Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘টু ফ্রন্ট ওয়ার’

পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা নিয়ে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। আফগান বিদেশমন্ত্রক এই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছিল, এমন হামলা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে।

‘টু ফ্রন্ট ওয়ার’
  • ১১ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা নিয়ে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। আফগান বিদেশমন্ত্রক এই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছিল, এমন হামলা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। কারও বুঝতে অসুবিধে হয়নি, পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকেই দোষারোপ করেছিল কাবুল। কারণ, হামলাকারীদের মদতদাতা যে পাকিস্তান, তা কারও অজানা নয়। তবে এবারই প্রথম নয়, তালিবান ও তাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার বহু ইঙ্গিত মিলেছে। গত বছরের শেষ নাগাদ এই সম্পর্ক এতটাই খারাপ পর্যায়ে গিয়েছিল যে, দুই পক্ষের উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের আফগানিস্তান–বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মহম্মদ সাদিক খানকে তালিবান নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাবুলে যেতে হয়েছিল। যদিও এরপর সংঘাত কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। অথচ, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বহু বছর ধরে এই তালিবানকে গড়ে তুলেছিল। তাদের আশ্রয় দিয়েছে, অস্ত্র ও অর্থ দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে। একসময় আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য তালিবানকে যেমন খুশি ব্যবহার করত পাকিস্তান। এই পাকিস্তানই মার্কিন সেনাবাহিনী ও আগের আফগান সরকারকে উৎখাত করতে তালিবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্ককে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা দিয়ে এসেছে। তারই জেরে ২০২১ সালের আগস্টে তালিবান কাবুল দখল করলে পাকিস্তান প্রকাশ্যেই উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান তাদের পুরনো মিত্র তালিবানের উপর আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাওয়ার পিছনে রয়েছে পুরনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব। একসময় আফগানিস্তানকে কৌশলগত সম্পদ মনে করত পাকিস্তান। এখন সেটাই হয়ে উঠেছে ভয়াবহ বোঝা। বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের মতো গোষ্ঠীগুলি আফগানিস্তানের মাটিতেই প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাচ্ছে বলে ইসলামাবাদ রাষ্ট্রসঙ্ঘেও নালিশ ঠুকেছে।

Advertisement

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কট্টর ইসলামিক চিন্তাধারার মানুষ, যিনি আফগান সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন যেন তারা তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে বেশি গুরুত্ব না দেয়। বরং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের পুরনো বন্ধুত্বের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন, চাপ সৃষ্টি করে বা কূটনীতির মাধ্যমে কথা বলে— কোনওভাবেই তারা আর তালিবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তাই পাক সেনাপ্রধান এখন বলা শুরু করেছেন, পাকিস্তানের একজন মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে গোটা আফগানিস্তানকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, তাতে পাকিস্তানের কিছু আসে–যায় না। ফলে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন একধরনের কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে এই উত্তেজনা শুধু সীমান্ত পার হওয়া জঙ্গি হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে জমি নিয়ে বিরোধ আর জাতীয় পরিচয় ঘিরে সংঘাত। আফগান তালিবান যদি টিটিপিকে সমর্থন দিয়ে চলে, আর ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে আফগানিস্তান একসময় পাকিস্তানের ভূখণ্ড দাবি করে বসবে— এই আতঙ্ক কিছুতেই ইসলামাবাদের পিছু ছাড়ছে না। আতঙ্ক বাড়ার আরও এক কারণ অবশ্যই নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সাফল্য!
২০২১ সালে ভারত যখন আফগানিস্তান থেকে তাদের কূটনীতিকদের সরিয়ে নিয়েছিল, তখন খুব কম বিশেষজ্ঞই ভেবেছিলেন, তালিবান কাবুলের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক কখনও আবার চালু হবে। এমনকী ২০২২ সালে কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের কূটনৈতিক কাজকর্ম আবার শুরু হলেও ভারতের সঙ্গে দ্বিতীয় মেয়াদের তালিবান নেতৃত্বাধীন সরকারের সম্পর্ক উন্নতির সম্ভাবনা তখনও দুরাশাই মনে হয়েছিল। আদর্শগত ব্যবধান ও অতীতের তিক্ততা ছাড়াও পাকিস্তানের ভৌগোলিক উপস্থিতি ছিল এই দুই পক্ষের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রাচীর। ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান বিভাগের যুগ্ম সচিব জে পি সিং প্রথম কাবুলে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মহম্মদ ইয়াকুবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইয়াকুব হচ্ছেন তালিবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের পুত্র। জট আরও খুলে যায়, যখন দুবাইয়ে ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি ও আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। গত জানুয়ারির সেই বৈঠকেই দু্’‌দেশের সম্পর্ক আবার জোড়া লাগে। বোঝাই যায়, ডুরান্ড রেখা বরাবর সীমান্ত সংঘর্ষ, অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা, তোরখাম ও চামান সীমান্তে দিনের পর দিন অচলাবস্থা—এসব ঘটনা পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তালিবান সরকার পাকিস্তানের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বন্ধু খুঁজে নিয়েছে। আর তাই, পাকিস্তান-ভারত সাম্প্রতিক সংঘাতে কাবুল নীরবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন অনেক আফগান। আসলে এই উপমহাদেশ জুড়ে ষড়যন্ত্রের বীজ বুনতে গিয়ে পাকিস্তান ‘টু ফ্রন্ট ওয়ার’-এর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে। এখান থেকে রেহাই পাওয়ার কোনও রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না ইসলামাবাদ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ