এসআইআর নামক ধুম মাচানো শুরু হয়েছে বিহার থেকে। উপলক্ষ ছিল বিধানসভা নির্বাচন। তীব্র সমালোচনা এবং বিতর্কের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে বিহারে এসআইআর। অতঃপর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। বিপুল আসন নিয়ে জিতেছে শাসক গেরুয়া জোট। কংগ্রেস, আরজেডি এবং বামদলগুলিসহ বিরোধীরা বস্তুত ধরাশায়ী। ভোট মিটতেই চাপা পড়ে গিয়েছে বিহার প্রসঙ্গ। অন্যদিকে বিহারে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই ধামাকা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে বঙ্গেও। ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বকেয়া এসআইআর সম্পন্ন করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই পর্বে দেশের নানা অংশে এসআইআর হলেও আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রে পশ্চিমবঙ্গ। কমিশন জানিয়েছে, ২০০২-০৪ সালে অনুষ্ঠিত এসআইআর অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নিজের অথবা বাবা-মায়ের নাম থাকলেই হবে। তাহলে আর নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র চাওয়া হবে না। বাংলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ২০০২-এর তালিকা। তাতে নাম না-থাকলে দেখা হবে ২০০৩-এর খসড়া এবং জানতে চাওয়া হবে ওইসময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোথায় ছিলেন। ভোটারের কাছে তার প্রমাণপত্রও দাবি করা হবে। এই শর্তই এখন প্রধান।
২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রস্তুতি। বিএলওরা ৪ নভেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টানা কদিন নির্দিষ্ট (ইনিউমারেশন বা গণনা) ফর্ম দিয়েছেন। সেটি পূরণ করে সইসমেত বিএলওকে জমা দেওয়া এখন চলছে। ভোটার তালিকার অনলাইন লিংক খুলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এবং তথ্যাদি ২০২৫ সালের মতো পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ অনুমোদন দেবেন বিএলও। কিন্তু ২০০২ সালের তালিকায় নিজের এবং বাবা-মা কারও নাম না পেলেই সমস্যা—চাওয়া হবে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি। প্রয়োজনে বাড়িতে নোটিশ যাবে। আধার কার্ড ছাড়াও নির্দিষ্ট ১১টি সহায়ক নথির যেকোনও একটি পেশ করতে হবে। কমিশন ৯ ডিসেম্বর খসড়া সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে। তখন নেওয়া হবে অভিযোগ, নালিশ, আবেদন এবং চলবে শুনানি ও নথিপত্র পেশ। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ৭ ফেব্রুয়ারি। তবু শঙ্কায় কাটছে বহু মানুষের দিন। কিছু মানুষ এমন ভয় পেয়েছেন যে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটে গিয়েছে এরাজ্যে।
বেশিরভাগ বিভ্রান্তির সূত্র কমিশনের সিদ্ধান্তহীনতা। প্রথম দিকে চলল আধার জট। তারপর এল ভোটারের ‘আত্মীয়’ বিষয়ক জটিলতা। এই জটিলতাই সবচেয়ে বেশি। এই সম্পর্কের ব্যাখ্যা একেক সময় একেক রকম দেওয়া হয়েছে। ফর্ম ফিলাপ যখন শেষ কিংবা একেবারে শেষের পর্যায়ে, অনেকের পূরণ করা ফর্ম ততক্ষণে জমাও পড়ে গিয়েছে, তখনই কিছুটা ‘উদার’ হল কমিশন। শুধু পিতৃকুল নয়, জানানো হল ওইসঙ্গে মাতৃকুলের সম্পর্ককেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। একদিকে বলা হচ্ছে, আধার নম্বর প্রদান ‘ঐচ্ছিক’। অন্যদিকে ভোটার কার্ডের সঙ্গে আধার এবং ফোন নম্বর সংযুক্ত না-থাকলে অনলাইনে ফর্ম ভরা অসম্ভব। ফর্মে ভোটারের হালফিল ছবি সেঁটে দেওয়ারও জায়গা রাখা হয়েছে। অতএব, কোটি কোটি ভোটার রঙিন ছবি তুলেছেন লাইন দিয়ে। পরে জানানো হল, ছবি না দিলেও চলবে। ফর্ম বিলি হয়েছে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায়। কিন্তু পূরণ করা হবে কোন ভাষায়? এই প্রশ্নে ভোটাররা এখনও ধন্দে। কারণ একেক অঞ্চলের বিএলও একেক রকম নিদান শুনিয়েছেন। সব মিলিয়ে এসআইআর এক ভয়াবহ যন্ত্রণার নাম এখন। এই যন্ত্রণা থেকে মানুষ যখন প্রাণপণে মুক্তি খুঁজছে, ঠিক তখন সামনে এল আর খবর—গণনা ফর্মে ভোটারের ভরা সব তথ্য উঠছে না সার্ভারে! কারণ, ‘বিএলও অ্যাপ’-এ যাবতীয় তথ্য আপলোড করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেনি কমিশন। আর তাই সমস্ত তথ্য না ভরেই ফর্ম ডিজিটাইজেশন করছেন বিএলওরা। ইআরও এবং এইআরওদের তরফে এমন নির্দেশই দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই গণনা ফর্মে ভোটারদের কাছে হাজারো তথ্য চাওয়া হল কেন? শোনা যাচ্ছে, সময় বাঁচাতেই এই কাণ্ড! সাধারণ মানুষকে কী পেয়েছে এই সরকার এবং কমিশন? তাদের কাজ, সময়, পয়সা এবং মানসিকতার কি কোনও মূল্য নেই? ভোগান্তির সমাপ্তি যে এখানেই নয়, তাও হলফ করে বলা যায়। নাগরিকদের বেশিরভাগের অতীত অভিজ্ঞতা বড়োই খারাপ। এখনও ঘরে ঘরে ভুল বানান এবং তথ্যে ভরপুর আধার ও ভোটার কার্ড (এপিক)। এমনকি একই ব্যক্তির আধার, এপিক এবং ভোটার তালিকায় অসংগতিও রয়েছে ভূরি ভূরি। নেতাদের নিত্যনতুন গদির ব্যবস্থা করার জন্য রামা কৈবর্ত, গফুর মিয়াঁদের আর কত দাম মেটাতে হবে? সত্যিই কেবল ফুটো পাত্রে জল ঢেলে চলেছে দেশ!