মৃণালকান্তি দাস: হোয়াইট হাউসের রান্নাঘর থেকে শুধু খাবারের সুগন্ধই নয়, কৌশলগত সংকেতও বেরিয়ে আসে। তার প্রমাণ মিলেছিল, পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজে!
মৃণালকান্তি দাস: হোয়াইট হাউসের রান্নাঘর থেকে শুধু খাবারের সুগন্ধই নয়, কৌশলগত সংকেতও বেরিয়ে আসে। তার প্রমাণ মিলেছিল, পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজে!
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দফার মেয়াদে এই পাকিস্তান সম্পর্কেই ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘এরা আমাদের মিথ্যে আর ধোঁকা ছাড়া কিছুই দেয়নি।’ কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই অবস্থান থেকে তিনি শুধু ‘ইউ টার্ন’-ই করেননি, ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দিন-কে-দিন ক্রমেই আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছেন। তারই পরিণতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে পাকিস্তানের উপর সবচেয়ে কম শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প! আনন্দে আত্মহারা ইসলামাবাদ বিবৃতি দিয়েছে: নয়া যুগের সূচনা! ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েই থামেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেছেন, এবার পাকিস্তানে থাকা ‘বিশাল তৈলভাণ্ডার’-এর উন্নতির জন্য হাত মিলিয়ে কাজ করবে আমেরিকা। একইসঙ্গে নয়াদিল্লিকে খোঁচা দিয়ে নিজস্ব সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘কে জানে হয়তো পাকিস্তান একদিন ভারতকেও তেল বিক্রি করবে।’ বোঝাই যায়, ট্রাম্পকে ‘তৈলমর্দন’ করে তেলভাণ্ডারের স্বপ্ন বিক্রি করেছে ইসলামাবাদ! পাকিস্তান জানে, জ্বালানি তেলের গন্ধ পেলেই আমেরিকানরা আত্মহারা হয়ে যায়। মৌমাছির মতো ছুটে যায়, সেই তেলের ভাণ্ডার আত্মসাৎ করতে। প্রশ্ন হল, সত্যিই কি পাকিস্তানে লুকিয়ে আছে খনিজ তেলের বিশাল ভাণ্ডার? বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, যদি সত্যিই পাকিস্তানে খনিজ তেলের ভাণ্ডার থেকে থাকে, তা হলে কেন নিজেদের নুইয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এত দিন তা ব্যবহার করেনি ইসলামাবাদ? কেন পাকিস্তানের আম জনতাকে প্রতি লিটার পেট্রলের জন্য ২৭২ টাকা খরচ করতে হয়?
তেলের ভাণ্ডার থাকা নিয়ে পাকিস্তানের জিগির তোলার সূত্রপাত ২০১৮ সাল থেকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি তুলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। তবে প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে করাচির উপকূলে খনন চালিয়েও কোনও তেলের ভাণ্ডার খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে কথা স্বীকারও করে নিয়েছিল পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের তেলের ভাণ্ডারের হদিশ মিলেছে বলে জিগির তুলেছিল শাহবাজ শরিফের সরকার। সেটিকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ খনিজ তেলের ভাণ্ডার বলেও দাবি করা হয়েছিল পাক সরকারের তরফে। গালভরা নাম দিয়েছিল ইসলামাবাদ—‘ব্লু ওয়াটার ইকনমি’!
এরপরই তেলের ভাণ্ডারের খোঁজে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক্সনমোবিল, ইএনআই, পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের দেখানো জায়গায় ৫,৫০০ মিটারের বেশি খনন করেও তেল বা গ্যাসের কোনও মজুত খুঁজে পায়নি। খননকাজও বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলামাবাদ বুঝে গিয়েছিল, তাদের তেলের ভাণ্ডারের গল্প হয়ে উঠতে পারে ‘তুরুপের তাস’। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, তৈলভাণ্ডার থাকার সেই ‘স্বপ্ন’ এবার ট্রাম্পকে বিক্রি করেছেন খোদ আসিম মুনির। অথচ, ২০১৬ সালের প্রামাণ্য নথি অনুযায়ী, পাকিস্তানে মজুত থাকা খনিজ তেলের পরিমাণ আনুমানিক ৩৫.৩৫ কোটি ব্যারেল, যা বিশ্বব্যাপী তেল মজুতের মাত্র ০.০২১ শতাংশ। এর মধ্যেও বেশিরভাগ তেল মজুত রয়েছে ‘অগ্নিগর্ভ’ বালুচিস্তানে। কিন্তু তারপরেও কেন পাকিস্তানের ‘তেল-ফাঁদে’ পা দিলেন ট্রাম্প? আসলে ‘ট্রাম্পকে ওরা বোকা বানাচ্ছে, পাকিস্তানের কোনও তেল ভাণ্ডারই নেই!’, দাবি বালুচিস্তানের নেতা মির ইয়ার বালোচের। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পকে অনেক দিন ধরেই ‘তৈলমর্দন’ করছে পাকিস্তান। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সমর্থনেও আওয়াজ তুলেছিল পাকিস্তান। আর তাতেই মন গলেছে ট্রাম্পের। তাহলে কি আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একমাত্র টোটকা ‘তৈলমর্দন’? যা পারেনি বলেই ভারতের ঘাড়ে চেপেছে ২৫ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক!
কখনও ‘অপারেশন সিন্দুর’। কখনও আবার শুল্ক-যুদ্ধ। সঙ্গে পাকিস্তান-প্রেম। দ্বিতীয় বার কুর্সিতে বসা ইস্তক ভারত-আমেরিকার ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ যেন দ্রুত ভেঙে ফেলতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ঠিক সেই কারণেই ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃতবৎ’ বলে তোপ দেগেছেন তিনি। একটা সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বন্ধু’ বলা ট্রাম্পের হঠাৎ কেন এতটা পরিবর্তন? বিশেষজ্ঞদের দাবি, ট্রাম্প চান, আমেরিকার জন্য কৃষি এবং দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার খুলে দিক নয়াদিল্লি। কিন্তু, কেন্দ্রের মোদি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ দেশের কৃষক এবং দুগ্ধশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের লোকসান করে কোনও সমঝোতা সম্ভব নয়। ফলে বেজায় চটেছেন তিনি।
শুধু তাই-ই নয়, রাশিয়ার থেকে সস্তায় খনিজ তেল কেনার শাস্তি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট! ‘অবাধ্য’ ভারতকে জব্দ করতে ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, আরও চাপাবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবশ্য দাবি, নয়াদিল্লির উপর তাঁর এই গোঁসার নেপথ্যে রয়েছে অন্য কারণ। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এর পিছনে রয়েছে প্রতিরক্ষা ব্যবসাও। জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলতে আগ্রহী হন ট্রাম্প। সেই তালিকার শীর্ষে ছিল স্টেল্থ শ্রেণির এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমানের নাম। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই মুহূর্তে আমেরিকার থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ার কেনা সম্ভব নয়। শুধু তা-ই নয়, ‘এফ-৩৫’ নিয়ে কোনও আলোচনাই করতে চায়নি নয়াদিল্লি। উল্টে রাশিয়ার থেকে পঞ্চম প্রজন্মের এসইউ-৫৭ ফেলন যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রক কিনতে চলেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া গত মার্চে ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমান নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করে জার্মানি। বার্লিনের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ওই লড়াকু জেটে বিশেষ একটি ‘কিল সুইচ’ রয়েছে। সেটা সক্রিয় হলেই কাজ করা বন্ধ করে দেবে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমান। এই দাবি সত্যি হলে ‘এফ-৩৫’ কিনলে বিপদে পড়বে ভারতীয় বায়ুসেনা। আক্রমণের সময়ে আমেরিকার হাতের পুতুলে পরিণত হতে পারে তারা, যা কখনওই চায় না নয়াদিল্লি। বিষয়টি কানে যেতেই চটে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও এই ইস্যুতে সরকারিভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে শুরু হওয়া ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’-র সময় থেকে রাশিয়াকে পুরোপুরি নির্বান্ধব করে ফেলতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। আর তাই ভারতকে পুরোদস্তুর হাতিয়ার বিক্রি করতে পারলে ওয়াশিংটনের উপর নয়াদিল্লির বাড়বে নির্ভরশীলতা। আপাতত সেটা না হওয়ায় বিরক্ত ট্রাম্প এ দেশের অর্থনীতিকে ‘মৃতবৎ’ বলতেও ছাড়েননি। রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে অর্থনীতি ধসিয়ে দেব, এই হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আমেরিকা। আমেরিকা জানে, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশ খানিক কম দামে তেল কিনতে পারায় ভারতের লাভ হয়েছে যথেষ্ট। বাণিজ্যিক জাহাজের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুসারে, গত জুন মাসেই রাশিয়া থেকে দৈনিক ২০.৮ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে ভারতের শোধনাগারগুলি। তবে, এটাও ঠিক, আমেরিকার সঙ্গে অন্তত স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করা ভারতের পক্ষে ক্ষতিকারক। আর সেখানেই ধাক্কা দিয়েছেন ট্রাম্প। প্রশ্ন উঠতে পারে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিকে যথাযথ রাজনৈতিক গুরুত্ব না দিলে আমেরিকার কি ক্ষতির সম্ভাবনা নেই? থাকতে পারে, কিন্তু ভারতের নিজস্ব ক্ষতির পাশে সেটা যৎসামান্য। কারণ, আমেরিকার বাণিজ্যক্ষেত্রে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ আমদানির চেয়ে অনেক বেশি।
ট্রাম্পের যুক্তি, বিভিন্ন পণ্য মার্কিন বাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ রোজগার করছে নয়াদিল্লি। সেই টাকা দিয়ে আমেরিকার শত্রু দেশ রাশিয়া থেকে সস্তা দরে খনিজ তেল এবং হাতিয়ার কিনছে মোদি সরকার। এতে আখেরে লোকসান হচ্ছে আমেরিকার। ফলে ভারতের হাত ছেড়ে তাঁর পাকিস্তান প্রেম আবার চাগিয়ে উঠেছে! শুধু তাই-ই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানে তাঁর ক্রিপ্টো ব্যবসার দেখভাল করবেন পাক সেনাপ্রধান মুনির। সুযোগ বুঝেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (ইউএসসেন্টকম) প্রধান, জেনারেল মাইকেল কুরিলাকে পাকিস্তান তাদের অন্যতম শীর্ষ সামরিক খেতাব ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজে’ ভূষিত করেছে। এই পদক্ষেপ যে আমেরিকার প্রতি পাকিস্তানের একটা স্ট্র্যাটেজিক বার্তা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। জেনারেল মাইকেল কুরিলা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানকে ‘ফেনোমেনাল পার্টনার’ বা অসাধারণ এক সঙ্গী বলে বর্ণনা করেছেন। ফলে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ এখন আবার কাছাকাছি আসছে— সেই ইঙ্গিত পরিষ্কার। ছয় বছর আগে নরেন্দ্র মোদি আমেরিকায় ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’ বলে এলেও ট্রাম্পের কাছে ভারত যে এখন তৃতীয় বিশ্বের বেশি কিছু নয়, সে কথা পরিষ্কার।
মার্কিন বিদেশ দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণা ব্যুরোতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশ্লেষক মারভিন ওয়াইনবাম বলছেন, পাকিস্তান-আমেরিকার এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘আইসিং অন দ্য কেক’। কারণ, ‘ট্রাম্প প্রশাসনে কোনও কিছুই স্থায়ী নয়, মুহূর্তের মধ্যে সব বদলে যেতে পারে।’ অন্যদিকে, পাকিস্তান এখন বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে, চীন না আমেরিকা— কার দিকে ঝুঁকবে। এতদিন পাকিস্তানকে যুদ্ধবিমান তৈরিতে প্রযুক্তিগত সাহায্য করেছে চীন। দেশটিতে বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ফলে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন চীন কীভাবে নেবে, সেটিও ভাবনার বিষয়। ইসলামাবাদ দু’নৌকায় পা দিয়ে কীভাবে চলে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে নয়াদিল্লিও।
ট্রাম্প যেভাবে ‘মিত্র’ মোদির ভারতকে জোর করে চীন-রাশিয়ার অক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার কী লাভ হবে তা এখনই বোঝা মুশকিল। তবে এটা স্পষ্ট, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপানের সঙ্গে তৈরি কোয়াড নামক কূটনৈতিক মঞ্চটিকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টই!