিকেই। লোকসভা থেকে রাজ্যসভা—সর্বত্র সেই আঁচ অনুভব করা গেল। যুব সম্প্রদায়ের উপর ‘পুলিশি অত্যাচারে’র অভিযোগে ওয়েলে নেমে চলল দফায় দফায় বিক্ষোভ। উঠল শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা চেয়ে স্লোগান। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো হয়ে উঠল যে, মুলতুবি হল অধিবেশন। আর তারপরই বদলে গেল আন্দোলনের ভরকেন্দ্র। এবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ৭, লোককল্যাণ মার্গের সামনে। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা, অখিলেশ যাদব, সুপ্রিয়া সুলেরা বসে পড়লেন অবস্থানে। সংসদ মুলতুবি হতেই আকবর রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। জন্মদিনের সেলিব্রেশন ফেলে হাজির মল্লিকার্জুন খাড়্গেও। সঙ্গে কেরল, কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন এবং ডি কে শিবকুমার। উঠল স্লোগান, ‘মোদি তেরি গুন্ডাগর্দি নেহি চলেগি, নেহি চলেগি।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুলের ডাকে ভিড় বাড়তে থাকল মোদির বাড়ির সামনে। প্রিয়াঙ্কা তুললেন স্লোগান, ‘প্রধানমন্ত্রী কায়র (কাপুরুষ) হ্যায়। হিম্মত হ্যায় তো বাহার আও।’ এলাকা কাঁপিয়ে গলা মেলালেন বিক্ষোভরত সাংসদরা। একইসঙ্গে তখন উত্তাপ বাড়ছে যন্তরমন্তরেও। জমায়েত করতে শুরু করেছে নতুন প্রজন্ম। দিল্লির পাশাপাশি কলকাতা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড থেকেও জড়ো হল ছাত্র-যুবরা। সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের চোখ রাঙানিকে হেলায় করল অবহেলা। আর প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের শক্তি বাড়াতে পৌঁছে গেলেন ৮৫ বছরের মারাঠা স্ট্রংম্যান শারদ পাওয়ারও। হাজির হলেন সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস সহ বাম জনপ্রতিনিধিরা।
যদিও প্রচারের যাবতীয় আলো ততক্ষণে কেড়ে নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। কারণ, ততক্ষণে বিরোধী দলনেতার ঘোষণা, ‘সারা রাত এখানেই অবস্থান করব।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে ছুটে গেলেন পিএমও’র রাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী জিতেন্দর সিং। সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন। রাহুলের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন তাঁরা। অনুরোধ করলেন, ‘স্পর্শকাতর’ ভিভিআইপি ওই এলাকায় ধরনা করবেন না। কিন্তু রাহুল অনড়। জানিয়ে দিলেন, ‘যতক্ষণ না দাবি মানবেন, নড়ব না।’ রাহুলের জেদ দেখে জিতেন্দর সিং ফোনে সরাসরি কথা বললেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। মোদির বার্তা জেনে বললেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস ইস্যুতে সংসদে আলোচনায় আমরা রাজি। কিন্তু ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার বিষয়ে কোনো আশ্বাস দিতে পারব না।’ রাহুলও সাফ জানিয়ে দেন, ‘ইস্তফা দিতেই হবে।’ চাপ আরও বাড়ল তারপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুলের একটি পোস্টে—ছাত্র-যুবদের উপর পুলিশি বর্বরতার জন্য পদত্যাগ করতে হবে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তখনই আসরে নামল হাজারে হাজারে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স। রাহুল গান্ধীর হাত ধরে টান মারল পুলিশ। মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি। শুরু হল ধস্তাধস্তি। টেনে হিঁচড়ে রাহুলকে তোলা হল প্রিজন ভ্যানে। নাক ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল তাঁর। একইভাবে প্রিয়াঙ্কা, রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা, পবন খেরা, অখিলেশদেরও। রাহুলকে নিয়ে যাওয়া হল ছত্রশাল স্টেডিয়াম, প্রিয়াঙ্কাকে মন্দির মার্গ পুলিশ স্টেশনে। আর অন্য সাংসদের একাংশকে কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায়। এদিনের কর্মসূচি নিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে নিশানা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর অভিযোগ, বাদল অধিবেশনে বাধাদানের জন্য পড়ুয়াদের নির্লজ্জভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছেন রাহুল।
তবে এদিন পুলিশি ‘নির্যাতনে’র বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে কংগ্রেস। সুরজেওয়ালার দাবি, ‘মোদি জমানায় আর গণতন্ত্র নেই। গণ-লাঠি-তন্ত্রে পরিণত।’ জয়রাম রমেশের তোপ, ‘তানাশাহির অন্য নাম অমিত শাহি।’ রাতে মন্দির মার্গ থানায় পৌঁছে যান সোনিয়া গান্ধী। বাংলা সহ রাজ্যে রাজ্যে লোকভবনের সামনে ডাক দেওয়া হয়েছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের। তারপরই রাতে থানা থেকে মুক্তি দেওয়া হয় রাহুল-প্রিয়াঙ্কা সহ সাংসদদের। এদিন গোটা ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আর বিরোধীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ, এভাবে মোদি সরকার যত কণ্ঠরোধের চেষ্টা করবে, ততই ফুঁসে উঠব আমরা।