Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভোটাধিকার! প্রমাণ করো তুমি ভারতীয়

বিজন সাহা ছোটবেলাতেই বাবার হাত ধরে চলে এসেছিলেন বিহারে। আদি বাড়ি কৃষ্ণনগর। তারপর আর সেখানে ফিরে যাননি। সেই থেকে বিহারেরই এক মফস্‌স঩লের বাসিন্দা।

ভোটাধিকার! প্রমাণ করো তুমি ভারতীয়
  • ১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: বিজন সাহা ছোটবেলাতেই বাবার হাত ধরে চলে এসেছিলেন বিহারে। আদি বাড়ি কৃষ্ণনগর। তারপর আর সেখানে ফিরে যাননি। সেই থেকে বিহারেরই এক মফস্‌সলের বাসিন্দা। বাবা-মা গত হয়েছেন বহু বছর। এখন তিনি প্রায় ৪০। বিহারের ভোটার। আজকাল তিনি সরকারি দপ্তরের দরজায় দরজায় ছুটছেন। কারণ, তাঁর নাম ভোটার তালিকায় উঠেছিল ২০০৪ সালে। আর তিনি খবরে পড়েছেন, ২০০৩ সালের পর নাকি যাদের নাম তালিকায় উঠেছে, তাঁদের নতুন করে নিজেদের ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে হবে। আর এটাই এখন জ্বালা বিজনবাবুর। বাবা-মায়ের ভোট ছিল বাংলায়। তাঁর বিহারে। তাহলে কি তাঁকে বাবা-মায়ের বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্মের প্রমাণ জোগাড় করতে হবে? তেমন কিছু তো বিজনবাবুর কাছে নেই! তাহলে কি তাঁর নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যাবে? তিনি কি আর ভারতের নাগরিক থাকবেন না?

Advertisement

বড় বিপদে পড়েছে ঝুমা বাগদি। তিন কুলে কেউ নেই। ঝুড়ি বুনে, আর হাটে বেচে কোনওমতে পেট চলে। ওই হাটে বসেই শুনছিলেন লোকজনের মুখে... ভোটার কার্ড যারা দেয়, তারা নাকি বড়সড় কী একটা অভিযানে নামবে। বাড়ি বাড়ি যাবে। তার জন্য একটা ফর্ম ডাউনলোড করে রাখতে হবে তাঁকে। ফর্ম কী, ঝুমা বাগদি বোঝেন। কিন্তু ডাউনলোড? আবছা আবছা শোনা কথা বটে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। ঝুমা বাগদির বাড়িতে ইলেকট্রিক নেই। কোথায় গেলে ওই ফর্ম পাওয়া যাবে, সেটাও জানেন না। ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড নিয়ে গেলে কি ফর্ম দেবে? ওই ফর্ম না দিতে পারলে কি ওরা ভোটার কার্ড, আর আধার কার্ড কেড়ে নিয়ে যাবে? অসমের কথা শুনেছেন ঝুমা বাগদি। কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিটেছাড়া করা হয়েছিল। কীভাবে একটা গাদার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়েছিল দিনের পর দিন। কারণ, ওরা দেশের নাগরিক ছিল না। এবার তেমন কিছু হবে না তো? ভয় লাগছে ঝুমা বাগদির।
ইন্টেনসিভ রিভিশন। আপনি ভারতীয় কি না, তা নতুন করে যাচাইয়ের এটাই পোশাকি নাম। করছে কারা? নির্বাচন কমিশন। এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি তৈরির জন্য অসমে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল। কিন্তু গোটা দেশে তেমন কিছু নেই। অথচ, অমিত শাহ সেই কবে ঘোষণা করে রেখেছেন... দেশজুড়ে এনআরসি হবে। ‘ঘুসপেটিও কো নিকাল বাহার করেঙ্গে।’ কারা এই ‘ঘুসপেটিও’ বা অনুপ্রবেশকারী? যাঁর কাছে কাগজ নেই, তিনিই? কুঁড়েতে আগুন লেগে যে প্রৌঢ়ের সর্বস্ব ফুরিয়ে গিয়েছে, তিনি অনুপ্রবেশকারী? পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে যাঁকে মুর্শিদাবাদ থেকে মুম্বই গিয়ে বসত করতে হয়েছে, তিনি অনুপ্রবেশকারী? যাঁর নিজের বার্থ সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু প্রয়াত বাবার জন্মের কোনও কাগজই নেই... তিনি অনুপ্রবেশকারী? নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনামা এবং শাসকের আস্ফালন তেমনই ছিল। সোমবার অবশ্য কিছুটা ব্যাকফুটে গিয়ে কমিশন দাবি করেছে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ছিল, তাঁদের সন্তানদের আর বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে না। হওয়ারই ছিল। বিহারের ভোট যে বড় দায়। ভোটার সংখ্যা ৮ কোটি। ছাড় পেলেন ৪ কোটি ৯৬ লক্ষ। অর্থাৎ, পাহাড়প্রমাণ প্রক্রিয়া কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। আর এটাই নাকি দু’মাসে শেষ করে ফেলবে কমিশন! প্রত্যেকের বাড়ি গিয়ে, ফর্ম জমা নিয়ে, ডকুমেন্ট খতিয়ে দেখে এবং তা সার্ভারে আপলোড করে! তাজ্জব করার মতো কর্মদক্ষতা বটে। ২০০৩ সালে এই কাজই সারতে দু’বছর লেগেছিল। বিজেপির বিরোধীরা তাই এই কর্মদক্ষতায় বিশ্বাসী নয়। তারা প্রদীপের নীচে অন্ধকার খুঁজছে। বলছে, এই সব ধোঁকা। তলে তলে আসল ভোটার বাদ দেওয়ার ছক চলছে। বেছে বেছে বিরোধীদের ভোটব্যাঙ্কে ধস নামানো হবে। আর সেই জায়গায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে বহিরাগত সাজানো ভোটার। এবং বিহার আসল লক্ষ্য নয়... ওদের নিশানায় বাংলা। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আগামী বছরই।
অনুপ্রবেশকারী নিয়ে শাসকের একটা যুক্তি আছে। এই পুরো প্রবণতাটাই নাকি সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির। সীমান্তের রাজ্য বিদেশির এন্ট্রি পয়েন্ট হতে পারে, কিন্তু তারা সবাই যে এখানেই ঘাঁটি গেড়ে থেকে যাবে, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। নাগরিক সেজে থাকা বাংলাদেশি কি গুজরাতে মেলে না? নাকি নিপাট ভালো মানুষের মোড়কে ঢাকা পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী বিহারে থাকতে পারে না? দুটোই ঠিক। কিন্তু হাটের মাঝে এত লিবারাল তত্ত্বকথা নিয়ে এলে বাংলাকে চেপে ধরাটাই যে লাস্ট বেঞ্চে চলে যাবে! যেখানে সঙ্ঘ ইতিমধ্যেই রিপোর্ট দিয়ে রেখেছে যে, আসন্ন ভোটে কোনওমতেই বিজেপি ভালো কিছু খেল দেখাতে পারবে না। তৃণমূলের নেতারা বলছেন, গেরুয়া ব্রিগেড ৫০’এর নীচে নেমে যাবে। কিন্তু বিশ্বস্ত একটি সূত্রের খবর, অত ভালো ফলও আরএসএস আশা করছে না। আরও খান দশেক কমালে তাদের রিপোর্টের সঙ্গে মিলমিশ খেতে পারে। একটা প্রমাণ তারা করে দিয়েছে—কালীগঞ্জ। অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে কিন্তু সঙ্ঘ জানিয়ে দিয়েছিল, এই অঞ্চলের হিন্দু ভোটে ফাটল ধরেছে। বঙ্গ বিজেপি গা করেনি। পূর্বাভাস মিলে যাওয়ায় সঙ্ঘ নেতৃত্ব আরও তেতে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তারা সাফ জানিয়েছে, সঙ্ঘের ব্যাকগ্রাউন্ড লাগবে। কারণ, বঙ্গ বিজেপির হর্তাকর্তাদের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। এখনও বাংলায় সংগঠন এবং নেটওয়ার্ক যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা সঙ্ঘেরই। এখনও বেশ কিছু পকেটে সাধারণ মানুষের বৈঠকখানাতেও তাদের অবাধ যাতায়াত। ফলে বাংলার পালস তারা বোঝে। ‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই’ স্লোগান যে আদপে বাঁশঝাড় হয়ে দেখা দেবে, সেই আশঙ্কা তারা প্রকাশ করেছিল। এবং কালীগঞ্জে তা মিলেছে। উত্তরপ্রদেশে বা রাজস্থানে মেরুকরণের যে রাজনীতি চলে, তা বাংলায় ধোপে টিকবে না। এটা আরএসএস বুঝেছে, কিন্তু বিজেপি বোঝেনি। অন্তত দলবদলু মহামহিমরা তো নয়ই। তাতেই শিরে সংক্রান্তি। বিস্তর চাপে পড়েছে বিজেপি নেতৃত্বও। সঙ্ঘের জন্যই বিজেপি... এই ‘চিরন্তন সত্য’ এর মধ্যে ভালোরকম কুর্সি দখল করে বসে গিয়েছে। তাই তাকে অস্বীকার বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনও পথ মোদি সরকারের কাছে খোলা নেই। এই পরিস্থিতিতে বাংলায় মুখরক্ষা হবে কীভাবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, আসল ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা, রাজস্থানের লোকজনের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। ঠিক যেভাবে মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে তালিকায় বড়সড় একটা বদল হয়ে গিয়েছিল, সেভাবেই টার্গেট করা হবে বাংলাকে। মারাত্মক অভিযোগ। কারণ, এই অভিযোগ তিনি এবং আপামর বিরোধীকুল সরকারের বিরুদ্ধে করছে না! তোপ দাগছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। একটি স্বশাসিত সংস্থার বিরুদ্ধে। যাদের কাজই হচ্ছে নিরপেক্ষ থাকা, শাসক-বিরোধী ফারাক না করা এবং প্রত্যেক ভারতীয় যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারেন, তা সুনিশ্চিত করা। কিন্তু এখন তারাই নিশানায়। বিরোধীরা কমিশনকে শাসকের তাঁবেদার হিসেবে চিহ্নিত করছে। কারণ, ভোটার খোঁজার নামে তারা ‘সন্দেহভাজন’ নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দিতে নেমেছে। আর অবিশ্বাসের কাঠগড়ায় তাদের খাড়া করেছে শুধুমাত্র ভোটারের ‘কৌলিন্য নির্ধারণ’ করার পদ্ধতি। প্রশ্ন ওঠা কি অস্বাভাবিক যে, ২০০৩ সালে শেষবার ইন্টেনসিভ রিভিশনের সময়ও কি প্রত্যেক ভোটারকে তাঁর বাবা-মায়ের জন্ম শংসাপত্র জমা দিতে হয়েছিল? তাহলে এবার কেন? অসমে এনআরসির সময় দেখা গিয়েছে, যে নথি দেখিয়ে একজন বাসিন্দা নাগরিকত্বের স্বস্তি পেয়েছেন, ঠিক একই নথি ‘ডিসকোয়ালিফাই’ করে দিয়েছে অন্য নাগরিককে। কর্তার ইচ্ছায় নাগরিকত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ যদি ঠিক হয়, তাহলে একইভাবে বাংলার বহু নাগরিক আচমকাই বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারী হয়ে যাবেন। বহিরাগতরা সেই জায়গা নেবে এবং ভোটে তার প্রভাব পড়বে। সঙ্ঘকেও দেখানো যাবে, ভাগ্য বদলাতে আমরা পারি। অন্তত গত বিধানসভা নির্বাচনের মতো আসন সেক্ষেত্রে ধরে রাখতে সক্ষম হবে বিজেপি। কিন্তু যে মানুষগুলোর নাগরিকত্ব হঠাৎ কেড়ে নেওয়া হবে, তারা কোথায় যাবে? কী হবে তাদের? স্কুলছাড়া করা হবে সেই ‘অ-নাগরিকদের’ সন্তানকে? বাসস্থানের অধিকার হারাবে তারা? কোথায় জায়গা হবে তাদের? ডিটেনশন ক্যাম্পে? তারপর পুশব্যাক? এটাই তো এনআরসির প্রক্রিয়া! নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, নাগরিকত্বের রেফারেন্স ডেট হবে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই। অর্থাৎ, তার আগে যারা ভারতে ছিলেন, তাঁরাই ভারতীয়। এই নাগরিকদের শুধু নাগরিকত্বের নথি দেখাতে হবে, আর ঘোষণাপত্র দিতে হবে। কেজো ভাষায় যাকে বলে মুচলেকা। কিন্তু তারপর যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে? ২০০৩ সালের পর যাঁরা ভোটার হয়েছেন? বাংলায় নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়া মাত্র তাঁরা আর ‘নাগরিক থাকবেন না’। তাঁদের উঠিয়ে দেওয়া হবে অনিশ্চয়তার এক রোলার কোস্টারে। বলা হবে, নাগরিকত্ব প্রমাণ করো। নিজের। তোমার বাবার। তোমার মায়ের। না হলে? বিজ্ঞপ্তিতে সেটা নেই। থাকবে না। কারণ, তখন ‘অ-নাগরিক’দের ভাগ্যবিধাতা হয়ে দেখা দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। যে এনআরসি সরাসরি করতে গেলে বিক্ষোভের আগ্নেয়গিরিতে চেপে বসতে হবে নরেন্দ্র মোদিকে, সেটাই হেলায় করে দেবে নির্বাচন কমিশন। এখন না হয় এনআরসি নাম থাকল না। তাতে কী আসে যায়?
ভারতবাসীর ধৈর্য অসীম। শাসকের নীতি, দুর্নীতি, অবক্ষয়, পরিষেবায় ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব... সবই তারা মুখ বুজে সহ্য করে। ইতিহাস সাক্ষী, কখনও ৩০০ বছর... কখনও বা ২০০ বছর। কখনও জল মাথা ছুঁতে চায়। তখন আর এই ভারত চুপ করে বসে থাকে না। ধৈর্যের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে তারা। ‘লাগে রহো মুন্নাভাই’ ছবিতে একটা ডায়লগ ছিল, ‘দুটো গালেই চড় খেয়ে যাওয়ার পর কী করতে হবে, সেটা কিন্তু বাপু বলে যাননি।’ দু’গালে চড় খেয়ে যাওয়ার পর আপামর ভারতবাসীও বসে থাকবে না। সেটা আশা করি সব শাসকই বোঝে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ