শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: রেফারি সেন্থিল শেষ বাঁশি বাজাতেই আকাশের দিকে চেয়ে মুখ ঢাকলেন হোসে মোলিনা। দু’হাত পাগলের মতো ঝাঁকালেন তিনি। কালো টি-শার্ট ঘামে লেপ্টে রয়েছে শরীরে। তবু ভ্রুক্ষেপ নেই। রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে বাকিরা ততক্ষণে একদৌড়ে মাঠে। চলল একে অন্যকে জড়িয়ে ধরার পালা। মাঠেই নাচতে থাকলেন আলবার্তোরা। কামিন্স-পেত্রাতোসকে দেখা গেল আলিঙ্গনাবদ্ধ। গ্যালারিতে তখন চলছে উদ্দাম লাফালাফি। সেই উৎসবেই মিশে গেলেন মোলিনা। মোহন বাগানের রাশভারী কোচকে এভাবে আবেগে ভাসতে আগে দেখেনি কেউ। পেরেছেন, তিনি পেরেছেন। লিগ-শিল্ডের পর আইএসএল কাপও মোহন বাগানের পকেটে। যুবভারতীতে ‘ডাবল’ পালতোলা নৌকোর স্বপ্নপূরণের রাত। ভারতসেরা মোহন বাগান সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইএসএল ফাইনাল হোমটিমের ভাগ্যে নেই— আতঙ্কের সেই মিথও ভেঙে চুরমার এদিন। নয়া ইতিহাস লিখল মোহন বাগান। অশ্বমেধের ঘোড়া থামায় কার সাধ্য? কামিংসদের ছোঁয়া স্রেফ মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়। এই দল ভারতীয় ফুটবলে সর্বকালের সেরা কি না তা নিয়ে প্রবল চর্চাও শুরু যুবভারতীতে।
৯০ মিনিটে ম্যাচটা শেষ করতে চেয়েছিলেন সবুজ-মেরুন হেডস্যার। তা না হওয়ায় মাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। টেনশন, চাপ, ক্লান্তি কাটিয়ে অবশেষে যুদ্ধজয়। থিতু হতে কিছুটা সময় তো লাগেই। বেশ কিছুক্ষণ পর সাংবাদিক সম্মেলনে এলেন হোসে মোলিনা। স্প্যানিশ কোচের মন্তব্য, ‘সব কৃতিত্ব ফুটবলারদের। প্রতিপক্ষ হিসেবে বেঙ্গালুরু দারুণ শক্তিশালী। পিছিয়ে পড়ার পর কামব্যাক সত্যিই কঠিন ছিল। কখনও ভুলব না এই রাত। ম্যাচে পিছিয়ে পড়লেও কখনও বিশ্বাস হারাইনি। জানতাম, ছেলেরা কামব্যাক করবে। এই জয় অবিশ্বাস্য।’ সত্যিই যুবভারতী যেন উজাড় করে দিয়েছে মোলিনাকে। আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের পরিবর্তে দলের দায়িত্ব নেন তিনি। জাঁদরেল কোচের জুতোয় পা গলানো বড় চ্যালেঞ্জ। সব ছাপিয়ে মোলিনা দেখিয়ে দিলেন ‘হি ইজ দ্য বস’। তাঁর কোচিংয়ে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল যুবভারতীতে। ডাবল জেতানোর রাতে আগামী মরশুমেও মোহন বাগানে থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত করে গেলেন স্প্যানিশ কোচ।
নাচ, গান, উৎসব। অনেক রাতেও স্টেডিয়ামের সামনে উৎসব চলছিল সমর্থকদের। দ্রিম-দ্রিম বাজনার আওয়াজে কান পাতা দায়। সেদিকে তাকিয়ে বিহ্বল দিমিত্রি, লিস্টনরা। অজি তারকার মন্তব্য, ‘এই জয় সমর্থকদের উৎসর্গ করছি।’ স্কটিশ গ্রেগ স্টুয়ার্ট কখনও আইএসএল কাপ জেতেননি। এদিন তাঁরও আক্ষেপ মিটল। হাসতে হাসতে স্টুয়ার্টের মন্তব্য, ‘দেখুন, হাজার হাজার সমর্থক আনন্দ করছে। ফুটবলার হিসাবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কী-ই বা হতে পারে!’ ১৫টি ক্লিনশিটে আরও একবার টুর্নামেন্টের গোল্ডেন গ্লাভ জিতলেন বিশাল কাইথ। বাগানের দুর্গপ্রহরীর কথায়, ‘গতবার ফাইনালে হেরে যে স্বপ্ন অধরা ছিল, আজ তা পূরণ হল।’ কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বলে গেলেন, ‘অসাধারণ ফুটবল খেলেছে ছেলেরা। সবাইকে অভিনন্দন।’ আগামী কয়েকদিন কলকাতার রং শুধুই সবুজ-মেরুন।