Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া

আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হচ্ছে জিএসটির সংশোধিত হার। গত ৩ তারিখ জিএসটি কাউন্সিলের ৫৬তম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া
  • ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হচ্ছে জিএসটির সংশোধিত হার। গত ৩ তারিখ জিএসটি কাউন্সিলের ৫৬তম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার আগে স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘নেক্সট জেনারেশন জিএসটি রিফর্মস’ এবং এই বিষয়ক বড়ো ঘোষণার ইঙ্গিত দেন। তাঁর দাবি ছিল, এটাই ভারতবাসীর জন্য এবারের ‘দীপাবলির উপহার’। প্রতিটি নাগরিকের যাপনচিত্র সুন্দর করে তোলাই হবে এই সংস্কারের লক্ষ্য। সরকারের ঘোষণা অনুসারে, জিএসটির হার পরিবর্তনে অগ্রাধিকার পেয়েছে সাধারণ নাগরিক, শ্রমনিবিড় শিল্পগুলি, কৃষক ও কৃষি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্র প্রভৃতি। সোজা কথায়, অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে স্বীকৃত সমস্ত ক্ষেত্রের ধারাবাহিক অগ্রগতিকেই গুরুত্ব দিয়েছে এই কর-সংস্কার উদ্যোগ। জিএসটি ব্যবস্থা এতদিন বেশ জটিল ছিল। এবার তা অনেকটাই সরল করা হল। জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি শূন্য। আটা থেকে পাউরুটি, পনির থেকে ছোলা—নিত্যব্যবহার্য বহু খাদ্যকে জিএসটি শূন্য করা হচ্ছে। অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবা আসবে নতুন তিনটিমাত্র স্ল্যাবের আওতায়—৫, ১৮ ও ৪০ শতাংশ। সাধারণের ব্যবহার্য পণ্য ও পরিষেবাগুলি থেকে ৫ এবং ১২ শতাংশ হারে জিএসটি নেওয়া হবে। আরও আশা জাগানো হয়েছিল যে, পুজোর মুখেই দাম কমতে পারে টেক্সটাইল এবং রেডিমেড গার্মেন্টস, জুতোসহ অর্থনীতির আটটি কোর সেক্টরে উৎপন্ন জিনিসপত্রের। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেন যে, ৫ ও ১৮ শতাংশের স্ল্যাব দুটি থাকলেও বিলাসদ্রব্য, তামাক, ৫০ লক্ষ টাকার বেশি দামের গাড়িসহ বেশকিছু পণ্যের উপর জারি থাকবে ৪০ শতাংশ কর, যাকে বলা হয় ‘সিন ট্যাক্স’। ১৭৫টির মতো পণ্যের দামে বড়োসড়ো রেহাই মিলতে চলেছে। দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দামের জুতো ও রেডিমেড পোশাক একটু সস্তা হবে। কিন্তু তার বেশি দামের পণ্যের ঘাড়ে চাপবে বাড়তি জিএসটি। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য রেহাই দেওয়া হয়েছে। কমে যাচ্ছে ৩৩টি জীবনদায়ী ওষুধের দাম। এই সূত্রে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কমতে পারে। সর্বাধিক আকাঙ্ক্ষার জায়গাটি ছিল স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমা। এই দুই ধরনের বিমার প্রিমিয়ামের ঘাড় থেকে জিএসটি পুরো নামিয়ে দেওয়া হল। এসি, ফ্রিজ, মোবাইল, ল্যাপটপের দামও এবার এসে যাচ্ছে সাধারণের সাধ্যের ভিতরে। মনে রাখতে হবে, এসব পণ্যকে এখন বিলাসদ্রব্য হিসেবে গণ্য করার কোনও কারণ আর নেই। 

Advertisement

মোদি সরকারের এই বিলম্বিত বোধোদয়কে আম পাবলিক স্বাগতই জানিয়েছিল। একইসঙ্গে সবার মনে একটা ফুটনোটও অবশ্য ছিল—‘‘সরকারের ঘোষণার আড়ালে কোনও চাতুরি না-থাকলে তবেই এর সুফল আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।’’ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতরা সরকারকে নানা উপলক্ষ্যে পরামর্শও দিয়েছেন। কিন্তু আটবছরেও সরকার উচ্চবাচ্য করেনি। এই প্রস্তাব আগে মেনে নিলে গরিব মানুষ অনেক বেশি সুরাহা পেত। তাদের কষ্টের বারোমাস্যা হতে পারত একটু সহনীয়। বৃদ্ধি পেত জিডিপি, সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়, এবং অবশ্যই কমত ব্যক্তিগত ঋণ। কিন্তু এই মন্দের ভালোও কি শেষমেশ সবার হবে, ২২ তারিখ যত নিকটে আসছে তত চওড়া হচ্ছে আশঙ্কা। উঠেছে একাধিক প্রশ্ন: ঘোষিত সুবিধাগুলি ক্রেতা বা উপভোক্তাদের কাছে আদৌ পৌঁছাবে তো? কী হবে পুরোনো জিনিসের দাম? আগে প্রস্তুত পণ্যগুলি ঠিক কোন দামে বিক্রি হবে এবার? জিএসটি হ্রাসের সুবিধা মিলল কি না, সেটাই-বা কীভাবে বুঝবেন তাঁরা? এই ব্যাপারে কেন্দ্রের ক্রেতাসুরক্ষা দপ্তর বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও ধোঁয়াশা মোটেই কাটেনি। দেশবাসীর মনে আছে, মাসখানেক আগে নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে রিজার্ভ ব্যাংক দাবি করেছিল, মূল্যবৃদ্ধির হার কমতে কমতে এখন আটবছরে সর্বনিম্ন। বলা বাহুল্য, এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য আম জনতার অভিজ্ঞতার কোনও মিল নেই। সাধারণ রীতি হল, মূল্যবৃদ্ধির হার কমার আভাস পেলে রিজার্ভ ব্যাংক রেপো রেটে কমায়। গত ১২ আগস্ট নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু সেই পথে হাঁটেনি। 
কেন? নিত্যপণ্য ফের অগ্নিমূল্য হওয়ার আঁচ কি ছিল তাদের কাছে? হল ঠিক সেটাই। এবার কেন্দ্রেরই পাইকারি পণ্যসূচকের রিপোর্টে প্রকাশ, গতমাস থেকে খাদ্য-বস্ত্রসহ একঝাঁক সাধারণ পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি রিপোর্ট প্রকাশের দিনকয়েক পরই কার্যকর হতে যাচ্ছে নয়া হারে জিএসটি। অর্থাৎ দেশবাসীর আশায় জলই ঢালল কেন্দ্রীয় রিপোর্ট। আর এই দুঃসংবাদ উৎসবের মরশুমেই। এত ঢাক ঢোল পিটিয়ে যে জিএসটি সংস্কার, তাকে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার সুযোগ কই? মোদি সরকারের কড়া নজরদারি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে না কি?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ