Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অত্যন্ত সংগত অবস্থান

ভয়ানক গোঁসা হয়েছে আমেরিকার। দেশটি সারা পৃথিবীর স্বঘোষিত মাতব্বর। পাশের দেশ পাকিস্তান মার্কিন সাহেবদের পদলেহন করেই আট দশক যাবৎ ‘সুখে’ আছে।

অত্যন্ত সংগত অবস্থান
  • ৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভয়ানক গোঁসা হয়েছে আমেরিকার। দেশটি সারা পৃথিবীর স্বঘোষিত মাতব্বর। পাশের দেশ পাকিস্তান মার্কিন সাহেবদের পদলেহন করেই আট দশক যাবৎ ‘সুখে’ আছে। অথচ কিছুতেই কথা শুনছে না ভারত। বারবার বারণ, এমনকী সাবধান করা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। রাশিয়া থেকে তেল কিনেই চলেছে মোদি সরকার। আর তাতে ট্রাম্প সাহেব এমন চটেছেন যে, ভারতের উপর শুল্কের বোঝা পরের পর বাড়িয়েই চলেছে তাঁর প্রশাসন। সোমবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলে নতুন করে শুল্কবৃদ্ধির হুমকি দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অতঃপর ভারতীয় পণ্যে ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প তার আগে জানান, রাশিয়া থেকে কেনা তেল খোলাবাজারে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটছে ভারত। এজন্যই তাঁর এই ‘শাস্তিমূলক’ সিদ্ধান্ত! এমনকী, মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে আরও একধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের উপর আরও চড়া হারে শুল্ক চাপাব।’ মার্কিন মতলব পরিষ্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতকে বড়সড় বেকায়দায় ফেলা। 

Advertisement

ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুলে যাচ্ছেন, ভারত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ১০০ কোটি ভোটারের দ্বারা নির্বাচিত ভারত সরকার পরিচালিত হয় এদেশের মানুষের মতামত নিয়ে এবং তাদের স্বার্থে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র কোনও নিম্ন শ্রেণির চাটুকার মুনিরের মর্জিতে চলে না। ভারত তার নিজের ভালোমন্দ খুব ভালো জানে। তার চলার পথে কোনও ধান্দাবাজ বেনিয়া বন্ধুর অযাচিত পরামর্শ নিষ্প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই এই ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় যেকোনও পদক্ষেপ করতে দ্বিধা করবে না ভারত। এই প্রসঙ্গে নয়াদিল্লি মনে করিয়ে দিয়েছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক বেশি অঙ্কের বাণিজ্য করেছে রাশিয়ার সঙ্গে। তারপরেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে কেবল ভারতকেই! এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াও ভারতের পক্ষ নিয়ে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতি দিয়েছে। তাতে পুতিন প্রশাসন আমেরিকার নিন্দাসহ পাল্টা হুঁশিয়ারই করেছে, শুল্ক চাপিয়ে ইতিহাসের মোড় ঘোরাতে পারবেন না ট্রাম্প! 
আমেরিকার ‘পিরিতি’ ভারত এই প্রথম দেখছে না। সাগরপারের দেশটি বরাবরই শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক মানবিক শক্তির বিরুদ্ধে। একাত্তরে পূর্ববঙ্গে এবং ভিয়েতনামসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তেই তারা এর প্রমাণ রেখেছে। তাই আমেরিকা সম্পর্কে ভারতের সতর্ক থাকা দরকার সর্বক্ষণ। ভারতের আজকের কড়া অবস্থান অত্যন্ত সংগত। তবে ‘অপারেশন সিন্দুর’ বিরতি প্রসঙ্গেও তা থাকা উচিত ছিল। ভারত নয়, একতরফা যুদ্ধবিরতির আর্জি জানিয়েছিল পর্যুদস্ত পাকিস্তান। ১০ মে, ২০২৫ পাকিস্তানের ডিজিএমও ভারতের ডিজিএমও’কে ফোনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন। ভারত বরাবর শান্তির পক্ষে। কিন্তু পাকিস্তানের লাগাতার বাঁদরামি ভারতকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। ফলত, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে কড়া প্রতিক্রিয়া সময়মতো জানাতেই হয়। অপারেশন সিন্দুর তেমনই একটি ঘটনা। পাক সেনাকর্তার প্রস্তাবে ১০ মে ভারত সাড়া দেয় এবং যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়।‌ তাতে ভালোই হয়েছে। কারণ যুদ্ধে কোনও পক্ষেরই চূড়ান্ত জয় হয় না। সে হিটলার, মুসোলিনি থেকে হাল আমলের নেতানিয়াহু, ট্রাম্প, পুতিন পর্যন্ত সকলেরই অভিন্ন অভিজ্ঞতা। যুদ্ধে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কতখানি হয় তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানে। যুদ্ধ কখনোই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে অবশ্য‌ মোদি সরকারের দাবি, আমাদের ‘ডিসিসিভ ভিক্ট্রি’ বা ‘নির্ণায়ক জয়’ হয়েছে। তাহলে আমরা কেন পরাজিত চিরশত্রুকে নিঃশর্তে রেহাই দিলাম? কেন উপযুক্ত কিছু আদায় করে নেওয়া হল না? এর পিছনে কার বা কাদের চাপ ছিল? এই প্রশ্ন উঠবেই। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারত বা পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার আগেই ট্রাম্প তার ঘোষণা করে বসেন। তারপর থেকে একাধিকবার তাঁকে দাবি করতে শোনা গিয়েছে যে, “আমিই যুদ্ধ থামিয়েছি!” এহেন যুদ্ধবিরতিতে নাকি ‘বাণিজ্য’ বিষয়ক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধবিরতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় পাকিস্তান উদ্বাহু হয়ে ‘সিলমোহর’ দিলেও ভারত প্রথম থেকেই বলে এসেছে, এই প্রসঙ্গে একমাত্র পাকিস্তানের সঙ্গেই আলোচনা হয়েছে। তৃতীয় কোনও পক্ষের ন্যূনতম ভূমিকাও ছিল না। কিন্তু ট্রাম্প যে আগ বাড়িয়ে অসত্য দাবি করে চলেছেন, অসত্য ভাষণ দিচ্ছেন এই সত্যটা কেন মোদি বা জয়শঙ্করের বলার হিম্মত হল না? এই প্রশ্ন ও আক্ষেপ ভারতবাসী কিন্তু রয়েই গেল। ভারত এটাও পরিষ্কার করে জানাক, শুল্কযুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকারও বড় ক্ষতি হবে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সে-দেশের গরিব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ