Bartaman Logo
২৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ভ্যানিশ কালির গোয়েন্দাগিরি

ভ্যানিশ কালির গোয়েন্দাগিরি
  • ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সাদা পাতায় লেখা হবে, কিন্তু সবাই পড়তে পারবে না! গোয়েন্দাগিরির সেই গল্পই শোনাল সায়নদীপ ঘোষ

Advertisement

কালি দিয়ে কাগজে লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেটা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না! বিশেষ কোনও আলো বা বস্তুর সংস্পর্শে এলে তবেই সেই লেখা পড়া যাবে। ঠিক যেন অদৃশ্য কালি। ব্যোমকেশের গল্পে এই ভ্যানিশ কালির উল্লেখ রয়েছে। পেঁয়াজের রস দিয়ে চিঠি লিখছেন রামেশ্বর রায়। তাঁর মৃত্যুর পর সেই চিঠিই হয়ে উঠছে উইল।‌ অথচ, আলোর কাছে না আনা পর্যন্ত সেটা নিছক সাদা কাগজ। এ তো গেল গল্পের কথা। বাস্তবেও এমন ঘটনা ঘটেছে! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এভাবেই গোপন সংকেত পাঠাতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়েছিলেন এক জার্মান গুপ্তচর। সম্প্রতি লন্ডনের ন্যাশনাল আর্কাইভসে প্রথমবার এক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫। সেখানে তুলোয় মোড়া একটি কালো লেবু রাখা ছিল। এই লেবু কোনও সাধারণ লেবু নয়। এর মাধ্যমেই এক গুপ্তচরের কীর্তি ফাঁস করেছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা।
১৯১৫ সালের ১০ জানুয়ারি। ব্রিটেনের পূর্ব ইয়র্কশায়ারে পৌঁছলেন কার্ল মুলার। সঙ্গে ভুয়ো নথি। মোটা গোঁফ। দেখলে মনে হবে যেন বেলজিয়ামের শরণার্থী। সঙ্গে ছিল রুশ পাসপোর্ট। চেহারা দেখলে সন্দেহ হওয়ার কোনও অবকাশ নেই। সহজেই আশ্রয় পেয়ে গেলেন মুলার। নিজেকে রুশ জাহাজ ব্যবসায়ী হিসেবে দেখিয়েছিলেন তিনি। সেটা অবশ্য আসল কাজ ছিল না। গোপনে ব্রিটিশ সেনা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পাচার করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কীভাবে সেই তথ্য জার্মানদের হাতে পাঠানো হবে? এর জন্য এক অভিনব উপায় আবিষ্কার করলেন মুলার। একটা লেবুকে দু’টুকরো করলেন প্রথমে। তারপর সেই লেবুর রস দিয়ে চিঠি লিখলেন। সামনে থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না। কিন্তু গরম লোহার সংস্পর্শে এলেই ফুটে উঠবে অক্ষর। এভাবেই দিনের পর দিন সাধারণ চিঠির সঙ্গে গোপন তথ্য পাঠাতে থাকলেন মুলার। ‘এল কোহেন’ ছদ্মনামে চিঠি পাঠাতেন তিনি। তবে সবকিছু তো আর চিরকাল চলতে পারে না। শত্রুপক্ষের গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়ে আগে থেকেই অবগত ছিল ব্রিটেনের পোস্টাল সেন্সরশিপ অফিস। একদিন রটারডাম পোস্ট অফিসের উদ্দেশে পাঠানো একটি সন্দেহজনক চিঠি তাদের হাতে এল। কাগজটা পরীক্ষা করতেই চমকে গেলেন সকলে। এপসম অঞ্চলে সেনার মহড়া সংক্রান্ত তথ্য ফুটে উঠল সাদা কাগজের উপর। সঙ্গে ছিল দক্ষিণ প্রান্তে থাকা বিভিন্ন বন্দরে সেনার গতিবিধির তথ্য। সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়লেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁরা জন হ্যান নামে এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করলেন। বেকারির আড়ালে মুলারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন জন। প্রমাণের জন্য তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হল। সেখানে লেবু তো পাওয়াই গেল। লেবুতে কলমের দাগ স্পষ্ট। সঙ্গে ব্লটিং পেপার। জনকে জেরা করতেই মুলারের খোঁজ মিলল। ব্লুমসবারির একটি লজে লুকিয়ে বসেছিলেন ওই জার্মান গুপ্তচর। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তাঁকে ধরে ফেললেন গোয়েন্দারা। মুলারের কোটের পকেটে একটি আস্ত লেবু ছিল। ঘরের আলমারিতে তুলোর মধ্যে রাখা ছিল কয়েকটি লেবুর টুকরো। জেরায় মুলার বলেছিলেন, ‘দাঁত পরিষ্কার করার জন্য লেবু সঙ্গে রেখেছি।’ সেই কথা অবশ্য গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেননি। তাঁরা জানতেন যে, এভাবেই গোপন তথ্য পাচার করতেন মুলার। জার্মান গুপ্তচরের কলমের ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্ট সবকিছু যাবতীয় সন্দেহ দূর করল। কারণ কলমের ডগায় লেবুর রস ছিল। ১৯১৫ সালের জুন মাসে সেন্ট্রাল ক্রিমিনাল কোর্টে (ওল্ড বেইলি) মুলার ও জনের বিচার হয়।‌ দু’জনকেই দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারক। জনের সাত বছর জেল হয়। মুলারের ফাঁসি হয়। ২৩ জুন টাওয়ার অব সাইলেন্সে শেষ হয়ে যায় মুলারের জীবনযাত্রা।
গল্পটা এখানেই শেষ হল না। মুলারের মৃত্যুর খবর কাকপক্ষীতে টের পেল না। এবার তাঁর নাম করে চিঠি লিখে বেলজিয়ামে পাঠাত ব্রিটিশ গোয়েন্দা। অবশ্যই ভুল তথ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে বিপথে পরিচালিত করা হতো। কিন্তু, লেবুর রসে লেখা চিঠি দেখে জার্মানরা বিশ্বাস করত যে, তাদের এজেন্ট কাজ করে চলেছে। সেইমতো মোটা টাকা পাঠাতে থাকল হিটলারের দেশ। পরে সেই টাকা দিয়ে একটি মরিস গাড়িও কিনেছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। গাড়ির পোশাকি নাম দেওয়া হয়— ‘মুলার’। লন্ডনে নজরদারি চালানোর জন্য এই মরিস গাড়িটি চড়েই ঘুরতেন ব্রিটিশ এজেন্টরা। এভাবেই তথ্য পাচারের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছিল একটি সাধারণ লেবু।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ