সোমনাথ বসু, কলকাতা: ‘মাটির টানে বুক চিতিয়ে ভয়কে করি জয়/ দেশের তরে লড়াই যখন— ইস্ট বেঙ্গলই নির্ভয়’— বুধবার সন্ধ্যায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে এই টিফোর ঠিক পিছনে গর্বের সঙ্গে জাতীয় পতাকা হাতে দেখা গেল হাজার হাজার ইস্ট বেঙ্গল সমর্থককে। স্বাধীনতা দিবসের আগে সন্দীপ মান্ডি-আনোয়ার-গিলদের বড়ো ব্যবধানে জয় নিশ্চয়ই ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। কুয়েতের আল আরবিকে চূর্ণ করে দেশের সম্মানও বাড়াল লেসলি ক্লডিয়াস সরণির ক্লাবটি। বিদেশি ক্লাবের বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গলের লড়াই বারবার ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। বিদেশের মাটি থেকে ৫টি ট্রফি জয়ের নজির ভারতের অন্য কোনো ক্লাবের নেই।
অতীতে ফিরে তাকালে লাল-হলুদ ব্রিগেডের উজ্জ্বল পারফরম্যান্স সত্যিই আপনাকে মুগ্ধ করবে। ইরানের পাস ক্লাব, মালয়েশিয়ার সেলেঙ্গার, উত্তর কোরিয়ার ডক রো গ্যাং, ইরাকের আল জাওরা, থাইল্যান্ডের বেক তেরো সাসানা সেই তালিকার কয়েকটি পাতা মাত্র। কিন্তু দেশের সম্মান বাড়ালেও ইস্ট বেঙ্গল এখন ইনভেস্টরহীন। গত মরশুমে আইএসএল জিতলেও কোনো সংস্থা এখনও পর্যন্ত সহযোগিতার হাত তাদের দিকে বাড়িয়ে দেয়নি। রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন ক্লাব কর্তারা। তখন ইনভেস্টর জোগাড় করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারও দেশের অন্যতম ঐতিহ্যমণ্ডিত ক্লাবের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ। তাই ইমামির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর গভীর আর্থিক সমস্যায় ইস্ট বেঙ্গল। ক্লাব কর্তারা ইনভেস্টর আনার জন্য দিনরাত এক করে ফেললেও লাভের লাভ কিছু হয়নি।
‘হর ঘর তিরঙ্গা’ প্রকল্প নিয়ে বিজেপি সক্রিয়। কিন্তু যে ক্লাব জাতীয় পতাকার সম্মান বাড়ায় তারাই আজ অসহায়। গত মরশুমের পেমেন্ট বকেয়া থাকায় ইতিমধ্যেই তিন-চারজন ফুটবলার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া এই মরশুমের দল গড়ার জন্য অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তারা। সিনিয়র ও মহিলা দল এএফসি খেলছে। পাশাপাশি কলকাতা লিগ, যুব দল চালাতেও বিপুল খরচ। অথচ ফুটবলে টাকা ঢালার লোকের অভাব। এটাই কঠিন বাস্তব। ফেডারেশন কর্তারা এই ব্যাপারে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র।
আগামী ৩ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলবে ভারত। সাম্বার দেশের বিরুদ্ধে ব্লু টাইগার্সের ম্যাচ ঘিরে প্রচারের ঢক্কানিনাদ চলছে। শোনা যাচ্ছে, খরচ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। অথচ অর্থের অভাবে ভারতীয় ফুটবল ক্রমশ পিছচ্ছে। ঘটনাক্রমে, বৃহস্পতিবারই ময়দানের ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে পালিত হল স্পোর্টস ডে। ক্লাবের প্রাণপুরুষ প্রয়াত পল্টু দাসের ৮৭ তম জন্মদিনে ঢালাও কর্মসূচি। প্রাক্তন ফুটবলার তথা এশিয়ার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার সুধীর কর্মকার ও পল্টু দাসের নামাঙ্কৃত প্লেয়ার্স বক্স ও প্রেসিডেন্সিয়াল বক্সের উদ্বোধন হয়। ক্লাব তাঁবুতে দাঁড়িয়ে ফেডারেশনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম আইকন বাইচুং ভুটিয়া। তাঁর বক্তব্য, ‘কল্যাণ চৌবেরা সরকারকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। জামশেদপুর এফসি’র মতো দল উৎসাহ হারিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে নিল। আইএসএল চ্যাম্পিয়ন ইস্ট বেঙ্গলেও ইনভেস্টর নেই। সেখানে ৫০ কোটি টাকা খরচ করে ব্রাজিলকে আনা স্রেফ গিমিক ছাড়া কিছুই নয়।’ বাইচুং সঠিক জায়গায় তির ছুড়েছেন। চাকচিক্য ও গ্ল্যামারের প্রলেপ সরালেই হতাশার আস্তরণ বেরিয়ে পড়বে। সাফল্যের রোশনাই সেই আঁধার দূর করতে ব্যর্থ।